জলবায়ু পরিবর্তন রোধে চার্লসের অবস্থান

১৯৬৮ সাল থেকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব নিয়ে সোচ্চার হন চার্লস। তখন থেকে এটি মূলধারার ইস্যুতে পরিণত হয়। কারও কারও জন্য এটি আবার রাজনৈতিক ইস্যুও হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির এক অন্যতম সমর্থক ছিলেন চার্লস। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রকে এ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেন।

২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম চলার ফাঁকে সিএনএনের ওই সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দেন চার্লস। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়িত হওয়ার ব্যাপারে তখনো আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। চার্লস বলেন, ‘প্রতি মাসে উষ্ণতা বৃদ্ধির নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। আমরা এভাবে চলতে দিতে পারি না। আমরা যদি হাল ছেড়ে দিই এবং দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলতে দিই, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চার্লসকে পরিবেশ রক্ষায় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। ২০২১ সালের নভেম্বরে গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ ২৬ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমাধান বের করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার জন্য দেশগুলোকে অনুরোধ করেন তিনি।

চার্লস বলেন, ‘আমরা জানি, এতে শতকোটি নয়, লাখো কোটি ডলার খরচ হবে।’
জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার কারণে মহাহুমকি তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে চার্লস বলেছিলেন, এগুলো মোকাবিলায় যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।

স্পষ্টবাদী বক্তব্য

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব কাজকে চার্লস গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধি করেন, সেগুলো নিয়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেন না। রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার পরও বিভিন্ন সময় তাঁকে তাঁর আশা ও ভীতির কথা প্রকাশ করে ফেলতে দেখা গেছে। সিংহাসনের উত্তরাধিকার নয়, বরং কখনো কখনো তাঁর বক্তব্য প্রচারকের মতো হয়ে যেতে দেখা গেছে। এ জন্য নানা সমালোচনার মুখেও পড়েছেন সাবেক এই প্রিন্স অব ওয়েলস। অনেকে তখন সমালোচনা করেছিলেন যে চার্লস রাজতন্ত্রের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করছেন।

জিনগতভাবে পরিবর্তিত (জেনেটিক্যালি মডিফায়েড) উৎপাদিত শস্য থেকে শুরু করে হোমিওপ্যাথি ওষুধ এবং কৃষিসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইস্যুতে চার্লস স্পষ্টভাবে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন। এ বৈশিষ্ট্য তাঁকে তাঁর মায়ের থেকে আলাদা করে তুলেছে। কাউকে আক্রমণ করা কিংবা খেপিয়ে না তোলার নীতিতে চলতেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। বড়জোর কোনো কিছু নিয়ে নিজের মতামত জানাতেন তিনি।

তবে চার্লস সব সময়ই মায়ের নেতৃত্বের ধরন অনুসরণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন। রাজসিংহাসনে বসার পর অন্য কারও বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবেন বলেও অতীতে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

২০১৮ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘সফল হতে হলে আমাকে পুরোপুরি তাঁর (রানি এলিজাবেথ) মতো হতে হবে, এমন ধারণা একেবারেই সারবত্তাহীন।’ এ দুটোকে পুরোপুরি ভিন্ন বিষয় বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

সামাজিক ইস্যু নিয়ে কাজের আগ্রহ

ঐতিহ্যগত শিল্পকলা ও দক্ষতা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে দ্য প্রিন্স’স ফাউন্ডেশন নামক একটি দাতব্য সংস্থা গড়ে তুলেছেন চার্লস। সেটি পরিচালনা করেন কেনেথ ডুন্সমুইর। তিনি বলেন, সামাজিক ও বাস্তুগত ইস্যুগুলো নিয়ে চার্লস ভাবেন। এগুলোর সঙ্গে বেশি বেশি করে যুক্ত হতে পারার কারণে এমনটা হয়ে থাকে।

ডুন্সমুইর মনে করেন, সবচেয়ে দীর্ঘ সময় চার্লস প্রিন্স ওয়েলস হিসেবে কাজ করেছেন। সে কাজ দারুণভাবে সম্পন্ন করেছেন তিনি।

চার্লস অধৈর্য হয়ে পড়েন

সিএনএনের ওই সাংবাদিকের মতে, প্রিন্স অব ওয়েলসের ভূমিকাকে চার্লসের অনেক পূর্বসূরি প্লে বয়ের মতো জীবন যাপন করা এবং নিশ্চিত আয়ের উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে চার্লস একে পেশাদারত্ব দিয়েছিলেন এবং এ দায়িত্বকে নিজের মতো করে নিয়েছিলেন। তিনি উত্তরাধিকার চেয়েছিলেন, তবে রাজা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইতেন না তিনি। সিএনএনের সাংবাদিক ম্যাক্স ফস্টারের দৃষ্টিতে চার্লস অধৈর্য এবং বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকারী মানুষ। নিজের নেওয়া কোনো প্রকল্প কাজ না করলে কিংবা ফলপ্রসূ না হলে তিনি বেশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

১৪টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হবেন চার্লস

রানির মৃত্যুর পর চার্লসই এখন ৫৬টি স্বাধীন দেশের জোট কমনওয়েলথের প্রধান। এরই সঙ্গে যুক্তরাজ্যসহ কমনওয়েলথভুক্ত ১৪টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বিবেচিত হবেন তিনি। এই ১৪টি দেশ হলো অস্ট্রেলিয়া, অ্যান্টিগা ও বারবুডা, বাহামা, বেলিজ, কানাডা, গ্রেনাডা, জ্যামাইকা, পাপুয়া নিউগিনি, সেন্ট ক্রিস্টোফার ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাদিনেস, নিউজিল্যান্ড, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, টুভ্যালু।

আগামী কয়েক দিনে চার্লসকে একই সঙ্গে রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং মায়ের মৃত্যুশোক কাটিয়ে ওঠা—দুটোই করতে হবে।