যৌন অসদাচরণ: জাতিসংঘের তদন্তে প্রমাণ না মিললেও ভোটে অপসারিত হলেন আইসিসির করিম খান
যৌন অসদাচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে সদস্যদেশগুলোর পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিজ’।
তবে করিম খানের আইনি দল এ সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
২০২৪ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন করিম খান। পরে ওই বছরের শেষ দিকে আইসিসির বিচারকেরা সেই পরোয়ানা আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করেন।
২০২৪ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন করিম খান। এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র তোপের মুখে পড়ে আইসিসি। এমন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে গতকাল তাঁকে অপসারণের প্রশ্নে ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
এ পরোয়ানা জারি করার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র তোপের মুখে পড়ে আইসিসি। এমন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার তাঁকে অপসারণের প্রশ্নে ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
করিম খানের আইনি দলের প্রধান তায়াব আলী জানান, জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর ‘ওআইওএস’–এর তদন্তে করিম খানের বিরুদ্ধে কোনো অসদাচরণ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একটি জুডিশিয়াল প্যানেলও সর্বসম্মতভাবে এ সিদ্ধান্ত দিয়েছিল।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জেরে এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন করিম খানসহ আইসিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
তায়াব আলী বলেন, এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব করিম খানের ব্যক্তিগত বিষয়ের চেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত গড়াবে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের এ ধরনের অপসারণপ্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা উচিত, যা রাজনৈতিক, আইনগতভাবে অন্যায্য কিংবা কোনো স্বাধীন জুডিশিয়াল বডির সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব করিম খানের ব্যক্তিগত বিষয়ের চেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত গড়াবে।
এই আইনজীবী অভিযোগ করেন, একদিকে আদালত যখন তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে, অন্যদিকে করিম খান নিজেই যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন, ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ভোটের মাধ্যমে তাঁকে অপসারণ করা হলো।
অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসার প্রায় দুই বছর পর আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলো করিম খানকে অপসারণের অনুমোদন দিল। ৫৬ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ ব্যারিস্টার গত জুনে নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এর আগে আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পরিষদের একটি তদারকি প্যানেল সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে তিনি ‘গুরুতর অসদাচরণ’ করেছেন।
আইসিসি গতকাল জানায়, এখন থেকে করিম খানের দপ্তরের দায়িত্ব পালন করবেন উপপ্রধান কৌঁসুলি নজহাত শামিন খান ও মামে মান্দিয়ায়ে নিয়াং।
তায়াব আলী বলেন, ‘করিম খানকে এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে, যেখানে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগই দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ পর্যালোচনা করা স্বাধীন বিচারকদের সিদ্ধান্তও উপেক্ষা করা হয়েছে।’
করিম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা নারী, যাঁর পরিচয় শুধু ‘সারাহ’ নামে প্রকাশ করা হয়েছে, সম্প্রতি সিএনএনকে বলেন, করিম খানের আচরণ ধীরে ধীরে আরও স্পর্শকাতর ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তিনি এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দেন, যেখানে তাঁর দাবি, তিনি ঘুমের ভান করে থাকাকালে করিম খান তাঁর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়েছিলেন।
করিম খান বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত নিয়ে তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তবে ২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়ার সিদ্ধান্তের পর নানা মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন তিনি।
করিম খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, যে প্রক্রিয়ায় ভোটাভুটি হয়েছে, তা ছিল প্রক্রিয়াগতভাবে অন্যায্য এবং প্রমাণসমর্থিত নয়।
করিম খান বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত নিয়ে তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তবে ২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়ার সিদ্ধান্তের পর নানা মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছেন, করিম খানের বিরুদ্ধে এ মামলা ‘স্পষ্টতই আইসিসির বিরুদ্ধে পরিচালিত বৃহত্তর আক্রমণের অংশ’।
করিম খানকে অপসারণের মধ্য দিয়ে নতুন আইসিসি প্রধান কৌঁসুলি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে এ বিষয়ে ভোট আগামী বছরের আগে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ওপরও এ সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, ওই পরোয়ানা প্রত্যাহার করতে পারেন শুধু আইসিসির বিচারকেরা।
তবে এ খবরে আইসিসির তদন্তের সমালোচনায় নতুন করে সরব হয়েছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।