মণিপুর: গুলিতে নিহত এক, ভেস্তে গেল শান্তি আলোচনা
ভারতের মণিপুর রাজ্যে গতকাল সোমবার নতুন করে সহিংসতায় অন্তত আরও একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পরেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই ও সংখ্যালঘু কুকি-যোমি উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী গোষ্ঠীগুলো বলেছে, তারা ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়ে শান্তি আলোচনায় আর অংশ নেবে না। আবার নতুন করে রাজ্যে সহিংসতাও শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং নতুন করে শান্তি ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
গতকাল চুড়াচাঁদপুর জেলার লাইলোইফাই এলাকায় গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এলাকাটি ইম্ফল উপত্যকার পার্শ্ববর্তী বিষ্ণুপুর জেলার সীমান্তে অবস্থিত। সন্ধ্যায় ঘটনাটি ঘটেছে জানিয়ে চুড়াচাঁদপুরের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট কার্তিক মাল্লাডি বলেছেন, মৃত ব্যক্তির নাম এন মুয়ানসাং (২২)। তিনি গ্রামে নিরাপত্তা দেওয়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য ছিলেন।
চুড়াচাঁদপুর ছাড়াও ইম্ফল পূর্ব এবং কাংপোকপি জেলায় রোববার গুলি চলেছে এবং সীমান্ত এলাকায় অন্তত আটজন আহত হয়েছেন বলে মণিপুরের পুলিশ জানিয়েছে।
রোববার থেকে আবার সহিংসতা শুরু হওয়ার জেরে এবং কিছু প্রশাসনিক সমস্যার কারণে কুকিসহ অন্যান্য উপজাতীয় গোষ্ঠী আগেই জানিয়েছিল যে তারা শান্তি আলোচনায় অংশ নেবে না।
পৃথক প্রশাসনের দাবিতে সম্প্রতি গঠিত ‘কোর কমিটি অন সেপারেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’, যার মধ্যে কুকি-যোমি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী বিধায়ক এবং কুকি ইনপি মণিপুর, যোমি কাউন্সিল এবং আদিবাসী উপজাতীয় নেতৃত্বের প্রতিনিধিরা রয়েছেন, তেমন সংগঠনগুলো সোমবার একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘কোনো সিএসও (সুশীল সমাজভুক্ত সংস্থা), উপজাতি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শান্তি কমিটিতে অংশগ্রহণ করবে না।’
সংগঠনগুলোর বিবৃবিততে আরও বলা হয়েছে, ‘যদিও আমরা শান্তি চাই, কিন্তু সহিংসতা, শোষণ ও নিপীড়নের ছায়ায় শান্তির কথা বলা এমন বিষয়, যা নিরর্থক প্রমাণিত হবে। এই সহিংসতার প্রধান অপরাধী (মুখ্যমন্ত্রী) এন বীরেন সিং বলে আমরা মনে করি। তাঁকে শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যোমি, কুকি, হামার ও মিজো সম্প্রদায়ের অপমান।’ তাদের না জানিয়ে শান্তি কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করায় অসন্তুষ্ট একাধিক কুকি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিও গতকাল শান্তি প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন। তবে তাঁদের প্রধান আপত্তি কমিটিতে মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংকে রাখা নিয়ে।
এমনকি কোকোমি (কো–অর্ডিনেশন কমিটি অন মণিপুর ইন্টেগ্রিটি) নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায় মেইতেদের প্রধান সংগঠনটিও শান্তি কমিটি নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। কোকোমির প্রতিনিধিও শান্তি কমিটিতে রয়েছেন। কোকোমি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, কমিটিতে যোগদানের সঠিক সময় এটা নয়। সে কারণে তারা শান্তি প্রয়াসে অংশ নেবে না। তাদের বক্তব্য, অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে মাদক-সন্ত্রাসীদের আক্রমণ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং সেই কারণেই শান্তি স্থাপন এখন সম্ভব নয়। মেইতেইরা শান্তি প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে। তবে শান্তি কমিটিতে মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীকে রাখা নিয়ে আপত্তি করেনি কোকোমি। মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং মেইতেই সম্প্রদায়ের মানুষ।
অন্যদিকে জাতীয় স্তরে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের মতো একটি জোটও রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতে। এই জোটের আহ্বায়ক আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা রোববার রাতে গুয়াহাটিতে অস্ত্রবিরতি (সাসপেনশন অব অপারেশনস) চুক্তিতে থাকা দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (কেএনও) এবং ইউনাইটেড পিপলস ফ্রন্টের (ইউপিএফ) সঙ্গে বৈঠক করেন।
তবে গতকালের গুলিবর্ষণ এবং এক ব্যক্তির মৃত্যুর পরে কেএনওর মুখপাত্র শৈলেন হাওকিপও আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের গুরুত্ব কমে গেছে বলে মনে করছেন। শৈলেন হাওকিপ বলেন, ‘হিমন্ত বিশ্বশর্মা কুকিদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন কারণ তিনি কোকোমি নামে একটি মেইতেই নাগরিক সমাজের সংগঠনের সঙ্গে আগে বৈঠক করেছিলেন। তাঁদের কথা মত, অপর পক্ষ (অর্থাৎ কুকিরা) যদি আগে গুলি না চালায়, তাহলে তাঁরাও চালাবেন না। আমরাও (কুকিরা) সেই রকমই বুঝেছিলাম যে অপর পক্ষ যদি গুলি না চালায়, তবে আমরাও আক্রমণ করব না। কিন্তু সেই মৌখিক চুক্তি তো ভেস্তে গেল, আবার গুলি চলল এবং হামলা হলো। একজন মারাও গেলেন। ফলে গোটা শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেল।’