রাশিয়ার জ্বালানি না পেয়ে বিপাকে ভারতের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার নায়ারা এনার্জি

ভারতের আহমেদাবাদে নায়ারা এনার্জির একটি ফুয়েল স্টেশনফাইল ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ার জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যে ও বাণিজ্যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে ভারতের বৃহৎ তেল শোধনাগার ও জ্বালানি তেল বিপণন সংস্থা নায়ারা এনার্জির ওপরও। কারণ, রাশিয়া থেকে তাদের তেল আমদানিতে বেশ ভাটা পড়েছে।

শিপিং রিপোর্ট ও এলএসইজির তথ্য অনুযায়ী, নায়ারা এনার্জিকে এখন অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহনের জন্য ‘ডার্ক ফ্লিট’-এর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

‘ডার্ক ফ্লিট’ বলতে বোঝায় এমন জাহাজ বা ট্যাংকারের বহর যেগুলো ‘ট্র্যাকিং’ এড়াতে রাডার ফাঁকি দিয়ে চলাচল করে। এসব জাহাজ বা ট্যাংকারে মূলত নিষিদ্ধ পণ্য বা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পণ্য পরিবহন করা হয়।

ভারতে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল পরিশোধন করা হয়, তার প্রায় ৮ শতাংশ আসে নায়ারা থেকে। ভারত দৈনিক গড়ে প্রায় ৫২ লাখ ব্যারেল জ্বালানি পরিশোধন করে।

কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গত মাসে আরোপ করা একটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে যাওয়ায় নায়ারা এনার্জিকে এখন জ্বালানি পরিবহনে বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ, কোম্পানিটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনকারী সংস্থাগুলো তাদের পণ্য পরিবহনে রাজি হচ্ছে না। এর ফলে নায়ারা এনার্জি তাদের শোধনাগারে অপরিশোধিত তেলের প্রক্রিয়াকরণ কমাতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ ভারত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশটি একতরফা কোনো নিষেধাজ্ঞা অনুসরণ করে না, শুধু জাতিসংঘের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে।

ভারতে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল পরিশোধন করা হয়, তার প্রায় ৮ শতাংশ আসে নায়ারা থেকে। ভারত দৈনিক গড়ে প্রায় ৫২ লাখ ব্যারেল জ্বালানি পরিশোধন করে।

এ নীতির ফলে ভারতের তেল শোধনাগারগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশ ও কোম্পানি থেকে তেল আমদানি করতে পারে। এমনকি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজেও পণ্য পরিবহন করে।

শিপিং রিপোর্ট ও এলএসইজির তথ্য অনুযায়ী, এই মাসে নায়ারা অন্তত সাতটি কার্গোতে করে রাশিয়ার তেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে ছিল নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজ সেঞ্চুরিয়ান, মার্স ৬, পুষ্পা, হোরায়ে এবং দেবিকা (আগের নাম অপার)।

আরও পড়ুন

তথ্য অনুযায়ী, সেগুলো প্রায় সাত লাখ ব্যারেল রুশ উরালস ক্রুড বহন করেছে। উরালস ক্রুড রাশিয়ার প্রধান অপরিশোধিত তেল, যা দেশটি রপ্তানি করে।

নিষেধাজ্ঞার কারণে পণ্য পরিবহন নিয়ে অসুবিধায় পড়ার বিষয়ে কথা বলতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে নায়ারা এনার্জির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সাড়া মেলেনি।

নায়ারা রাশিয়ার প্রধান তেল কোম্পানি রসনেফট থেকে তেল সরবরাহ পাচ্ছে এবং তারা কোনো সমস্যার মধ্যে নেই।...
এভগেনি গ্রিভা, ভারতে রাশিয়ার ডেপুটি ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ

নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে নায়ারা গুজরাটের পশ্চিমাঞ্চলের ভাদিনার পরিশোধনাগারে প্রতিদিন গড়ে চার লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদন করত। তাদের পরিশোধিত জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশ দেশজুড়ে ৬ হাজার ৬০০-এর বেশি জ্বালানি স্টেশনের মাধ্যমে বিক্রি হতো এবং বাকি অংশ রপ্তানি করা হতো।

নায়ারা এনার্জির বেশির ভাগ শেয়ারের মালিক রাশিয়ার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে রসনেফটও আছে।

রাশিয়া সরকারের মালিকানাধীন রসনেফট দেশটির অন্যতম বৃহত্তম জ্বালানি কোম্পানি। এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও বটে।

পণ্য পরিবহনে অসুবিধার কারণে নায়ারা এনার্জি তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়েছে। কোম্পানিটি এখন নিজেদের পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজ পাওয়া নিশ্চিত করতে এবং শোধনাগারের কার্যক্রম স্থিতিশীল রাখতে ভারত সরকারের কাছে সহায়তা চাইছে।

একটি শিপিং সূত্র বলেছে, বিদেশে পণ্য পরিবহন করা ভারতীয় শিপিং লাইনগুলো নায়ারা এনার্জির তেল ও শোধিত পণ্য পরিবহন করতে রাজি হচ্ছে না। একসময় নিয়মিত নায়ারার পণ্য পরিবহন করা একটি কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বলেন, এখন নায়ারার পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে তারা তাদের জাহাজের জন্য বিমার সুরক্ষা (বিমা কাভারেজ) পাচ্ছে না।

আরও পড়ুন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গত মাসে আরোপ করা একটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে যাওয়ায় নায়ারা এনার্জিকে এখন জ্বালানি পরিবহনে বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ, কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনকারী সংস্থাগুলো তাদের পণ্য পরিবহনে রাজি হচ্ছে না।

আরেকটি শিপিং সূত্র বলেছে, রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো নায়ারার জন্য জাহাজের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করছে।

এলএসইজি ট্রেড ফ্লোরের তথ্য অনুযায়ী, নায়ারা তাদের জ্বালানি পণ্য, বিশেষ করে পেট্রল ও ডিজেল পরিবহনের জন্য নেক্সট, টেম্পেস্ট ড্রিম, লেরু, নোভা, ভার্গ, সার্ড এবং ইউরিয়েল নামের ট্যাংকার বা তেলবাহী জাহাজ ব্যবহার করত। এসব জাহাজ ইইউর নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে গেছে। যদিও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার পর কয়েক জাহাজের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখা হয়েছে।

ভারতে রাশিয়ার বাণিজ্য উপপ্রতিনিধি এভগেনি গ্রিভা বুধবার বলেছেন, নায়ারা রাশিয়ার প্রধান তেল কোম্পানি রসনেফট থেকে তেল সরবরাহ পাচ্ছে এবং তারা কোনো সমস্যার মধ্যে নেই।

আরও পড়ুন