উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় অজিত পাওয়ারের মৃত্যুর পর এনসিপির নেতৃত্বে আসবেন কে

মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার নিহত হয়েছেনফাইল ছবি: এএনআই

ভারতের মহারাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্ব মূলত অজিত পাওয়ারের ব্যক্তিগত ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। বিধায়কদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্যাপক। গতকাল বুধবার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় মহারাষ্ট্রের এ উপমুখ্যমন্ত্রী মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, এনসিপির নতুন নেতৃত্ব নিয়ে অজিত পাওয়ারের পরিবার, নিকটতম সহযোগী এবং দলটির আঞ্চলিক নেতা—মূলত এ তিন শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে। এ তিন শক্তির প্রত্যেকের নিজস্ব কিছু ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

স্বামী অজিত পাওয়ারের মৃত্যুর খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুনেত্রা পাওয়ার। ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, বারামতি
ছবি: এএনআই

অজিত পাওয়ারের পরিবার

অজিত পাওয়ারের স্ত্রী সুনেত্রা দীর্ঘকাল রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। এ সময়টাতে তিনি সক্রিয় রাজনীতির চেয়ে বারামতিকেন্দ্রিক বিভিন্ন নারী ও সামাজিক সংগঠনে বেশি সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে তিনি সুপ্রিয়া সুলের বিরুদ্ধে বারামতি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান।

সুনেত্রা হারলেও এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি রাজ্য পর্যায়ে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। অজিত পাওয়ারে স্ত্রীর চেয়ে রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর পরিচিতি সুদৃঢ় হয়।

সুনেত্রা ২০২৪ সালের মার্চে মহারাষ্ট্র থেকে রাজ্যসভায় সদস্য নির্বাচিত হন। তখন তিনি রাজ্যে বিজেপির নেতৃত্বাধীন মহাযুতি জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তাই নির্বাচিত হতে তাঁকে বেগ পেতে হয়নি।

আইনসভা বা প্রশাসনিক কাজে সুনেত্রার অভিজ্ঞার অভাব রয়েছে। তা সত্ত্বেও দলের মধ্যে পাওয়ার পরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে তিনিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও সম্ভাব্য মুখ। কিন্তু তিনি কতটা স্বাধীনভাবে দল চালাতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অজিত পাওয়ারের ছেলে পার্থ ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মহারাষ্ট্রের মাভল আসন থেকে নির্বাচন করেন। এ আসন থেকে সাধারণত তাঁর দাদা তথা অজিতের চাচা শারদ পাওয়ার নির্বাচন করতেন। কিন্তু তিনি ২০১৯ সালের নির্বাচনে অংশ নেননি। এ নির্বাচনে পার্থকে পাওয়ার পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরাধিকার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

ভারতের মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারকে বহনকারী বিধ্বস্ত উড়োজাহাজ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: এএনআই

কিন্তু পার্থ নির্বাচনে হেরে যান। হেরে গিয়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। পার্থ ব্যর্থ হলেও তাঁর তুতো ভাই রোহিত পাওয়ার রাজনীতিতে সফল হন। বিধানসভা রাজনীতির মাধ্যমে তিনি তাঁর রাজনীতির শক্ত ভিত গড়ে তোলেন।

এ পরিস্থিতিতে পারিবারিক পরিচয়ের কারণে রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকলেও নির্বাচনে ব্যর্থতার কারণে পার্থ উত্তরাধিকার হিসেবে কতটা বিবেচিত হবেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

নিকটতম প্রতিযোগী

প্রফুল প্যাটেল এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তাঁকে দলটির সবচেয়ে অভিজ্ঞ নেতাদের একজন হিসেবে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের সাবেক এ বেসামরিক বিমানমন্ত্রী দিল্লিতে দীর্ঘদিন শারদ পাওয়ারের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছেন।

২০২৩ সালের এনসিপির বিভাজনের সময় অজিত পাওয়ারের শিবিরে যোগ দেন প্রফুল প্যাটেল। তাঁর যোগ দেওয়ার ফলেই মূলত এ অংশটি এনসিপি হিসেবে পরিচিতি পায়।

জোট ব্যবস্থাপনা, জাতীয় পর্যায়ের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং দল পরিচালনা সম্পর্কে প্যাটেলের গভীর জ্ঞান তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। তাঁকে সাধারণত সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে দেখা হয়। সংকটকালে দলকে এক রাখতে তিনি নানা সময়ে ভূমিকা রেখেছেন।

আরও পড়ুন

তবে প্যাটেলের বড় দুর্বলতা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের নেতা হিসেবে তিনি কখনো জনপ্রিয় ছিলেন না। মহারাষ্ট্রে ভোটের রাজনীতিতেও তিনি কখনো শক্ত ভিত তৈরি করতে পারেননি।

মহারাষ্ট্র রাজ্যের রায়গড়ের জেলা রাজনীতি থেকে উঠে আসা সুনীল তাতকার এনসিপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি ভোটের রাজনীতিতে কনকন আসনে শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। সেখানে তিনি সমবায় খাত এবং স্থানীয় সংস্থার কার্যক্রমের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। মন্ত্রী হিসেবে তিনি পানিসম্পদ এবং গ্রামীণ উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। এসব দায়িত্বের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

এনসিপির বিভাজনের পর অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন শাখার মহারাষ্ট্র ইউনিটের সভাপতি হন প্যাটেল। কর্মী ও জেলা স্তরের নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা তাঁর মূল শক্তির জায়গা। এসব যোগ্যতা তাঁকে মাঠপর্যায় ও সাংগঠনিক নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে। তবে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব মূলত কনকন অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। অজিত পাওয়ারের মতো তাঁর রাজ্যজুড়ে প্রভাব নাই।

এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য প্রফুল প্যাটেল
ছবি: এএনআই

বিতর্কিত নেতা

ধনঞ্জয় মুণ্ডে এনসিপির অজিত পাওয়ার শিবিরের কয়েকজন জনপ্রিয় নেতার মধ্যে একজন। অজিত পাওয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হলেও ওবিসি বা অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণিভুক্ত জনগোষ্ঠীর মানুষ হওয়ায় এনসিপির মতো মূলত মারাঠা ভোটভিত্তিক দলে তিনি গ্রহণযোগ্যতা পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ধনঞ্জয় মূলত বীদ জেলাকেন্দ্রিক নেতা। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় এ নেতাকে নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। ২০২৫ সালে জানুয়ারি মাসে বীদ জেলার গ্রামপ্রধান সন্তোষ দেশমুখ হত্যার জেরে তিনি মহারাষ্ট্র সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। এটা তাঁর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক কলঙ্ক। তাই এনসিপির নতুন নেতৃত্বে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ছগন ভুজবাল মহারাষ্ট্রের প্রথিতযশা ওবিসি নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি শিব সেনা থেকে এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। উপমুখ্যমন্ত্রী এবং অবকাঠামো নির্মাণ (পিডব্লিউডি), খাদ্য ও সিভিল সাপ্লাইজের মতো মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন এ প্রবীণ নেতা।

আরও পড়ুন

তবে দুর্নীতির দায়ে ছগন ভুজবালকে কারাভোগ করতে হয়েছে। এনসিপির বিভাজনের পর তিনি অজিত পাওয়ার শিবিরে যোগ দেন। উত্তর মহারাষ্ট্রে ওবিসি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর শক্তিশালী ঘাঁটি। তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও বেশ দীর্ঘ।

তবে বয়স ও অতীত বিতর্কের কারণে ছগন ভুজবালের এনসিপির নেতৃত্বের হাল ধরার সম্ভাবনা কম। তবে তিনি দলকে এক রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন