সহিংস আন্দোলনের পর ফ্রান্সের সামনে কী ঘটতে পারে

বিক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত ম্যাকডোনাল্ডসের একটি ক্ষতিগ্রস্ত রেস্তোরাঁর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন মানুষ। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ছবি: রয়টার্স

সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল সময় পার করছে ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে চলছে তুমুল বিক্ষোভ। রাজপথের এ বিক্ষোভ শুধু মিছিল–সমাবেশে সীমিত নেই, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীরা সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ব্যাপক লুটপাট করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন শহরে জারি করা হয়েছে কারফিউ।

বিক্ষোভের শুরুটা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততাসহ নানা কারণে এই বিক্ষোভে নামে শিক্ষার্থীরা। পরে সাধারণ মানুষও যুক্ত হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের দাবিতে সপ্তাহান্তে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো ফ্রান্স।

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস এ বিক্ষোভে লিমোজ শহরের ঐতিহ্যবাহী সিটি হল আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। লুটপাট চালানো হয়েছে তিন হাজারেরও বেশি দোকানে। এখন কারফিউ জারির পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত, থমথমে; তবে বিপদের আশঙ্কা এখনো কাটেনি।

এর মধ্যেই ফরাসি সরকারের কাছে প্রস্তুতিহীনতার জন্য জবাব চেয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মেয়রেরা। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে সরকার।

বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি হওয়ায় রাজপথের পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে কিছু বিক্ষোভকারী আগামী শনিবার (২৪ অক্টোবর) আবারও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদ এবং বেতন বাড়ানোর দাবিতে আগামী ৫ নভেম্বর ধর্মঘট করবে শ্রমিক সংগঠনগুলো।

ক্ষত মোকাবিলার চেষ্টা

ফ্রান্সজুড়ে সপ্তাহান্তের সহিংস বিক্ষোভে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এমনকি লুটপাটে জড়িতদের খুঁজে বের করতে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

ফরাসি সরকার জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা হবে। আগামী সপ্তাহান্তে আবার বিক্ষোভ শুরু হলে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। তবে অতিরিক্ত কতজন পুলিশ মোতায়েন করা হবে, সেটা জানানো হয়নি।

ব্যাপক সহিংসতায় ক্ষতির শিকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সহায়তায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে ফরাসি সরকার। কর্মী ছাঁটাই এড়াতে সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানগুলোয় সাময়িক ছুটির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে বিশেষ তহবিলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তবে এ সহায়তার আওতায় কত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে ও কীভাবে তা বিতরণ করা হবে; সেসব বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি সরকার। ক্ষয়ক্ষতির কিছু অংশ বিমার অর্থে লাঘব করা যাবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

বিক্ষোভের সময় জ্বলন্ত বস্তুর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দাঙ্গা পুলিশের সদস্যরা। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

বড় পদক্ষেপের সুযোগ সীমিত

ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থা চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। আগে থেকেই দেশটিতে জীবনযাপনের ব্যয় অনেক বেশি। আর এ নিয়ে ক্ষোভ জনগণকে রাস্তায় নামিয়েছে। তাই এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রশমনে সরকারের পক্ষ থেকে বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত।

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। এর প্রভাব সামাল দিতে এ বছর কৃষক, জেলে এবং পণ্য পরিবহন খাতের কর্মীদের মতো কয়েকটি খাতের জন্য জরুরি বরাদ্দ বাড়িয়েছে ফরাসি সরকার।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয় গত মাসে। প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথমে আন্দোলন শুরু হয়। ওই এলাকাটি শ্রমিক অধ্যুষিত। শিক্ষকের সংকট ও বিদ্যালয়গুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নেয়।

ধুঁকতে থাকা বিদ্যালয়গুলোর জন্য বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি এখনো দেয়নি ফরাসি সরকার। তবে সংকট কাটাতে প্রায় তিন হাজার যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা প্রয়োজনীয় পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করলেও এখনো কাজে যোগ দেননি।

নতুন বিক্ষোভ–ধর্মঘটের ডাক

বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি হওয়ায় রাজপথের পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে কিছু বিক্ষোভকারী আগামী শনিবার (২৪ অক্টোবর) আবারো বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদ এবং বেতন বাড়ানোর দাবিতে আগামী ৫ নভেম্বর ধর্মঘট করবে শ্রমিক সংগঠনগুলো।

ফ্রান্সজুড়ে এত ব্যাপক পরিসরে বিক্ষোভ হচ্ছে, তাতে এটার শুরু যে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাত ধরে হয়েছে, সেটাই আড়ালে চলে গেছে। দেশটিতে বিদ্যালয়গুলোয় দুই সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর এক দশকের শাসনের অবসান হতে চলেছে। চলমান বিক্ষোভে সবচেয়ে লাভবান হতে পারেন কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালির নেত্রী মেরিন লো পেন। জনমত জরিপগুলোয় ইতিমধ্যে মাখোঁর উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন তিনি।
আরও পড়ুন

আস্থাসংকটে ব্যবসা খাত

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীদের আস্থা আরও কমতে পারে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির বাড়তি দাম এবং সরকারি অর্থসংকটের জেরে ব্যবসায়ীদের আস্থা এমনিতেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

ফ্রান্সের পার্লামেন্টে রাজনৈতিক বিভাজন বেশ গভীর। সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। পার্লামেন্টে ২০২৭ সালের বাজেটে কৃচ্ছ্রতার প্রস্তাব পাস করাতে হিমশিম খাচ্ছে ফরাসি সরকার। বিরোধী দলগুলোর কয়েকটির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে না পারলে সরকারের সামনে পতনের ঝুঁকি এড়ানো কঠিন হতে পারে।

ফ্রান্সের নঁত শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ ও লুটপাট হয়েছে
ছবি: এএফপি

এ অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের শেয়ারবাজার ও ইউরোর ওপর। দেশটির সরকারি বন্ডের ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের তুলনায় ফ্রান্সের বন্ডে বিনিয়োগের ঝুঁকির অতিরিক্ত মুনাফার হার (রিস্ক প্রিমিয়াম) বেড়ে ১৪৬ বেসিস পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। গত দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ।

আরও পড়ুন

সীমান্ত পেরিয়ে বিক্ষোভ

ফরাসি সরকার অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে, তা সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেশী ইতালিতে গত রোববার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সরকারি সেবার বেশ নিম্নমান আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতালির নাগরিকেরাও বিক্ষোভ করছেন।

আলবেনিয়াতে গত কয়েক দিন ধরে টানা বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব আর শিক্ষার মান সংকটের প্রতিবাদে তাঁরা রাজপথে নেমেছেন। অন্যদিকে স্পেন ও পর্তুগালে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে।

আরও পড়ুন

ডানপন্থীদের সুবিধা

আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর এক দশকের শাসনের অবসান হতে চলেছে। চলমান বিক্ষোভে সবচেয়ে লাভবান হতে পারেন কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালির নেত্রী মেরিন লো পেন। জনমত জরিপগুলোয় ইতিমধ্যে মাখোঁর উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন লো পেন।

এমানুয়েল মাখোঁ ও মেরিন লো পেন
ফাইল ছবি: রয়টার্স ও এএফপি

মাখোঁর দলের সাবেক আইনপ্রণেতা জ্যঁ-বাতিস্ত মোরো রয়টার্সকে বলেন, ‘লো পেনের এখন নির্বাচনী প্রচারে আর কোনো অর্থ খরচ করারও প্রয়োজন নেই। তাঁর সামনে পথ শুধু পরিষ্কারই হয়ে যায়নি; বরং ছয় লেনের মহাসড়ক তৈরি হয়ে গেছে।’

কট্টর বামপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলেশঁও চাপের মুখে পড়েছেন। বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ভূমিকার সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু সহিংসতার নিন্দা জানাতে গড়িমসি করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন মেলেশঁ।

আরও পড়ুন

গতকাল সোমবার মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন মাখোঁ। চলমান সংকটে আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে তাঁর সরকারের অবস্থান।

মাখোঁর সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপ এখন মধ্য-ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে থাকা মাখোঁর কাছ থেকে তিনি ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ’ দেখতে চান।

বিদেশিদের জন্য কতটা নিরাপদ

ফ্রান্স এখন কতটা নিরাপদ? বিশেষ করে বিদেশিদের জন্য? এমন আলোচনা শুরু হয়েছে। সহিংস বিক্ষোভে বিদেশি কেউ হতাহত হয়েছেন, এমন খবর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকার ফ্রান্সে ভ্রমণ করতে যাওয়া নাগরিকদের বড় জমায়েত এড়িয়ে চলতে এবং সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছে।

আরও পড়ুন