ক্রিমিয়া একসময় ইউক্রেনের অংশ ছিল। ২০১৪ সালে ভূখণ্ডটি দখল করে নেয় রাশিয়া। এর পরপরই ক্রিমিয়াকে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় মস্কো। চার বছরের মাথায় চালু করা হয় কার্চ সেতু। ক্রিমিয়া সেতু নামেও এই স্থাপনা পরিচিত। ক্রিমিয়া ও রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই সেতু।
সেতুটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর শীর্ষে ছিল। রুশ গণমাধ্যমের ভাষায়, সেতুটি ‘শতাব্দীর সেরা নির্মাণকাজ’। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর পর থেকে কার্চ সেতুর কৌশলগত গুরুত্ব বহুলাংশে বেড়ে যায়। ইউক্রেনে নিয়োজিত রুশ সেনাদের অস্ত্র ও রসদ সরবরাহে ব্যবহার করা হয় সেতুটি।
গতকাল সোমবার সকালে হঠাৎ কার্চ সেতুতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় রুশ কর্তৃপক্ষ। রাশিয়া-সমর্থিত ক্রিমিয়ার প্রশাসক সের্গেই আকসেওনোভ জানান, ‘জরুরি পরিস্থিতির’ কারণে কার্চ সেতুতে যান চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকবে। পরে জানা যায়, সেতুতে হামলা হয়েছে।
কার্চ সেতুতে আরও একটি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। অবশ্যই রাশিয়ার পক্ষ থেকে এর জবাব দেওয়া হবে। ইউক্রেনের এ হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, সে প্রস্তাব তৈরি করছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
গত রোববার রাতে কার্চ সেতুতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলায় বেসামরিক এক দম্পতি নিহত ও তাঁদের মেয়ে আহত হয়েছেন। বিস্ফোরকভর্তি চালকবিহীন নৌযান ব্যবহার করে চালানো এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ইউক্রেন। এখন সেতুতে যান চলাচল আংশিক চালু করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ।
খরচ ৩৬০ কোটি ডলার
সময়টা ২০১৮ সালের ১৫ মে। কার্চ সেতু উদ্বোধন করা হয়। ওই দিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি কমলা রঙের ট্রাক চালিয়ে এ সেতু পাড়ি দেন। রাশিয়ার অভিবাসীদের জন্য যেন গর্বের একটি দিন।
গর্বিত পুতিন বলেছিলেন, ‘ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে, এমনকি জারের শাসনের সময়েও মানুষ সেতুটি নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিল। এরপর গত শতকের ত্রিশ, চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে এই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চমৎকার এই কাজ শেষ হয়েছে।’
ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সঙ্গে রাশিয়াকে যুক্ত করা এই সেতু ১২ মাইল বা প্রায় ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ। সাগরে কার্চ প্রণালির ওপর নির্মাণ করা এ সেতুর উচ্চতা স্ট্যাচু অব লিবার্টির চেয়েও বেশি। এটা ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘ সেতু। এতে সড়ক ও রেলপথ যুক্ত রয়েছে। কার্চ সেতু বানাতে খরচ হয়েছে ৩৬০ কোটি ডলার।
আগেও হামলা হয়েছে
কার্চ সেতুতে হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়; গত বছরের ৮ অক্টোবর শক্তিশালী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে সেতুটি। এতে সেটির সড়কপথের একাংশ ধসে যায়। সেতুর রেলপথে থাকা জ্বালানি তেলবাহী ট্রেনের কয়েকটি ট্যাংকারে আগুন লাগে। প্রাণ হারান তিনজন।
পরে জানা যায়, এ হামলার পেছনে ইউক্রেন জড়িত। ধারণা করা হয়, ইউক্রেনে অবস্থান করা রুশবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এ হামলা চালানো হয়। কেননা, শুধু ক্রিমিয়াই নয়, দক্ষিণ ইউক্রেনে অবস্থান করা রুশ সেনাদের কাছে রসদ পাঠাতে এই সেতু মূল পথগুলোর একটি।
এ ছাড়া রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ইউক্রেনের দক্ষিণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের যোগাযোগের প্রধান পথ এটি। এ সেতু দিয়েই রেলপথ গেছে ইউক্রেনের মেলিতোপোল পর্যন্ত। কৃষ্ণসাগরে অবস্থান করা রুশ নৌবহরে জ্বালানি, খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী এই সেতু দিয়ে পাঠানো হয়।
পুতিনের পরিদর্শন
গত অক্টোবরের হামলা ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর ওপর বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হামলার দুই মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে সেতুটি পরিদর্শন করেন পুতিন। ওই দিন মার্সিডিজ চালিয়ে কার্চ সেতু ঘুরে দেখেন তিনি। গাড়ি থেকে নেমে সেতুর ওপর হাঁটতে দেখা যায় পুতিনকে।
৮ অক্টোবরে কার্চ সেতুতে ওই হামলার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ৭ অক্টোবর ছিল পুতিনের ৭০তম জন্মদিন। এ ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে চিহ্নিত করে এর পেছনে ইউক্রেনকে দায়ী করেছিলেন পুতিন। তিনি বলেছিলেন, ‘এই হামলার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।’ ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে হামলা চালিয়ে জবাব দিয়েছিলেন তিনি।
পশ্চিমারা সম্পৃক্ত: রাশিয়া
কার্চ সেতুতে সর্বশেষ হামলার পর ‘উপযুক্ত জবাব’ দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন পুতিন। গতকাল টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে পুতিন বলেন, ‘গত রাতে (কার্চ) সেতুতে আরও একটি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। অবশ্যই রাশিয়ার পক্ষ থেকে এর জবাব দেওয়া হবে। ইউক্রেনের এই হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, সে প্রস্তাব তৈরি করছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।’
এ হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে রাশিয়া। এ বিষয়ে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র দাবি করেন, আমেরিকা ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও দেশ দুটির রাজনীতিকদের সরাসরি অংশগ্রহণে ইউক্রেন এ হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্য এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো তথ্য-প্রমাণ দেননি।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, যদি হামলায় কথিত ড্রোন ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেসব ড্রোন পশ্চিমা দেশগুলোয় তৈরি। যদি ইউক্রেনের মিত্ররা এই অভিযানের পরিকল্পনা, পৃষ্ঠপোষকতা ও অভিযান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তারা যে কিয়েভ সরকারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, সেটাই নিশ্চিত হবে।