ইসরো থেকে বিজ্ঞানীদের পদত্যাগে উদ্বেগে ভারত সরকার, কেন চাকরি ছাড়ছেন তাঁরা
ভারত যখন মহাকাশে প্রথমবারের মতো বেসরকারিভাবে তৈরি রকেটের সফল উৎক্ষেপণ উদ্যাপন করছে, ঠিক তখনই শীর্ষ বিজ্ঞানীরা চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। বিষয়টি দেশের বিজ্ঞানমহলকে চিন্তায় ফেলে আগামী দিনগুলোতে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে, এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
আর এই সম্ভাবনার জেরেই সম্প্রতি ভারতের ১০০ জনের বেশি শীর্ষ মহাকাশবিজ্ঞানী সরকারি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি খাতে যোগ দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভালো বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার আশায় সরকারি বিজ্ঞানীরা পদত্যাগ করেছেন।
আজ শনিবার অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে ভারতের প্রথম বেসরকারিভাবে তৈরি উচ্চগতিসম্পন্ন ‘বিক্রম-১’ রকেট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। হায়দরাবাদভিত্তিক স্টার্টআপ ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’–এর নির্মিত এই ‘মিশন আগমন’ ফ্লাইটটি ভারতকে বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে বেসরকারি ‘অরবিটাল’ উৎক্ষেপণের সক্ষমতা দিল।
কিন্তু বেসরকারি খাতের এই অর্জনের মধ্যেই ইসরোর (ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন) গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ মিশনের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের পদত্যাগ ও স্বেচ্ছায় অবসরের নিয়ম আরও কঠোর করেছে মহাকাশ বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেস)। অভিজ্ঞ কর্মীদের এভাবে চলে যাওয়ার কারণে মিশনের বিশেষ দক্ষতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন মহাকাশপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’ নামে বেসরকারি যে মহাকাশপ্রযুক্তি সংস্থা শনিবার সফলভাবে ‘মিশন আগমন’ রকেটটিকে উৎক্ষেপণ করেছে, সেই সংস্থা পরিচালনা করছেন ইসরোর সাবেক দুই বিজ্ঞানী পবনকুমার চান্দানা ও নাগা ভারত ডাকা। তাঁরাই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। চান্দানা সংস্থার মুখ্য পরিচালক এবং প্রযুক্তি প্রধান ও ঢাকা চিফ অপারেটিং অফিসার।
মহাকাশ বিভাগ ইসরো থেকে বিজ্ঞানীদের এই গণপদত্যাগ রুখতে একটি নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে। এই নির্দেশিকায় ‘গগনযান হিউম্যান স্পেসফ্লাইট’ (মহাকাশে মানুষ নিয়ে যাওয়া) কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকল্পনায় কর্মরত বিজ্ঞানীদের স্বেচ্ছায় অবসর এবং পদত্যাগের নিয়ম কঠোর করা হয়েছে বলে ভারতের একটি পত্রিকা ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে।
১৪ জুলাইয়ের অভ্যন্তরীণ এক নির্দেশিকায় ইসরো বলেছে, মহাকাশযান ও অন্যান্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মিশনের সঙ্গে যুক্ত গ্রুপ ‘এ’ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কর্মীদের পদত্যাগ বা অবসরের আবেদন যেন সরাসরি গ্রহণ না করা হয়। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এখন থেকে এসব আবেদন মহাকাশ বিভাগে পাঠাতে হবে।
মহাকাশ বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে চলে যাওয়া বিজ্ঞানীদের সংখ্যা প্রকাশ না করলেও ভারতের দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকাকে ইসরোর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ জন বিজ্ঞানী পদত্যাগ করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেঙ্গালুরুর ইউ আর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার থেকে প্রায় ৮০ জন এবং তিরুবনন্তপুরমের বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার থেকে প্রায় ২০ জন বিজ্ঞানী ইতিমধ্যে চলে গেছেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে চন্দ্রযান-৩ মিশনের সিমুলেশন দলের নেতৃত্ব দেওয়া আদিত্য রাল্লাপাল্লির মতো প্রথম সারির বিজ্ঞানীও রয়েছেন।
তবে ইসরোর চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন বিষয়টিকে ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ বলে আশ্বস্ত করেছেন। আজ শনিবারের সফল উৎক্ষেপণের পরে নারায়ণন ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’কে অভিনন্দনও জানিয়েছেন।
ইসরোর অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপিতে স্বীকার করা হয়েছে, গগনযানের মতো মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ মিশনের বিজ্ঞানীদের এই আকস্মিক পদত্যাগ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
নতুন নির্দেশিকাটি ২০২০ সালের নভেম্বরে নেওয়া একটি প্রশাসনিক সংস্কারকে বাতিল করে দিয়েছে, যার অধীনে একটি নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের পদত্যাগ অনুমোদনের ক্ষমতা মহাকাশকেন্দ্রগুলোর পরিচালকদের দেওয়া হয়েছিল। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রগুলোর পরিচালকেরা কোনো আবেদন গ্রহণ করতে পারবেন না।
ইসরোর ১৪ হাজার ৬০০ জনের বেশি কর্মীর তুলনায় এই পদত্যাগের সংখ্যা কম মনে হলেও, শীর্ষস্থানীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের চলে যাওয়াটাই মূল চিন্তার কারণ।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, বিরাট বড় মাপের বেতন এবং নানান সুযোগ–সুবিধার কারণেই বিজ্ঞানীরা প্রধানত ভারতের মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র ছাড়ছেন। তবে এ কথাও কেউ কেউ বলেছেন, বাড়তি গবেষণার সুযোগও রয়েছে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে। আগামী কয়েক বছরে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রগুলোতে বড় অঙ্কের দেশি–বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে শনিবার যাঁরা মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করল সেই ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’–এর বিনিয়োগকারীরা প্রধানত বিদেশি। তবে ভারতীয় বিনিয়োগকারীও রয়েছেন। ‘ব্ল্যাকরক’ নামে একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং অর্থ পরিচালনাকারী সংস্থা বিনিয়োগ করেছে ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’–এ, যাঁদের এই মুহূর্তে বাজারমূল্য এক বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।
তবে এসব ভারতের সরকারি মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রের সমস্যা মিটছে না। পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, যাঁরা চাকরি ছেড়ে গেছেন, সেসব পদ পূরণ করা সহজ হলেও মহাকাশযান, চন্দ্রযান এবং স্প্যাডেক্সের (অন্তরীক্ষ বাস) মতো জটিল প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে অর্জিত বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা রাতারাতি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
অবশ্য ইসরোতে কর্মী চলে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৭০০ কর্মী এই প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
বর্তমানে ইসরোতে ১ হাজার ৫০টির বেশি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া চলছে। তবে মহাকাশ বিভাগের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে, কেবল শূন্যপদ পূরণ করার চেয়ে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের ধরে রাখা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। মহাকাশযান, ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন এবং ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানের মতো বড় বড় লক্ষ্য সামনে রেখে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মতোই প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ধরে রাখা এখন ভারতের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।