ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গত বুধবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘আংশিক সেনা সমাবেশ’ করার ঘোষণা দেন। সামরিক বাহিনীর রিজার্ভ সেনাদের একটি অংশকে ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম রাশিয়া এ ধরনের সেনা সমাবেশ করতে যাচ্ছে। এর আওতায় নতুন করে তিন লাখের বেশি সেনাকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। যাঁদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের উপযোগী বিবেচনা করা হচ্ছে, তাঁদের বাড়িতে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ছিল সেনা সমাবেশের প্রথম দিন।

পূর্বাঞ্চলীয় সাইবেরিয়ার বুরিয়াতিয়াতে জাকামেনস্কি অঞ্চলের এক নারী বলেন, মধ্যরাতে কুকুরগুলো যখন ডেকে উঠল, তখন তাঁর মনে হচ্ছিল কোনো একটা বিপদ হচ্ছে। ওই গ্রামে ৪৫০ জন বাসিন্দার বসবাস। গ্রামের প্রধান বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে নিয়োগপত্র দিয়েছেন। সে রাতে ২০ জনের বেশি বাসিন্দাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য চিঠি দিয়েছেন তিনি। গ্রামপ্রধান বলেন, পরদিন সকালে সেসব মানুষ যখন যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশে রওনা করছিলেন, তখন এক আবেগঘন দৃশ্য তৈরি হয়।

কেউ তখন ভদকা পান করেছিলেন। অনেকে আবার স্বজনদের সঙ্গে আলিঙ্গন করে একে অপরকে নিরাপদ থাকতে বলেছিলেন। মিনিবাসে করে তাঁরা যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন পরিবারের নারীরা কাঁদছিলেন এবং ক্রস প্রতীক তৈরি করছিলেন।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ

অধিকার সংগঠন ফ্রি বুরিয়াতিয়া ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দ্রা গারমাঝাপোভা বলেন, আংশিক সেনা সংযোজন নয়, এখানে শতভাগ সেনা সংযোজন হচ্ছে। তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সেনাবাহিনীতে সেনা সংযোজনের ঘোষণা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মাথায় বুরিয়াতিয়াতে ৩ হাজারের বেশি মানুষের কাছে সমন পাঠানো হয়েছে। পুতিনের ঘোষণায় আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে যে রুশ নাগরিকেরা সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন এবং যাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের এ যুদ্ধের জন্য তলব করা হচ্ছে। তবে অধিকারকর্মী বলছেন, যে মানুষদের বয়স ৫০-এর কোঠায়, তাঁদেরও তলব করা হচ্ছে।

এক নারী বলেন, পুতিনের ঘোষণার কিছুক্ষণ আগেই তাঁর ৫২ বছর বয়সী এক স্বজনকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য তলব করে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বুরিয়াতিয়ার উলান উদে এলাকার সাংবাদিক ইয়ানিনা নিমায়েভা অভিযোগ করেছেন, তাঁর ৩৮ বছর বয়সী স্বামীও একটি তলব নোটিস পেয়েছেন। অথচ তাঁর স্বামী কখনো সেনাবাহিনীতে কাজ করেননি।

বুধবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে শোইগু বলেন, ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য রাশিয়া তিন লাখ মানুষকে তলব করা হবে। মূলত যাঁদের সামরিক অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদেরই ডাকা হচ্ছে। তবে পুতিন যে আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, তাতে ঠিক কতসংখ্যক সেনা সংযোজনের কথা বলা হয়েছে, তা গোপন আছে।

কেউ কেউ মনে করেন, আদেশ অনুযায়ী সেনা সংযোজনের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। সূত্রের বরাতে স্বাধীন ধারার রুশ সংবাদপত্র নোভায়া গ্যাজেটা ইউরোপের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া সেনাবাহিনীতে ১০ লাখের বেশি সেনা যোগ করতে চাইছে। তবে এই প্রতিবেদনের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কান্নাভেজা চোখে বিদায়

সাখার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নেরইয়ুংগ্রিতে প্রকাশিত এক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বেশ কিছুসংখ্যক মানুষ গরনিয়াক ফুটবল স্টেডিয়ামে জড়ো হয়েছেন। তাঁদের বয়স ৩০ থেকে ৪০–এর কোঠায়। সেখানে থাকা বাসে চড়ে নিয়োগকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছেন তাঁরা। পরিবারের সদস্যরা কান্নাভেজা চোখে তাঁদের বিদায় জানাচ্ছেন।

দাগেস্তানে প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা গেছে, নিয়োগকেন্দ্রে আসা মানুষদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন এক কর্মকর্তা। আর তাতে সে মানুষেরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। ওই কর্মকর্তা বলছিলেন, তাঁর ছেলে ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেনে লড়াই করছেন।

একটি পৌরসভা ভবনের বাইরে ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে এক নারী চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আপনারা আপনাদের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছেন।’ জবাবে ভিড় থেকে এক ব্যক্তি তখন বলে ওঠেন, ‘আমাদের বর্তমানই নেই, কোন ভবিষ্যতের কথা আপনারা বলছেন?’

বিক্ষোভেও ধরিয়ে দেওয়া হয় চিঠি

পুতিন সেনা সমাবেশের ঘোষণা দেওয়ার পর মস্কোতে আরবাত স্ট্রিটে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করার জন্য জড়ো হয়েছিলেন। বিক্ষোভ থেকে যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের চিঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের একজন আর্তেম ক্রিয়েগা। তিনি সোটা ভিশন নামের একটি সংবাদমাধ্যমে নিয়োজিত আছেন। বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি আটক হন।

পুলিশ ভ্যানের পেছনে বসে টিভি রেইনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ক্রিয়েগা। তিনি বলেন, সব মানুষ, একেবারে সবাইকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যাঁরা কখনো সেনাবাহিনীতে চাকরি করেননি, সেই মানুষেরাও এ তালিকায় আছেন। অর্থাৎ এখন তাঁদের স্থানীয় সেনা নিয়োগকেন্দ্রে হাজির হতে হবে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ফোনকলে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও একরকম স্বীকার করেছেন যে  আটক হওয়া মানুষদেরও যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য চিঠি দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এতে আইনের লঙ্ঘন হয় না।’

রাশিয়াজুড়েই সেনা নিয়োগের এ প্রক্রিয়া চলছে। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, খাবারোভস্ক অঞ্চলের খুরবা এলাকার একটি বিমানবন্দরে একটি অ্যান-১২ উড়োজাহাজে ওঠার জন্য শতাধিক মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরা নতুন নিয়োগ পাওয়া সেনা বলে মনে করা হচ্ছে।

বুরিয়াতিয়াতে অধিকারকর্মীরা বলছেন, স্থানীয় কর্মকর্তারা নিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রাসী আচরণ করছেন। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে গিয়ে নিয়োগপত্র দিচ্ছেন তাঁরা।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন