যুক্তরাজ্যে দিনে ৩০ মিনিট হাঁটলেই পাওয়া যাবে পুরস্কার
দিনে ৩০ মিনিট হাঁটলেই পুরস্কার দেবে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ (এনএইচএস)। ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস গড়তে এনএইচএস এখন ‘স্ট্রিক’ বা ধারাবাহিকতা রক্ষার সংস্কৃতির ওপর জোর দিচ্ছে। সুস্বাস্থ্যের জন্য বেশি হাঁটার প্রয়োজনীয়তা অনেক আগে থেকেই স্বীকৃত। তবে এবারই প্রথম ব্যায়ামের বিনিময়ে মানুষকে সরাসরি পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করছে এনএইচএস পারিচালিত একটি প্রকল্প।
আগামী বছরের শুরুতে এনএইচএস ইংল্যান্ড ‘ম্যারাথন আ মান্থ’ বা মাসে এক ম্যারাথন নামের একটি চ্যালেঞ্জ চালু করবে। এই প্রকল্পে মানুষকে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার আহ্বান জানানো হবে। যাঁরা প্রতিদিন নিয়ম মেনে চলবেন, মাস শেষে তাঁদের হাঁটার মোট দূরত্ব দাঁড়াবে প্রায় ২৬ মাইল। এটি একটি পূর্ণ ম্যারাথনের সমান দূরত্ব।
অংশগ্রহণকারীরা স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ বা অনলাইনে তাঁদের হাঁটার তথ্য জমা দিতে পারবেন। এনএইচএস জানিয়েছে, এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে শেষ করলে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন পুরস্কার পাবেন। পুরস্কারের তালিকায় বিশেষ ছাড় ও বিভিন্ন উপহারের মতো প্রণোদনা থাকতে পারে। এই উদ্যোগকে দারুণ একটি প্রকল্প মনে করছেন লরেন অ্যান্ড্রু।
অ্যান্ড্রু বলেন, ‘আমি এতে অংশ নেব। প্রতিদিন অল্প করে হাঁটা রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে। জিমে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও হাঁটা তো একদম ফ্রি।’ তবে পুরস্কার হিসেবে কেবল মূল্যছাড়েই তিনি সন্তুষ্ট নন। তিনি যোগ করেন, হাঁটার বিনিময়ে যদি পানীয় বা খাবারের মতো কোনো উপহার পাওয়া যায়, তবে তা মানুষকে আরও আগ্রহী করে তুলবে।
বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে ২৫ বছরের কম বয়সীরা এই প্রকল্প নিয়ে বেশ উৎসাহ দেখিয়েছেন। এক তরুণী জানান, গেমের মতো এই চ্যালেঞ্জ তাঁকে আরও সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করবে। নিয়মিত হাঁটার ধারাবাহিকতা বা ‘স্ট্রিক’ রক্ষা করার বিষয়টি তাঁকে ও তাঁর বন্ধুদের দারুণ অনুপ্রাণিত করবে। আবার কেউ কেউ মাসে এমনিতেই ম্যারাথনের সমান পথ হাঁটেন।
এসব তরুণ–তরুণী বাড়তি পাওনা হিসেবে এই পুরস্কারকে স্বাগত জানিয়েছেন। তহবিলের বিষয়ে এনএইচএস জানিয়েছে, তারা প্রকল্পের প্রাথমিক খরচ বহন করবে। তবে ভবিষ্যতে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুদান বা জনহিতকর সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
অলিম্পিক পদকজয়ী স্যার ব্রেন্ডন ফস্টারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এই প্রকল্পটি সাজানো হচ্ছে। এনএইচএস ইংল্যান্ড তাঁকে একটি প্রচার পরিকল্পনা তৈরির অনুরোধ জানিয়েছিল। স্যার ব্রেন্ডন বলেন, ‘আমি দৌড়ের জন্য পরিচিত হতে পারি। কিন্তু এই প্রকল্পের লক্ষ্য খুব সহজ। আমরা চাই মানুষ কেবল হাঁটুক।’ এটি ইংল্যান্ডের ১০ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ।
বিবিসিকে ব্রেন্ডন জানান, মানুষকে আরও কর্মচঞ্চল করে তোলাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। এনএইচএস ইংল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি ছয়টি মৃত্যুর মধ্যে একটির পেছনে শারীরিক পরিশ্রমের অভাব দায়ী। সপ্তাহে যাঁরা ৩০ মিনিটের কম পরিশ্রম করেন, তাঁদের অলস বা পরিশ্রমহীন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। স্পোর্ট ইংল্যান্ডের এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশটির প্রায় ২৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো শারীরিক পরিশ্রম করতেন না। সংখ্যার হিসাবে এটি প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ।
এই প্রকল্পে অন্তত ১ লাখ মানুষকে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাঁদের প্রতিদিনের তথ্য রেকর্ড করা হবে। স্যার ব্রেন্ডন বলেন, লক্ষ্য পূরণ হলে এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ম্যারাথন। তিনি আশা করছেন, স্ন্যাপচ্যাট বা ডুয়োলিংগোর মতো ধারাবাহিকতা রক্ষার অভ্যাস মানুষকে এই চ্যালেঞ্জে ধরে রাখবে। এতে জনস্বাস্থ্যের উন্নতির পাশাপাশি এনএইচএস-এর অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে। সপ্তাহে ৫ দিন ৩০ মিনিট করে হাঁটলে মানুষ বাড়তি ৪ বছর আয়ু পেতে পারে বলে তিনি জানান।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য ও নিবন্ধনপ্রক্রিয়া জানানো হবে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, এনএইচএস সরাসরি পুরস্কারের খরচ দেবে না। তারা সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে প্রকল্পটি পরিচালনা করবে। চিকিৎসকদেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেন তাঁরা রোগীদের এই প্রকল্পে উৎসাহিত করেন।
অ্যাকশন অন সল্ট অ্যান্ড সুগারের গবেষণাপ্রধান সোনিয়া পম্বো বলেন, দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
একে সহজ ও পুরস্কারযোগ্য করে তুললে অনেক বেশি মানুষ আগ্রহী হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সরকার যদি জনস্বাস্থ্য নিয়ে সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে এ ধরনের উদ্যোগের পাশাপাশি আরও কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে।