ভারতে নিজ দেশেই ‘বিদেশি’ সাহিদারা: ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার রহস্য কী

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের সময় এক আন্দোলনকারীকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। নয়াদিল্লি, ভারতছবি: রয়টার্স

পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট গ্রামে জন্ম নেওয়া সাহিদা ফকির এত দিন ভোট দেওয়ার অধিকারকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ সেই অধিকার তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি কর্মকর্তাদের কাছে নিজের ভারতীয় জন্মনিবন্ধন সনদ ও ১৯৬২ সাল থেকে গ্রামে থাকা পারিবারিক জমিজমার নথিপত্র উপস্থাপন করেছেন।

সাহিদার মা–বাবার নামও কয়েক দশক ধরে ভোটার তালিকায় ছিল। সেই প্রমাণও তিনি দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও গত এপ্রিলে চূড়ান্ত সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হলে দেখা যায়, সেখানে সাহিদার নাম নেই।

দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া ৩৮ বছর বয়সী এই ‘পরিযায়ী’ শ্রমিক একাই তালিকা থেকে বাদ পড়েননি। গত বছর থেকে ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি জাপানের জনসংখ্যার (১২ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ) চেয়েও বেশি।

দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া ‘পরিযায়ী’ শ্রমিক সাহিদা ফকির একা নন। গত বছর থেকে ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় আট দশকে এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক নাম কখনো ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এসআইআরকে ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি বৈধ প্রক্রিয়া হিসেবে দাবি করেছে। নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ প্রক্রিয়ায় মৃত ব্যক্তি, ভোটার তালিকায় একই ব্যক্তির একাধিক নামসহ কয়েক কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে জীবিত বহু ভারতীয় নাগরিকের নামও বাদ পড়েছে তালিকা থেকে।

সমালোচকদের অভিযোগ, ‘অবৈধ অভিবাসী’দের নাম বাদ দিয়ে ভারতের ভোটার তালিকা ‘পরিশুদ্ধ’ করার প্রতিশ্রুতি আসলে আরও অশুভ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কয়েক কোটি মুসলিম, অন্যান্য সংখ্যালঘু এবং দরিদ্র ও নিম্নবর্ণের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই বিজেপির ভোটার নন।

সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মুসলিমদেরই মূলত ধরপাকড়ের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসআইআর নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ তীব্র হয়ে ভারতের বড় শহরগুলোর রাস্তায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা সরকারের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সপ্তাহান্তে ব্যারিকেড, রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা এবং হাজার হাজার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য দিয়ে দিল্লিকে একটি কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল। এসআইআর–প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধানকারী প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, সেই বিক্ষোভ ঠেকাতে গিয়ে কয়েক হাজার মানুষকে আটকও করা হয়।

সাহিদা ফকিরের ভারতীয় ভোটার পরিচয়পত্র ও প্যান কার্ড (ভারতীয় আয়কর বিভাগের স্থায়ী হিসাব নম্বর)
ছবি: পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’–এর সৌজন্যে

গত সোমবার ভারতের বিরোধী দলগুলো রাজধানী দিল্লির রাস্তায় মিছিল করে কয়েক হাজার সমর্থককে জড়ো করে। তারা এসআইআরকে মোদি সরকারের ভোট চুরির হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করে এর তীব্র সমালোচনা করেছে। পরে জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন জমা দেয় তারা।

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে করা লাখ লাখ ভোটারের আবেদনের জটের কারণে সাহিদার মামলার শুনানি হতে এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।

এদিকে তরুণদের এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা এসআইআরের বিরুদ্ধে তাঁদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের নেতাদের অভিযোগ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোয় এসআইআর এরই মধ্যে বিজেপিকে নির্বাচনী সুবিধা এনে দিয়েছে। সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে উভয় রাজ্যেই বিজেপি বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট বড় জয় পেয়েছে।

বিজেপি এসআইআরের মাধ্যমে ভোটের মাঠে সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যরা বলছেন, এ প্রক্রিয়ার প্রভাব আরও উদ্বেগজনক।

জ্ঞানেশ কুমার একতরফাভাবে এসআইআরে যে পরিবর্তন এনেছেন, তাতে নির্বাচন কমিশনই এখন ভারতীয় নাগরিকত্ব নির্ধারণের কর্তৃত্ব পেয়ে গেছে, যা কমিশনের এখতিয়ারের গুরুতর মাত্রাতিরিক্ত সম্প্রসারণ।

আমি যে ভারতের নাগরিক, তা প্রমাণ করার মতো সব নথি আমার আছে। পুলিশকে বাংলাদেশে না পাঠানোর জন্য পায়ে পড়ে অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়।
সাহিদা ফকির, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ভারতীয়

পশ্চিমবঙ্গে এ পরিবর্তনের প্রভাব এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। সেখানে মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সম্প্রতি ক্ষমতায় এসে ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় শুরু করেছে। এ জন্য বেশ কয়েকটি নতুন আটককেন্দ্রও তৈরি করেছে তারা।

সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মুসলিমদেরই মূলত ধরপাকড়ের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

সাহিদাও সেই দলের একজন। ভোটার তালিকা প্রকাশের মাত্র তিন মাস পর এবং তাঁকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি চলমান থাকা অবস্থায় পুলিশ তাঁকে আটক করেছে। পুলিশের অভিযোগ, তিনি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী।

সমালোচকদের অভিযোগ, ‘অবৈধ অভিবাসী’দের নাম বাদ দিয়ে ভারতের ভোটার তালিকা ‘পরিশুদ্ধ’ করার প্রতিশ্রুতি আসলে আরও অশুভ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কয়েক কোটি মুসলিম, অন্যান্য সংখ্যালঘু এবং দরিদ্র ও নিম্নবর্ণের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই বিজেপির ভোটার নন।

গত জুলাই মাসে সাহিদাকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়। অথচ তিনি কখনো বাংলাদেশে আসেননি এবং এ দেশের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কও নেই। এখন তিনি এ দেশেই আছেন।

সাহিদা বাংলাদেশ সীমান্তের একটি গ্রামে আশ্রয় নিয়ে আছেন। সেখানে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফোনে তিনি বলেন, ‘আমি যে ভারতের নাগরিক, তা প্রমাণ করার মতো সব নথি আমার আছে। পুলিশকে বাংলাদেশে না পাঠানোর জন্য পায়ে পড়ে অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে সীমান্তের এপারে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়।’

সীমান্তে ‘পুশ ইনের’ শিকার সাহিদা ফকির। সাতক্ষীরার কলারোয়া
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা সাহিদার বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁর সব নথি যাচাই করেছি এবং নিশ্চিত হয়েছি যে তিনি ভারতের নাগরিক।’

এটি মুসলিমদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য পরিকল্পিত একটি জাতীয় হয়রানিমূলক প্রক্রিয়া। ভারতের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায়, বাদ দেওয়া ভোটারদের আবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।
এস ওয়াই কুরেশি, সাবেক নির্বাচন কমিশনার

গত সেপ্টেম্বরে সাহিদার পরিবার তাঁকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। এ বিষয়ে জবাব দেওয়ার জন্য ভারত সরকারকে এক মাস সময় দেওয়া হয়।

অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে করা লাখ লাখ ভোটারের আবেদনের জটের কারণে সাহিদার মামলার শুনানি হতে এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।

সাহিদা কান্নাজড়িত কণ্ঠে গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমি শুধু আমার পরিবার ও ভারতে নিজের বাড়িতে ফিরতে চাই। আমি অধীর হয়ে সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।’

পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা ভোটাধিকার হারিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই বলছেন, নিজের দেশেই ‘বিদেশি’ হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে তাঁরা আতঙ্কিত। কারও কারও সরকারি সুযোগ-সুবিধাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ৮০ বছর বয়সী মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ সিদ্দিকি বলেন, তাঁর দাদা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন। তাঁর পরিবারের তিন প্রজন্মের নামই ভোটার তালিকায় ছিল। কিন্তু এসআইআরের পর ভোটার তালিকায় নিজের নাম না দেখে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন।

হেদায়েত উল্লাহ বলেন, ‘ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম মুছে ফেলার পর থেকে আমি সব সময় আতঙ্কে থাকি। যদি তারা আমাকে কোনো আটককেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়? এ বয়সে আমার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে থাকতে হবে—এ কথা আমি ভাবতেই পারি না। বিশেষ করে যখন আমার সব পূর্বপুরুষের কবর ভারতে।’

সমালোচকদের মতে, সমস্যার সূত্রপাত ২০২৩ সালে। সে বছর মোদি সরকার তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনে। এর ফলে কমিশনে প্রথমবারের মতো নিয়োগের প্রক্রিয়ায় সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

এর কয়েক মাসের মধ্যেই বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও মোদির নেতৃত্বাধীন কমিটি জ্ঞানেশ কুমারকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়।

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো রণজয় সেন বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে নির্বাচন কমিশন ছিল আমাদের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। কিন্তু এখন সেই বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে।’

২০২৪ সালে নতুন নির্বাচন কমিশন বিহার থেকে এসআইআর কার্যক্রম শুরু করে। সেখানে ৬০ লাখের বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পরপরই বিষয়টি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ভোটার তালিকা সংশোধনের কিছুদিন পর বিহারের বিধানসভা নির্বাচন হয়।

২০২৫ সালের ওই নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে। সেবার ২৪৩টি আসনে নির্বাচন হয়, ২০২টি পায় এনডিএ জোট।

আরও পড়ুন

এসআইআর নিয়ে কয়েক মাস ধরে উদ্বেগ থাকলেও দেশজুড়ে তখনো বিক্ষোভ শুরু হয়নি। গত মাসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায়, ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য ১৪টি আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একতরফাভাবে তাঁদের আপত্তি খারিজ করে দেন।

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ৮০ বছর বয়সী মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ সিদ্দিকি বলেন, তাঁর দাদা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন। তাঁর পরিবারের তিন প্রজন্মের নামই ভোটার তালিকায় ছিল। কিন্তু এসআইআরের পর ভোটার তালিকায় নিজের নাম না দেখে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন।

রণজয় সেন বলেন, ‘ভারতে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তা বরাবর নানা ত্রুটিতে ভরা। কিন্তু অন্তত নাগরিকদের মনে এ বিশ্বাস ছিল, তাঁদের ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং নির্বাচন নিয়মিত, অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসআইআর সেই অধিকার কেড়ে নিয়েছে। যেভাবে এটি পরিচালনা করা হয়েছে, তাতে বিজেপির নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করা ছাড়া এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করা কঠিন।’

তিন সাবেক নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে এসআইআরের সমালোচনা করে একে একটি বিরূপ প্রক্রিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের মতে, ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বদলে বাদ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়ায় দেশের ভোটার তালিকার শুদ্ধতা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

আরও পড়ুন

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও পি রাওয়াত ভোটার নিবন্ধন ফর্মে আনা পরিবর্তনকে ভুল ও অবৈধ বলে বর্ণনা করেছেন।

২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ভারতে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা অশোক লাভাসা এসআইআর বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। গত মাসে তিনি বলেন, ‘দেশের কোটি কোটি মানুষের ওপর একটি অন্যায্য প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর বিচার বিভাগও সেটিকে বৈধতা দিয়েছে। ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার ব্যাখ্যা কী?’

সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষায় এসআইআরের সমালোচনা করে এ পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এস ওয়াই কুরেশি। তিনি ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।

কুরেশি বলেন, ‘এটি মুসলিমদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য একটি পরিকল্পিত জাতীয় হয়রানিমূলক প্রক্রিয়া। ভারতে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় বাদ দেওয়া ভোটারদের আবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।’

আরও পড়ুন

এসআইআর–প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা উদ্দেশ্য থাকার কথা অস্বীকার করেছে বিজেপি। বিজেপির উল্টো অভিযোগ, দলের সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে বিরোধী দল কংগ্রেস পার্টি এসব অভিযোগ তুলছে।

বিজেপি আরও বলেছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া যেকোনো ভোটার চাইলে আবার নাম নিবন্ধন করতে পারবেন।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার
ফাইল ছবি: এএনআই

বিজেপির মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী অভিযোগগুলো ‘অপতথ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এগুলো বিরোধীদের এমন একটি প্রচারণার অংশ, যা ‘বিভেদ ও নৈরাজ্যের পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে’।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য প্রক্রিয়াটির কিছু ত্রুটি মেনে নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। দেরিতে হলেও গত সপ্তাহের শেষ দিকে কমিশন ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ফর্মের সংখ্যার ওপর সীমা আরোপ করেছে। সহজ কথায়, কেউ যেন গণহারে আবেদন করে অন্যের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দিতে না পারে, সে জন্য কমিশন জমা দেওয়া ফর্মের সর্বোচ্চ সংখ্যা বেঁধে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

এসব ফর্মের মাধ্যমে অন্যদের হয়ে আপত্তি জানানো যায়। এর আগে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে বৈধ মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার লক্ষ্যে হাজার হাজার ফর্ম জমা দেওয়া হয়েছিল।

এসআইআর নিয়ে জনগণের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। দিল্লিতে এসআইআর–প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ মানুষের নাম খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ায় এ সপ্তাহেও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

৩০ বছর ধরে দিল্লির বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী প্রশান্ত ট্যান্ডন বলেন, ভোটার হিসেবে তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে যখন তাঁর দরজায় একটি নোটিশ আসে, তখন তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

ক্ষুব্ধ কণ্ঠে প্রশান্ত বলেন, ‘কেউ যদি আমার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ করে, তবে আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ তাদেরই দিতে হবে।’

তরুণদের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নেবেন বলেও জানিয়েছেন এই প্রবীণ ভারতীয়।

আরও পড়ুন