অস্ত্রোপচারে এআই: ভুল চিকিৎসা ও ভুল অঙ্গ শনাক্তের অভিযোগ

লিংকডইনে অ্যাক্লারেন্টের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাদের ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেমের একটি এআই সুবিধা দেখানো হয়েছে। ‘ট্রুপাথ’ নামের এই ফিচার সার্জনদের দুটি নির্ধারিত বিন্দুর মধ্যে ‘সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর পথ’ দেখায়
ভিডিওর স্ক্রিনশট: রয়টার্স

২০২১ সালে চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন এক ‘বিরাট অগ্রগতি’র ঘোষণা দিয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি সাইনোসাইটিসের চিকিৎসায় তাদের ব্যবহৃত একটি যন্ত্রে যুক্ত করা হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

জনসন অ্যান্ড জনসনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অ্যাক্লারেন্ট জানিয়েছিল, তাদের তৈরি ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’-এর সফটওয়্যারে এখন থেকে ‘মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম’ ব্যবহার করা হবে; যা নাক, কান ও গলাবিশেষজ্ঞদের অস্ত্রোপচারের সময় সহায়তা করবে।

এই চিকিৎসা সরঞ্জাম এর আগে বাজারে প্রায় তিন বছর ধরে প্রচলিত ছিল। সেই সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) যন্ত্রটির ত্রুটি নিয়ে সাতটি ও একজন রোগীর আহত হওয়ার বিষয়ে একটি ‘নিশ্চিত না হওয়া’ প্রতিবেদন পেয়েছিল। তবে যন্ত্রটিতে এআই যুক্ত করার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০০টি যান্ত্রিক ত্রুটি ও নেতিবাচক ঘটনার প্রতিবেদন জমা পড়েছে এফডিএর কাছে।

প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, ২০২১ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে অন্তত ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। অভিযোগগুলোর বেশির ভাগই ছিল এমন—অস্ত্রোপচারকালে রোগীর মাথার ভেতর চিকিৎসকের ব্যবহৃত যন্ত্রটি ঠিক কোথায় অবস্থান করছে, সে সম্পর্কে ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’ ভুল তথ্য দিয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেছে, এআই প্রযুক্তির সহায়তায় অস্ত্রোপচারের সময় এক রোগীর নাক দিয়ে মস্তিষ্কের তরল (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) চুইয়ে পড়েছিল। অন্য এক ঘটনায়, একজন সার্জন ভুলবশত রোগীর মাথার খুলির নিচের অংশ ফুটো করে ফেলেছিলেন। আরও দুটি ঘটনায়, প্রধান ধমনি দুর্ঘটনাবশত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই রোগী স্ট্রোকের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এফডিএর কাছে আসা প্রতিবেদনগুলো অসম্পূর্ণ হতে পারে এবং এগুলো চিকিৎসা বিভ্রাটের কারণ নিরূপণের জন্য তৈরি করা নয়। ফলে ঘটনাগুলোতে এআইয়ের ভূমিকা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ছিল, তা স্পষ্ট নয়।

চিকিৎসাযন্ত্র প্রস্তুতকারকেরা দ্রুতগতিতে তাঁদের পণ্যে এআই যুক্ত করছেন। নতুন এ প্রযুক্তি চিকিৎসাব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাবে বলে সমর্থকেরা দাবি করলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো রোগীদের আহত হওয়ার অভিযোগ ক্রমেই বেশি পাচ্ছে।

তবে স্ট্রোকের শিকার দুই ব্যক্তি টেক্সাসে মামলা করেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, ট্রুডি সিস্টেমের এআই তাঁদের শারীরিক ক্ষতির জন্য দায়ী। একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ‘সফটওয়্যারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার আগে পণ্যটি যতটা নিরাপদ ছিল, পরিবর্তনের পর এটি ততটা থাকেনি।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে মামলার এসব অভিযোগ যাচাই করতে পারেনি।

ট্রুডি ডিভাইস নিয়ে এফডিএর প্রতিবেদনের বিষয়ে জনসন অ্যান্ড জনসন কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করা হলে তারা ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। ২০২৪ সালে ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস অ্যাক্লারেন্ট ও ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম কিনে নেয়।

ইনটেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস বলেছে, প্রতিবেদনগুলো শুধু এটুকুই প্রমাণ করে যে যেখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ট্রুডি সিস্টেমটি ব্যবহৃত হচ্ছিল। তারা আরও বলেছে, ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম বা এআই প্রযুক্তির সঙ্গে কোনো আঘাত বা ক্ষতির সরাসরি যোগসূত্র থাকার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।’

এমন এক সময়ে এ ঘটনাগুলো সামনে আসছে; যখন এআই স্বাস্থ্যসেবার জগৎকে ‘বদলে’ দিতে শুরু করেছে। এর প্রবক্তারা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে নতুন এই প্রযুক্তি বিরল রোগের নিরাময় ও নতুন ওষুধ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে, সার্জনদের দক্ষতা বাড়াবে এবং রোগীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

কিন্তু রয়টার্স যখন নিরাপত্তা ও আইনি নথিপত্র পর্যালোচনা এবং চিকিৎসক, নার্স, বিজ্ঞানী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে; তখন চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের কিছু ঝুঁকিও উঠে এসেছে। ডিভাইস নির্মাতা, প্রযুক্তি জায়ান্ট ও সফটওয়্যার নির্মাতারা এখন এ প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

বর্তমানে এফডিএ অন্তত ১ হাজার ৩৫৭টি এআই–চালিত চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন দিয়েছে; যা ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।

শুধু ট্রুডি সিস্টেমই নয়, আরও অনেক এআই-চালিত যন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এফডিএ ডজনখানেক এআই-চালিত যন্ত্রের ত্রুটির প্রতিবেদন পেয়েছে। এর মধ্যে এমন একটি হার্ট মনিটর আছে; যেটি হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং একটি আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে; যা ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে শনাক্ত করেছে।

গত আগস্টে জামা হেলথ ফোরামে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জনস হপকিন্স, জর্জটাউন ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, এফডিএ অনুমোদিত ৬০টি এআই-চালিত চিকিৎসা সরঞ্জাম–সংশ্লিষ্ট ১৮২টি পণ্য প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে। তাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিভাইসগুলো অনুমোদনের এক বছরের মধ্যেই বাজার থেকে তুলে নিতে হয়েছে। সাধারণ চিকিৎসা সরঞ্জামের তুলনায় এআই-চালিত যন্ত্রের বাজার থেকে প্রত্যাহারের হার প্রায় দ্বিগুণ।

‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’-এর সফটওয়্যারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার আগে পণ্যটি যতটা নিরাপদ ছিল, পরিবর্তনের পর এটি ততটা থাকেনি।

এফডিএর পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক বিজ্ঞানী রয়টার্সকে বলেন, এআইয়ের এ জয়জয়কার সংস্থাটির জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের হারানোর পর এআই–সমৃদ্ধ চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো অনুমোদনের আবেদনের যে জোয়ার শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। এফডিএর অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠান মার্কিন স্বাস্থ্য ও জনসেবা বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাঁরা এ খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেক রূপ ‘জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট’ এখন চিকিৎসা খাতে জায়গা করে নিচ্ছে। অনেক চিকিৎসক সময় বাঁচাতে রোগীর তথ্য সংরক্ষণের মতো কাজে এআই ব্যবহার করছেন। তবে চিকিৎসকেরা এ–ও বলছেন যে অনেক রোগী নিজের রোগনির্ণয় করতে বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শের বিরোধিতা করতে চ্যাটবট ব্যবহার করছেন; যা নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

প্রায় তিন বছর আগে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর ব্যবসায়িক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি ও গুগলের জেমিনাই বা অ্যানথ্রোপিকের ক্লদ-এর মতো জনপ্রিয় চ্যাটবটগুলো কনটেন্ট (আধেয়) তৈরির জন্য ‘জেনারেটিভ এআই’ ব্যবহার করে। এগুলো মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি; যা মানুষের ভাষা বুঝতে ও তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ তথ্য এবং ডেটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এখন এসব এআই টুল সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা অ্যাপের মতো চিকিৎসাক্ষেত্রেও যুক্ত করা হচ্ছে।

তবে এআই শুধু এলএলএমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এবং চ্যাটবট আসার অনেক আগে থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ খাতের ইতিহাস ৭০ বছরের বেশি পুরোনো। ১৯৫০ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং যখন তাঁর এক গবেষণাপত্রে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?’, সেটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

এআইয়ের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছেন বিভিন্ন পেশাজীবী
ছবি: রয়টার্স

এফডিএ ১৯৯৫ সালে প্রথম এআই-সমৃদ্ধ চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন দেয়। সেই ব্যবস্থা জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্ত করতে দুটি ‘প্যাটার্ন-ম্যাচিং’ সফটওয়্যার ব্যবহার করত। বর্তমানে চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যবহৃত এআই-কে প্রায়ই ‘মেশিন লার্নিং’ বলা হয়; যার একটি অংশ হলো ‘ডিপ লার্নিং’। এগুলো নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য ডেটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যেমন রেডিওলজিতে চিকিৎসকদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে, এমন টিউমার শনাক্ত করে ক্যানসার নির্ণয়ে এ প্রযুক্তি সাহায্য করে।

এমন ব্যবস্থা অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২২ সালের জুনে টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের একটি হাসপাতালে এরিন রালফ নামের এক নারীর সাইনাসের অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর মাথায় একটি ছোট বেলুন প্রবেশ করানো হয়। রালফের করা মামলা অনুযায়ী, মার্ক ডিন নামের এক চিকিৎসক ওই সময় তাঁর মাথার ভেতর যন্ত্রের অবস্থান নিশ্চিত করতে এআই-চালিত ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’ ব্যবহার করছিলেন।

‘সাইনো প্লাস্টি’ নামের এ অস্ত্রোপচার দীর্ঘমেয়াদি সাইনোসাইটিস চিকিৎসার একটি আধুনিক পদ্ধতি। এতে সাইনাসের ছিদ্র বড় করার জন্য একটি বেলুন ফুলিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তরল বেরিয়ে যেতে পারে ও প্রদাহ কমে।

তবে ডালাস কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে অ্যাক্লারেন্ট ও অন্যদের বিরুদ্ধে করা রালফের মামলায় অভিযোগ করা হয়, ট্রুডি সিস্টেম ডা. ডিনকে ‘ভুল পথে পরিচালিত’ করেছিল। এতে তাঁর একটি ক্যারোটিড ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যা মস্তিষ্ক, মুখ ও ঘাড়ে রক্ত সরবরাহ করে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা তৈরি হয়।

একটি ঘটনায়, একজন সার্জন ভুলবশত রোগীর মাথার খুলির নিচের অংশে ফুটো করে ফেলেছিলেন। আরও দুটি ঘটনায় প্রধান ধমনি দুর্ঘটনাবশত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই রোগী স্ট্রোকের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, রালফের আইনজীবী বিচারককে জানিয়েছেন যে ডা. ডিনের নিজস্ব রেকর্ডেই দেখা গেছে, তিনি বুঝতেই পারেননি যে তিনি ক্যারোটিড ধমনির এত কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

তবে রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে সেই রেকর্ডগুলো যাচাই করতে পারেনি।

হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর স্পষ্ট হয় যে রালফ স্ট্রোক করেছেন। চার সন্তানের মা রালফকে আবার হাসপাতালে ফিরতে হয় এবং পাঁচ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) কাটাতে হয়। তাঁর চিকিৎসার খরচ জোগাতে খোলা একটি ‘গো ফান্ড মি’ পাতায় জানানো হয়, যদি তাঁর মস্তিষ্ক ফুলে যায়, সে ক্ষেত্রে জায়গা করে দিতে খুলির একটি অংশ অপসারণ করা হয়েছিল।

এ ঘটনার এক বছরের বেশি সময় পর স্ট্রোকের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ব্লগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রালফ বলেন, ‘আমি এখনো ফিজিওথেরাপি নিচ্ছি। ব্রেস (সহায়ক কাঠামো) ছাড়া হাঁটা এবং আমার বাঁ হাতটিকে আগের মতো সচল করা এখনো অনেক কঠিন।’

২০২৩ সালের মে মাসে ডা. ডিন যখন আরেকজন রোগী ডোনা ফার্নিহাফের ‘সাইনোপ্লাস্টি’ অস্ত্রোপচার করছিলেন, তখনো ‘ট্রুডি’ ব্যবহার করেন তিনি। ফোর্ট ওয়ার্থের আদালতে করা ফার্নিহাফের মামলা অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের সময় হঠাৎ তাঁর ক্যারোটিড ধমনি ‘ফেটে যায়’। রক্ত চারদিকে ‘ছিটে পড়তে থাকে।’ এমনকি অস্ত্রোপচার পর্যবেক্ষণ করতে আসা অ্যাক্লারেন্টের একজন প্রতিনিধির গায়েও সেই রক্ত লাগে। মামলায় বলা হয়, ডোনা ফার্নিহাফের একটি ক্যারোটিড ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অস্ত্রোপচারের দিনই তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।

আরও পড়ুন

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অ্যাক্লারেন্ট কর্তৃপক্ষ জানত বা তাদের জানা উচিত ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে এই নেভিগেশন সিস্টেমটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ ও অনির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি ছিল।

আদালতের নথি অনুযায়ী, অ্যাক্লারেন্ট উভয় মামলার অভিযোগই অস্বীকার করেছে। মামলাগুলো বর্তমানে চলমান রয়েছে। কোম্পানিটি দাবি করেছে, তারা ট্রুডি সিস্টেমের নকশা বা এটি তৈরি করেনি, শুধু বাজারজাত করেছে। অ্যাক্লারেন্টের বর্তমান মালিক ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস রয়টার্সকে বলেছে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে অস্ত্রোপচারকালে কোনো আঘাত বা ক্ষতির যোগসূত্র থাকার কোনো প্রমাণ নেই।

ফেডারেল ডেটাবেজ ‘ওপেন পেমেন্টস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ডা. ডিন ২০১৪ সাল থেকে অ্যাক্লারেন্টের পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছ থেকে ফি বাবদ ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি গ্রহণ করেন। এর মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার ছিল ট্রুডি সিস্টেম–সংশ্লিষ্ট।

ডা. ডিনের একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা এবং মামলা চলমান থাকায় চিকিৎসক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। ইন্টেগ্রা বলেছে, ডা. ডিন এখন আর ট্রুডির পরামর্শক নন এবং অ্যাক্লারেন্ট কিনে নেওয়ার পর তাঁকে যে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা শুধু তাঁর খাবারের খরচ বাবদ ছিল।

ফার্নিহাফের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২১ সালে অ্যাক্লারেন্টের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেফ হপকিন্স ট্রুডি ডিভাইসে এআই যুক্ত করার পেছনে ‘বিপণন কৌশলে’ জোর দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যন্ত্রটিতে ‘নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি’ রয়েছে, এমন দাবি করা।

লিংকডইনে অ্যাক্লারেন্টের একটি পোস্ট অনুযায়ী, ট্রুডির এআই সফটওয়্যারটি রোগীর শারীরবৃত্তীয় কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশ শনাক্ত এবং চিকিৎসকের নির্ধারণ করা দুটি বিন্দুর মধ্যে ‘সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সঠিক পথ’ খুঁজে বের করতে সহায়তা করে। এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো, অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা সহজ করা এবং সাইনাস অপারেশনের মতো প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা।

ফার্নিহাফের মামলায় বলা হয়, এআই যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে অ্যাক্লারেন্ট কর্মকর্তারা যখন চিকিৎসক ডিনের কাছে গিয়েছিলেন, তখন তিনি হপকিন্স ও অ্যাক্লারেন্টকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে ‘কিছু সমস্যা রয়েছে; যা সমাধান করা প্রয়োজন।’

মামলায় দাবি করা হয়েছে, এ সতর্কতা সত্ত্বেও অ্যাক্লারেন্ট তাদের নিরাপত্তার মান কমিয়ে নতুন প্রযুক্তিটি বাজারে আনার তোড়জোড় শুরু করে। এমনকি ট্রুডি সিস্টেমে যুক্ত করার আগে এই নতুন প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে নির্ভুলতার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল মাত্র ৮০ শতাংশ।

ডিন সত্যিই এমন কোনো সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া ফার্নিহাফের দাবির সপক্ষে জমা দেওয়া নথিপত্রগুলো আদালতের গোপনীয়তার আদেশে থাকায় সংবাদদাতারা সেগুলো যাচাই করতে পারেননি।

অ্যাক্লারেন্টের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেফ হপকিন্স এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেননি।

‘ভুল অঙ্গ শনাক্ত’

এফডিএ সতর্ক করেছে, চিকিৎসা সরঞ্জামের ত্রুটি বা প্রতিকূল ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায়ই এগুলোতে বিস্তারিত তথ্যের অভাব থাকে, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে অনেক তথ্য মুছে ফেলা হয় এবং শুধু প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এ ছাড়া একই ঘটনা নিয়ে সংস্থাটি একাধিক প্রতিবেদনও পেয়ে থাকে।

রয়টার্স দেখেছে যে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে এফডিএ-তে জমা পড়া অন্তত ১ হাজার ৪০১টি প্রতিবেদন এমন সব চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে, যেগুলো সংস্থাটির অনুমোদন দেওয়া এআই-চালিত ১ হাজার ৩৫৭টি পণ্যের তালিকায় রয়েছে। যদিও সংস্থাটি বলছে, এ তালিকা সম্পূর্ণ নয়।

আরও পড়ুন

২০২৫ সালের জুন মাসের এক এফডিএ প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ডের জন্য ব্যবহৃত একটি এআই সফটওয়্যার ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে শনাক্ত করছে। ‘সোনিও ডিটেক্ট’ নামের সফটওয়্যারটি ভ্রূণের ছবি বিশ্লেষণে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সোনিও ডিটেক্ট সফটওয়্যারের এআই অ্যালগরিদম ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি ভ্রূণের শারীরিক গঠন ভুলভাবে শনাক্ত ও সেগুলো ভুল অঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করছে।’ তবে এতে কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

‘সোনিও ডিটেক্ট’-এর মালিক স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্যামসাং মেডিসন। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এই প্রতিবেদন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয় না এবং এফডিএ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করেনি।

এ ছাড়া অন্তত ১৬টি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিকের তৈরি এআই-চালিত হার্ট মনিটরগুলো হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিক ছন্দ বা সাময়িক বিরতি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এতে কেউ আহত হওয়ার তথ্য নেই। মেডট্রনিক এফডিএ-কে জানিয়েছে, কিছু ঘটনা ‘ব্যবহারকারীর বিভ্রান্তির’ কারণে ঘটেছে।

মেডট্রনিক তাদের হার্ট মনিটরের এআই অ্যালগরিদমকে ‘ডিপ লার্নিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে বর্ণনা করে। তাদের দাবি, এটি ভুল সতর্কবার্তার হার কমিয়ে সঠিক তথ্য দেয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওয়েবসাইটে এ–ও স্বীকার করেছে, তাদের এই প্রযুক্তি প্রকৃত অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন শনাক্তের ক্ষেত্রে ভুল করতে পারে।

মেডট্রনিক রয়টার্সকে জানিয়েছে, ১৬টি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটিতে তাদের যন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং এতে রোগীর কোনো ক্ষতি হয়নি।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প আমলে এফডিএতে জনবল ছাঁটাই

রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে এফডিএর পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, নতুন চিকিৎসাযন্ত্রের জোয়ার সামলানোর মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নেই। প্রায় চার বছর আগে এফডিএ এআই–বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীর সংখ্যা বাড়িয়েছিল। দলটি এআইয়ের নিরাপত্তা যাচাইয়ে সংস্থাটির প্রধান সম্পদে পরিণত হয়েছিল। গত বছরের শুরুর দিকে এ দলে সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০।

একজন সাবেক কর্মী বলেন, ‘কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। আমরা তাঁদের পাশে বসে বুঝিয়ে বলতাম, কেন এ প্রযুক্তিটি বাজারের জন্য নিরাপদ বা অনিরাপদ।’

তবে গত বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইলন মাস্কের ব্যয় সংকোচন অভিযানের অংশ হিসেবে এই এআই টিম ভেঙে দিতে শুরু করে। এফডিএর অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, ৪০ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে প্রায় ১৫ জন চাকরি হারিয়েছেন বা নিজে থেকে চলে গেছেন। ডিজিটাল হেলথ সেন্টার অব এক্সিলেন্স নামের আরেকটি বিভাগও তাদের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী হারিয়েছে।

মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র অ্যান্ড্রু নিক্সন অবশ্য দাবি করেছেন যে এফডিএ এআই-চালিত যন্ত্রের ক্ষেত্রেও আগের মতোই কঠোর মান বজায় রাখছে। তিনি বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তাই এফডিএর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’

তবে এফডিএর সাবেক কর্মীদের মতে, ছাঁটাইয়ের পর কর্মীদের কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে অনেক ত্রুটি নজর এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এফডিএর নিয়ম অনুযায়ী, বেশির ভাগ এআই-চালিত যন্ত্র বাজারে আনার আগে রোগীদের ওপর পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। নির্মাতারা শুধু পুরোনো কোনো এআই-বিহীন যন্ত্রের ‘আপডেট’ হিসেবে এগুলো বাজারে ছাড়ার অনুমতি পান।

সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আলেকজান্ডার এভারহার্ট বলেন, ‘চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এফডিএর প্রথাগত পদ্ধতি এআই-চালিত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা নির্মাতাদের ওপর নির্ভর করছি যে তারা ভালো পণ্য দেবে; কিন্তু এফডিএর কাছে এর কোনো কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে কি না, আমার জানা নেই।’

আরও পড়ুন