লন্ডনে বসবাস করা ‘কোভিড হিরো’ দবিরুল ইসলাম চৌধুরী মারা গেছেন

বাগানে হেঁটে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন দবিরুল ইসলাম চৌধুরীছবি: সংগৃহীত

মারা গেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক দবিরুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর বয়স হয়েছিল ১০৬ বছর। কোভিড-১৯ মহামারির সময় লন্ডনে নিজের বাড়ির বাগানে হেঁটে দাতব্য কাজের জন্য তিনি ৪ লাখ ২০ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। সে সময় ‘কোভিড হিরো’ নামে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে খবর প্রকাশ পেয়েছিল।

দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর বড় ছেলে আতিক চৌধুরী বলেন, স্থানীয় সময় ১৩ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১টা ২০ মিনিটে তিনি পূর্ব লন্ডনের রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

হেঁটে তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে দবিরুল ইসলামের অনুপ্রেরণা ছিলেন টম মুর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টম মুর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন। ক্যাপ্টেন টম মুর তাঁর ১০০তম জন্মদিন উপলক্ষে নিজ বাড়ির বাগানে ১০০ বার হেঁটে প্রায় ৩ কোটি ৮৯ লাখ পাউন্ড সংগ্রহ করেছিলেন। ওই অর্থ তিনি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকে (এনএইচএস) সাহায্যের জন্য দান করেছিলেন।

সেই অনুপ্রেরণায় দবিরুল ইসলাম চৌধুরী করোনার সময় নিজের বাগানে হাঁটা শুরু করেন। এটা ২০২০ সালের ঘটনা। তখন কোভিড মহামারি চলছে। পূর্ব লন্ডনের বো এলাকায় নিজ বাড়ির বাগানে ৯৭০ বার চক্কর দিয়ে তিনি এই অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি পবিত্র রমজান মাসে রোজা রেখেই হাঁটাহাঁটি চালিয়ে গিয়েছিলেন।

পরিবার জানিয়েছে, স্থানীয় সময় আজ ১৫ জানুয়ারি বাদ জোহর পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেন জামে মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে নিউহ্যামের উডগ্রাঞ্জ পার্ক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর সংগ্রহ করা অর্থের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার পাউন্ড দেওয়া হয় যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকে (এনএইচএস)। বাকি অর্থ ৫২টি দেশের ৩০টি দাতব্য সংস্থার মধ্যে বণ্টন করা হয়। তাঁর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয় রমজান ফ্যামিলি কমিটমেন্টের (আরএফসি) কোভিড-১৯ সংকটকালের কর্মসূচির আওতায়। দবিরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন এই সংগঠনের একজন শুভেচ্ছাদূত।

কোভিড মহামারির সময় তাঁর এই মানবিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে দবিরুল ইসলাম চৌধুরী প্রয়াত ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বেসামরিক সম্মাননা খেতাব ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (ওবিই) লাভ করেন।

মানবিক কাজের ধারাবাহিকতায় ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহ ও সংহতি প্রকাশের জন্য ২০২২ সালে দবিরুল ইসলাম চৌধুরী নিজ বাড়িতে সারা বিশ্বের মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশ, কানাডা, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে মানুষ অনলাইনে যুক্ত হন। সে সময় তিনি নিজের বাগানে দাঁড়িয়ে ১০২ সেকেন্ড নীরবতা পালন করেন।

দবিরুল ইসলাম চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত

তখন এক সাক্ষাৎকারে দবিরুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘ওখানে অনেক মানুষ না খেয়ে আছে, অনেক মানুষ ক্ষুধার্ত। অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। আমি তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।’

দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে আতিক চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বাবার মৃত্যুর খবর জানিয়ে আরও বলেন, ‘আজীবন তাঁর (দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর) মানবিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতি পরিবার কৃতজ্ঞ।’

দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম ১৯২০ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ আসামে, বর্তমানে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ গ্রামে। ১৯৫৭ সালে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা অর্জনে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।

আরও পড়ুন

পরবর্তী সময়ে দবিরুল ইসলাম চৌধুরী কমিউনিটি নেতা হিসেবে পরিচিতি হয়ে ওঠেন এবং লন্ডনে উপকণ্ঠ সেন্ট অ্যালবান্সে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের সময়সহ নানা সামাজিক উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহে তিনি ভূমিকা রাখেন।

দবিরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন একজন কবি। নিজের লেখা হাজারের বেশি কবিতা প্রকাশ করেছেন। নিয়মিত বই পড়ার চক্র ও কবিসংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

পরিবার জানিয়েছে, স্থানীয় সময় আজ ১৫ জানুয়ারি বাদ জোহর পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেন জামে মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে নিউহ্যামের উডগ্রাঞ্জ পার্ক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

আরও পড়ুন