সার্বিয়ার নির্বাচনে দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিসের ভরাডুবি, তরুণদের জয়

রাজপথে তরুণেরাসহ সাধারণ মানুষের উল্লাস। বেলগ্রেড, সার্বিয়া, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় গতকাল রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। এরই মধ্যে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন দেশটির দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিস।

আলেকসান্দার ভুচিস (৫৬) বলেছেন, চূড়ান্ত ফলাফল যেদিকে এগোচ্ছে তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছে, বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছেন।

ভুচিসের ভরাডুবিতে সার্বিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে প্রায় দুই বছর ধরে চলা সরকারবিরোধী সর্বাত্মক আন্দোলন সফল হচ্ছে। তরুণদের বাছাই করা প্রার্থীরা পার্লামেন্টের এ আগাম নির্বাচনে চূড়ান্তভাবে জয়ের পথে আছেন।

ফলাফলের প্রাথমিক প্রবণতা দেখে গতকালই আলেকসান্দার ভুচিস জানান, বিরোধী জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে। আর তাঁর দল ১০৫টির মতো আসনে জয়ী হতে পারে। সার্বিয়ার পার্লামেন্টে মোট আসন ২৫০টি।

সার্বিয়ার নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে রেকর্ড ভোট পড়েছে। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ ভোটার উপস্থিতির হার ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিলুপ্তির পর এটাই সেখানে সর্বোচ্চ ভোটের হার।

চূড়ান্ত ফলাফল এখনো আসেনি উল্লেখ করে আলেকসান্দার ভুচিস বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, আমরা এ নির্বাচনে হেরে গেছি।’

বেলগ্রেডভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ‘ফোনেট’ জানায়, আলেকসান্দার ভুচিসের পরাজয় মেনে নেওয়ার ঘোষণার পর ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর কার্যালয়ে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। সমর্থকেরা নেচে-গেয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন।

আরও পড়ুন

স্টুডেন্ট লিস্টের প্রার্থী রাদোমির সাইসিস জোটের নির্বাচনী সদর দপ্তরে এক ভাষণে বলেন, প্রাথমিক ফলাফলে প্রায় সব কেন্দ্রেই শিক্ষার্থীদের বাছাই করা প্রার্থীরা নিশ্চিতভাবে এগিয়ে আছেন।

আলেকসান্দার ভুচিসের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় দেশটির তরুণ ও শিক্ষার্থীরা। সার্বিয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে এসেছে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন তরুণেরা।

রাদোমির আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা জিতেছে। সার্বিয়ায় ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে, সে আশাও জিতেছে। আজ রাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোক।’

সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) প্রার্থী হিসেবে ২০১২ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন আলেকসান্দার ভুচিস। এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আছেন তিনি।

সার্বিয়ায় তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। এ কারণে আলেকসান্দার ভুচিস পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছিলেন। সেখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি।

বেলগ্রেডের ঠিক কেন্দ্রে পার্লামেন্ট ভবন আর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের মাঝামাঝি ছোট্ট একটি পার্কে প্রায় ১৮ মাস ধরে এসএনএসের সমর্থকেরা তাঁবু টানিয়ে টানা অবস্থান নিয়ে ছিলেন। গতকাল জনতা সেসব তাবু ভেঙে দিয়েছে।

আলেকসান্দার ভুচিসের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় দেশটির তরুণ ও শিক্ষার্থীরা। সার্বিয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে এসেছে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন তরুণেরা।

ভোট দেওয়ায় রেকর্ড

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে রেকর্ড ভোট পড়েছে। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ ভোটার উপস্থিতির হার ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিলুপ্তির পর এটাই সেখানে সর্বোচ্চ ভোটের হার।

আলেকসান্দার ভুচিস
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইউনিভার্সিটি অব বেলগ্রেডের গবেষক জেলেনা ভাসিলজেভিক গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে আল-জাজিরাকে বলেছিলেন, নিশ্চিতভাবে এসএনএসের একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। তবে যাঁরা সাধারণত ভোট দেন না, তাঁদের আকৃষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে গতকাল ভোট গ্রহণের সময় ভয়ভীতি দেখানো এবং পদ্ধতিগত ত্রুটির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা ‘সেন্টার ফর রিসার্চ, ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা সিআরটিএ জানিয়েছে, ৫০০টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করে তাদের পর্যবেক্ষকেরা প্রায় এক-তৃতীয়াংশে ভোটার বা নির্বাচনী কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ভোটের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতা দেখা গেছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ফ্রি ইলেকশনস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ জানিয়েছে, গতকাল বিকেল ৫টা নাগাদ তারা সম্ভাব্য অনিয়মের প্রায় ২৬০টি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালট পেপারের ছবি তোলা, দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়া এবং পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জটিলতার মতো ঘটনা।

আরও পড়ুন

দেশজুড়ে বিজয়োৎসব

আলেকসান্দার ভুচিস পরাজয় স্বীকার করে নেওয়ার পর উৎসবে মেতে ওঠেন সার্বীয়রা। বেলগ্রেডের আকাশ রঙিন আতশবাজির আলোকচ্ছটায় ভরে যায়। প্রধান সড়কে নেমে আসেন হাজারো মানুষ। এ সময় স্টুডেন্ট লিস্টের সমর্থকেরা গাড়িতে করে ঘুরে বেড়ান। অনবরত হর্ন বাজিয়ে উদ্‌যাপনে মাতেন।

রাজপথে স্লোগান দেওয়া হয়: ‘আলেকসান্দার বিদায় নিয়েছেন’। নেচে-গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন তরুণেরা।

বেলগ্রেডের ঠিক কেন্দ্রে পার্লামেন্ট ভবন আর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের মাঝামাঝি ছোট্ট একটি পার্কে প্রায় ১৮ মাস ধরে এসএনএসের সমর্থকেরা তাঁবু টানিয়ে টানা অবস্থান নিয়ে ছিলেন। গতকাল জনতা সেসব তাঁবু ভেঙে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন