বিরল খনিজ সম্পদের জন্যই কি গ্রিনল্যান্ডের দিকে ট্রাম্পের নজর: আসলে কী আছে সেখানে

গ্রিনল্যান্ডফাইল ছবি: রয়টার্স

গ্রিনল্যান্ডের প্রতি নিজের আগ্রহের কথা লুকাননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তিনি দাবি করেছেন, দ্বীপটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিতে একটি ভবিষ্যৎ চুক্তির ‘কাঠামো’ গুছিয়ে এনেছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের বিরল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকারের কথাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডে আসলে কি প্রাকৃতিক সম্পদ আছে?

ধারণা করা হয়, গ্রিনল্যান্ডের মাটির নিচে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভান্ডার রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে ইলেকট্রনিকস পণ্য, সবুজ শক্তি এবং অন্যান্য কৌশলগত ও সামরিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য কাঁচামাল প্রচুর পরিমাণে রয়েছে বলে মনে করা হয়। এসব সম্পদের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য।

২০২৩ সালের ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপীয় কমিশনের তালিকাভুক্ত ৩৪টি ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজের’ মধ্যে গ্রাফাইট, নিওবিয়াম ও টাইটানিয়ামসহ ২৫টি খনিজই গ্রিনল্যান্ডে পাওয়া যায়।

ধারণা করা হয়, গ্রিনল্যান্ডের মাটির নিচে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভান্ডার রয়েছে। এ ছাড়া ইলেকট্রনিকস পণ্য, সবুজ শক্তি এবং অন্যান্য কৌশলগত ও সামরিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য কাঁচামাল সেখানে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে বলে মনে করা হয়। এসব সম্পদের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য।

গত বছর গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু ‘প্রতিরক্ষার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেখানে বিরল খনিজ মৌলের বিশাল মজুত রয়েছে।

তবে ট্রাম্প মাঝেমধ্যে এসব সম্পদের গুরুত্বকে কিছুটা খাটো করে দেখান। বরং ওই অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতেই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের দখলে থাকা প্রয়োজন বলে দাবি করেন তিনি।

আরও পড়ুন

গত বুধবার দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি গ্রিনল্যান্ড চাই শুধু নিরাপত্তার জন্য—অন্য কিছুর জন্য নয়।’

আর্কটিক অঞ্চলে খনিজ উত্তোলনের কঠিন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আপনাকে খনিজ পেতে ২৫ ফুট বরফের নিচে যেতে হবে। এটা যে কেউ চাইলে করতে পারবে না।’

ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ডকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন বললেও পর্দার আড়ালে আসল লক্ষ্য দ্বীপটির প্রাকৃতিক সম্পদের নাগাল পাওয়া। সেটাকেই বড় করে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে অর্থনৈতিক আধিপত্যের ওপর। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিরল খনিজ শিল্পে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য মোকাবিলা করা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক স্টিভেন ল্যামির মতে, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পেছনে ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য হলো খনিজ সম্পদের নাগাল পাওয়া এবং এ খাতে চীনের আধিপত্য রুখে দেওয়া।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার আগে থেকেই গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সখ্য বৃদ্ধি করতে শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার জবাব দিতেই ২০২০ সালে দ্বীপটির রাজধানী ন্যুকে আবার কনস্যুলেট খোলে ওয়াশিংটন।

ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তাঁর সহযোগীরা দ্বীপটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা প্রচার করতে থাকেন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে নতুন সমুদ্রপথ উন্মোচন এবং মৎস্য ও খনিজ সম্পদ আহরণের সুযোগ তৈরি হওয়াকে ট্রাম্প প্রশাসন বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে।

গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডে একটি মার্কিন কোম্পানির খনি প্রকল্পে ১২ কোটি ডলার অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছে। বিরল খনিজ সরবরাহে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গে করা আগের চুক্তিগুলোর ধারাবাহিকতা এটি।

গত বছর গ্রিনল্যান্ডে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে ট্রাম্পের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়ালৎস বলেছিলেন, ‘(গ্রিনল্যান্ড) শুধু নৌপথ বা জ্বালানির জন্য নয়, এটি আমাদের নিরাপদ রাখা এবং মহাকাশ ও শত্রুদের ওপর নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিও সিএনবিসিকে বলেছেন, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট। তিনি গ্রিনল্যান্ডকে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক সুযোগ হিসেবে দেখেন।

আরও পড়ুন

গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডে একটি মার্কিন কোম্পানির খনি প্রকল্পে ১২ কোটি ডলার অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছে। বিরল খনিজ সরবরাহে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গে করা আগের চুক্তিগুলোর ধারাবাহিকতা এটি।

লন্ডনভিত্তিক অলাভজনক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক প্যাট্রিক শ্রডার বলেন, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদের বিশালতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাশার দান উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য দ্বীপটিকে কেন দখল করতে হবে, তা স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড থেকে খনিজ উত্তোলন করা যতটা সহজ ভাবা হচ্ছে, বাস্তবে ততটা নয়।

অধ্যাপক ল্যামি বলেন, অবকাঠামোর অভাব, শ্রমিক–সংকট এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে গ্রিনল্যান্ডে খনি পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।

ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মিকেল রুঞ্জ ওলেসেন বলেন, গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশি বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করলেও খুব একটা সফল হয়নি। কারণ, সেখানে খনিজ উত্তোলনের খরচ অনেক বেশি।

তবে গ্রিনল্যান্ডে বরফ দ্রুত গলতে শুরু করায় পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে খনি উত্তোলনের পথ যেমন সহজ হচ্ছে, তেমনি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা বাড়ছে।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের আর্কটিক ইনিশিয়েটিভের পরিচালক জেনিফার স্পেন্স মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান ও খনিজ সম্পদই ট্রাম্পকে দ্বীপটির প্রতি আকর্ষণ করছে। তাঁর মতে, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে জাতীয় নিরাপত্তার কথা বললেও এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি আসলে অর্থনীতি।

আরও পড়ুন