default-image

সি ও পুতিন—দুজনই সমরখন্দ গিয়েছিলেন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে। আট দেশ নিয়ে গঠিত এ নিরাপত্তা জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন ও রাশিয়া। চলতি সপ্তাহে জোটে পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে ইরানও।

ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান শুরুর পর ২০০ দিনের বেশি সময় গড়িয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে। খবর এসেছে ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে রুশ বাহিনীর পিছু হটার। এমন বাস্তবতায় পুতিনের অভ্যর্থনায় উপস্থিত না থেকে সাভকাতের কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ রাশিয়ার সঙ্গে উজবেকিস্তানের সম্পর্কের মোড় বদলের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। এ নিয়ে লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্সের উজবেকিস্তান বংশোদ্ভূত পরিচালক আলিশের উলখামভ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘পুতিনকে সম্পদ নয়, বরং বোঝা হিসেবে ধরে নিয়ে এমন আচরণ করা হচ্ছে। এ যেন একজন পরাজিত ব্যক্তিকে সহ্য করা।’  

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে অভিযান শুরুর আগে এটাই মনে হচ্ছিল যে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে পুতিনের প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আগের মাস জানুয়ারিতে কাজাখস্তানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ থামাতে রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সিএসটিও) কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই জোটের কয়েক শ সেনাসদস্যকে কাজাখস্তানে পাঠানো হয়।

পুতিন যখন শীর্ষে

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে অভিযান শুরুর আগে এটাই মনে হচ্ছিল যে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে পুতিনের প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আগের মাস জানুয়ারিতে কাজাখস্তানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ থামাতে রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সিএসটিও) কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই জোটের কয়েক শ সেনাসদস্যকে কাজাখস্তানে পাঠানো হয়।

২০২১ সালের আগস্টে পশ্চিমা সমর্থিত আফগান সরকারকে হটিয়ে দেশটির দখল নেয় তালেবান। ওই ঘটনা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা পাওয়া মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে রাশিয়ার প্রভাব বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল।

‘যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে আমরা একটি নতুন জোট গড়ে উঠতে দেখব। সেটি রাশিয়াকেন্দ্রিক হবে না। এটি গড়ে উঠবে বেইজিং ও তার কমরেডদের তৈরি করা ছাঁচে।’  
ইগার তিশকেভিচ, কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক

এর আগের বছরে সিএসটিও সদস্য আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করে রাশিয়া। ওই অঞ্চলে কয়েক হাজার শান্তিরক্ষীও মোতায়েন করে ক্রেমলিন। নাগার্নো-কারাবাখ অঞ্চলে সংঘর্ষের জেরে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধ থামাতেই শান্তিচুক্তির ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল রাশিয়া।

আগে থেকেই অবশ্য আর্মেনিয়ায় রাশিয়ার সেনাঘাঁটি ছিল। আর জর্জিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অঞ্চলেও দেশটির সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে। ইরান ও তুরস্কের সীমান্ত–সংলগ্ন দক্ষিণ ককেশাসে এ দেশগুলোয় রুশ সেনা উপস্থিতির অর্থ হলো, এ অঞ্চলে সামরিক দিক দিয়ে কৌশলগতভাবে এগিয়ে রয়েছে মস্কো।

মধ্যপ্রাচ্যেও রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। রুশ সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ওই অঞ্চলে সোভিয়েত সরকারের যে প্রভাব ছিল, তার কিছুটা ফিরিয়ে আনতে মস্কোকে সহায়তা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে রুশ বোমারু বিমানগুলো। দীর্ঘদিন ধরে চলা সিরিয়া যুদ্ধকে ক্রেমলিন ব্যবহার করেছে তাদের নতুন সব সমরাস্ত্রের প্রচার চালাতে এবং সেগুলোর বিক্রি বাড়াতে।

default-image

‘কাগুজে বাঘ’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়া এবং নিষেধাজ্ঞার চাপের মুখে থাকা রাশিয়ার ইউক্রেনে বিপত্তিতে পড়া নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে এনেছে, যেমনটা দেখা গেছে চলতি সপ্তাহে নাগার্নো-কারাবাখে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায়।

যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক কেভর্ক ওস্কানিয়ান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইউক্রেনে দুর্বল হওয়া রাশিয়া আজারবাইজানের রাজধানী বাকুকে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। এর মধ্য দিয়ে মস্কো এটাই দেখিয়েছে যে নাগার্নো-কারাবাখে শান্তিরক্ষা মিশনের বাইরে গিয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপে তাদের কোনো ইচ্ছা নেই।’  

‘পুতিনকে সম্পদ নয়, বরং বোঝা হিসেবে ধরে নিয়ে এমন আচরণ করা হচ্ছে। এ যেন একজন পরাজিত ব্যক্তিকে সহ্য করা।’
আলিশের উলখামভ, লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্সের পরিচালক  

কাজাখস্তানে প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভের একটি বক্তব্যও গত জুনে ক্রেমলিনে অনেকের কাছে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পুতিনের পাশে বসেই তখন তিনি বলেছিলেন, ইউক্রেনে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোকে স্বীকৃতি দেবে না তাঁর দেশ।  

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ইরানের তৈরি ড্রোন ও উত্তর কোরিয়ার সমরাস্ত্র কিনতে রাশিয়া চুক্তি করেছে বলে সম্প্রতি যে খবর বেরিয়েছে, তা থেকে এটাই বোঝা যায়, মস্কো কতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবং তাদের সমরাস্ত্র শিল্প খাত কতটা পশ্চিমা মাইক্রো চিপের ওপর নির্ভরশীল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ইরানের তৈরি ড্রোন ও উত্তর কোরিয়ার সমরাস্ত্র কিনতে রাশিয়া চুক্তি করেছে বলে সম্প্রতি যে খবর বেরিয়েছে, তা থেকে এটাই বোঝা যায়, মস্কো কতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবং তাদের সমরাস্ত্র শিল্প খাত কতটা পশ্চিমা মাইক্রো চিপের ওপর নির্ভরশীল।

পশ্চিমা চাপে বেইজিংমুখী মস্কো

মস্কোভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি পলিটিকার বিশেষজ্ঞ তেমুর উমারভ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধের আগেও রাশিয়াকে চীনের যতটা দরকার ছিল, তার চেয়ে বেশি চীনকে রাশিয়ার দরকার ছিল। আর যুদ্ধ শুরুর পর এ নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে।’  

রাশিয়ার এ নির্ভরশীলতা সবচেয়ে বেশি জ্বালানি খাতে। জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটির বড় বাজার ছিল ইউরোপ। তবে যুদ্ধ শুরুর পর তাদের জ্বালানি বিক্রির জন্য চীনের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে। প্রযুক্তি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা চেপেছে মস্কোর ঘাড়ে। এ কারণে তাদের চীনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। তেমুর উমারভ বলেন, বিশ্বের প্রযুক্তিবাজার থেকে রাশিয়া একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তাদের সামনে এখন আছে শুধু চীন।

তবে রাশিয়ার কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তত্কালীন সোভিয়েতভুক্ত দেশগুলোর চীনের দিকে ঝুঁকে পড়াটা—বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর। কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক ইগার তিশকেভিচ ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে আমরা একটি নতুন জোট গড়ে উঠতে দেখব। সেটি রাশিয়াকেন্দ্রিক হবে না। এটি গড়ে উঠবে বেইজিং ও তার কমরেডদের তৈরি করা ছাঁচে।’

চীনা প্রেসিডেন্টের অভ্যর্থনা

কিরগিজস্তানে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এমনকি রাশিয়ায় দেশটির অন্তত ১০ লাখ নাগরিক শ্রমিক হিসেবে অবস্থান করছেন। এরপরও এসসিও সম্মেলনের প্রথম দিনে একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার আগে পুতিনকে কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

সমরখন্দে পৌঁছানোর আগে কাজাখস্তানে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন জাপারভ। এ সময় চীনা প্রেসিডেন্ট তাঁকে বলেন, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে মস্কোর কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখবে বেইজিং।

এদিকে কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট তোকয়েভকে সি চিন পিং বলেন, ‘বিশ্বে দৃষ্টিভঙ্গি যেভাবেই বদলাক না কেন, কাজাখস্তানকে তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় শেষ পর্যন্ত সমর্থন করবে চীন। আর আপনার দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো শক্তির হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াব।’

এ কাজাখস্তানকে আগস্টের শুরুর দিকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা দিমিত্রি মেদভেদেভ রুশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘একটি ভুয়া রাষ্ট্র’ আখ্যায়িত করেছিলেন। এমনকি দেশটির নেতারা রুশ জাতিগোষ্ঠীর লোকজনের ওপর ‘গণহত্যা’ চালিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখলের আগে এবং চলতি বছরে ইউক্রেন অভিযান শুরুর আগেও ‘গণহত্যা’ নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল রাশিয়া।

পরে অবশ্য কাজাখস্তানের নেতাদের বিরুদ্ধে আনা ওই অভিযোগ নিয়ে মেদভেদেভের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পেজটি ‘হ্যাকড’ হয়েছিল। ওই পোস্টও সরিয়ে দেওয়া হয়।

কাজাখস্তানের উত্তরাঞ্চলে রুশ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ বসবাস করে। গত জুনে রুশ আইনপ্রণেতা কনস্তানতিন জাতুলিন ইঙ্গিত দেন, এ অঞ্চল কাজাখস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় রাশিয়া। তিনি বলেন, কাজাখস্তানে এমন অনেক শহর রয়েছে, যেখানে রুশ লোকজন সংখ্যাগরিষ্ঠ। এগুলোকে কাজাখস্তানের বলার কোনো দরকারই নেই।

অনেক পর্যবেক্ষকের বিশ্বাস, ইউক্রেনে রাশিয়া কোণঠাসা হওয়ার পর তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে মস্কোর আধিপত্য কমছে। নির্বাসনে থাকা রুশ অ্যাকটিভিস্ট সের্গেই বিজুকিনের কথায়, ‘এ প্রক্রিয়া আগেই শুরু হয়েছিল, আর এখন তা আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, এ অঞ্চলে রাশিয়া এখন আর অবিসংবাদিত নেতা নয়। এ কারণেই বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে তারা নিজেদের নীতিগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে।’

অনেকেই আবার ইউক্রেন যুদ্ধকে মেলাচ্ছেন ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত এক দশক ধরে চলা সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পেছনে এ যুদ্ধের ভূমিকার সঙ্গে। নির্বাসনে থাকা উজবেকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতা নিগারা খিদৌয়িতোভা বলেন, ‘আমি মনে করি, রাশিয়ার জন্য আবার একই ধরনের পরিণতি অপেক্ষা করছে।’

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন