মুসলিম শিক্ষার্থী ভর্তির বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের বিক্ষোভেই কি জম্মুর মেডিকেল কলেজের স্বীকৃতি বাতিল হলো
হিন্দু–মুসলিম বিতর্ক এড়াতে জম্মুর মেডিকেল কলেজের স্বীকৃতিই বাতিল করে দিল ন্যাশনাল মেডিকেল কাউন্সিল (এনএমসি)। ফলে চলতি বছর, অর্থাৎ ২০২৫–২৬ সালে ওই কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়তে ভর্তি হওয়া ৫০ জন পড়ুয়ার শিক্ষা লাভ অনিশ্চিত হয়ে গেল। অবশ্য কর্তৃপক্ষ বলেছে, পড়ুয়াদের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
স্বীকৃতি বাতিলের কারণ হিসেবে এনএমসি জানিয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো খুবই খারাপ, পূর্ণ সময়ের জন্য যোগ্য শিক্ষক নেই এবং পর্যাপ্ত সংখ্যায় আবাসিক চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। মেডিকেল শিক্ষার জন্য যে যে বিষয় আবশ্যিক বলে ২০২৩ সালে তৈরি এনএমসির নিয়মবিধি নির্দিষ্ট করেছে, ওই প্রতিষ্ঠানে তা নেই। এই অবস্থায় প্রতিষ্ঠান চালাতে দিলে প্রকৃত শিক্ষাদান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পড়ুয়াদেরও স্বার্থহানি ঘটবে।
কেন্দ্রশাসিত জম্মু–কাশ্মীরের জম্মুতে অবস্থিত ওই প্রতিষ্ঠানের নাম শ্রী মাতা বৈষ্ণদেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্স। জম্মুর কাটরায় এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। বৈষ্ণদেবী মন্দির কর্তৃপক্ষ এই প্রতিষ্ঠানের চালক। ওই সংস্থার হাসপাতালের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৬ সালে।
দু–তিন মাস ধরে স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। হিন্দুত্ববাদীদের অভিযোগ, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে যে ৫০ জন পড়ুয়াকে নেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৪৬ জনই মুসলিম।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ্গ দলসহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের দাবি, বৈষ্ণদেবী মন্দির কর্তৃপক্ষের দানের টাকায় তৈরি ওই সংস্থায় হিন্দু পড়ুয়াদের অগ্রাধিকার থাকা উচিত। অথচ দেখা যাচ্ছে, ৫০ জনের মধ্যে ৪২ জন কাশ্মীর উপত্যকার, ৮ জন জম্মুর। পড়ুয়াদের নব্বই শতাংশই মুসলমান। তাঁদের দাবি, ওই পড়ুয়াদের বদলে হিন্দুদের নিতে হবে। সিংহভাগ আসন হিন্দুদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।
হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, এখন যা চলছে তা অব্যাহত থাকলে তা হবে মেডিকেল শিক্ষার ইসলামীকরণ। এর প্রতিবাদে বেশ কিছুকাল ধরেই আন্দোলন চলছিল। হিন্দুত্ববাদীরা কিছুদিন আগে প্রতিবাদ সমাবেশে বৈষ্ণদেবী মন্দির বোর্ডের কুশপুতুলও পুড়িয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যদিও বারবার বলা হয়েছে, ভর্তিপ্রক্রিয়া এনএমসির নিয়ম মেনেই হয়েছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী জম্মু–কাশ্মীরের ১৩টি মেডিকেল কলেজের মোট ১ হাজার ৬৮৫ আসনেই পড়ুয়াদের নেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা ‘নিট’–এর তৈরি তালিকা থেকে। মোট আসনের ৮৫ শতাংশ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পড়ুয়াদের জন্য সংরক্ষিত। বাকি আসন দেশের অন্যান্য অংশের পড়ুয়াদের জন্য।
বিভিন্ন মহলের ধারণা, হিন্দু–মুসলিম বিতর্কের আপাতত অবসান ঘটাতেই এনএমসির এই সিদ্ধান্ত। হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, কোনো দিক থেকেই প্রতিষ্ঠানের কোনো অভাব নেই। এনএমসি যে সময় নজরদারি চালাতে এসেছিল, তখন শীতের ছুটি চলছে।
হিন্দুত্ববাদীদের আন্দোলনের দরুন ওই প্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বিরক্ত হয়ে কদিন আগেই বলেছিলেন, কেন্দ্রীয় সরকার ওই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিক। সেখানে পড়ুয়াদের কোনো নিরাপত্তা নেই। পড়ুয়াদের অন্যত্র পাঠানো হোক।
স্থানীয় বিজেপি নেতারাও ওই ভর্তিব্যবস্থার বিরুদ্ধে। দলের পক্ষ থেকে উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহাকে ভর্তিপ্রক্রিয়া বাতিল করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আইনত তা অসম্ভব। সেই কারণে স্বীকৃতিই বাতিল করা হলো বলে মনে করা হচ্ছে।