উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখা ভারত ‘বৃদ্ধ মানুষের’ দেশ হতে যাচ্ছে, কী ক্ষতি হবে তাতে
প্রধানমন্ত্রিত্বের সিকি শতক পূর্ণ হওয়ার দিনে নরেন্দ্র মোদির দৃপ্ত ঘোষণা, ভারত অতি দ্রুত বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতিতে পরিণত হবে। স্বপ্নের ভারতের ছবি আঁকতে গিয়ে গতকাল বুধবার তিনি সগর্বে জানিয়েছেন, ‘উই উইল ডু ইট।’ তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কি হবে না, সে বিষয়ে তর্ক সৃষ্টি না করে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা মুডিজের গবেষণা দেখাচ্ছে, ২০৪৯ সালের মধ্যে ভারত পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ‘বৃদ্ধ মানুষের’ দেশে পরিণত হবে।
আর জন্ম ও মৃত্যুহার এভাবে কমলে ২০৬৫ সালের মধ্যেই ভারত ‘অতি বয়স্কদের’ দেশ হয়ে উঠবে। বয়স্ক থেকে অতি বয়স্ক দেশে পৌঁছাতে ভারতের লাগবে মাত্র ১৬ বছর। তুলনায় অতি বয়স্ক দেশ হতে যুক্তরাষ্ট্রের লাগবে ১৯ বছর, ইন্দোনেশিয়ার ২৯ বছর।
মুডিজের এই গবেষণালব্ধ তথ্য ভারতের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য পরিষেবার অগ্রগতির পরিচয় দিলেও অর্থনীতির পক্ষে তা চিন্তার। কারণ, কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমলে শ্রমের জোগান ও উৎপাদনক্ষমতায় চাপ বাড়বে। পরিবারের সদস্য ও তরুণ উপভোক্তার সংখ্যা কমলে আবাসন, গাড়ি, শিক্ষাসহ সার্বিক চাহিদা কমে যাবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে সুবিধা আর্থিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে উঠেছিল, জন্মহার কমে গেলে তা দুর্বল হয়ে যাবে।
মুডিজের শঙ্কা, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ভারত তুলনামূলক কম আয়ের দেশ থাকতে থাকতেই বয়স্ক মানুষের দেশে পরিণত হবে। উৎপাদনের হার কমবে অথচ পেনশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার খরচ বেড়ে যাবে। মোটকথা, বড়লোক হওয়ার আগেই ভারত বৃদ্ধ মানুষের দেশ হয়ে যাবে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধ মানুষের দেশ জাপান। ওই দেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সের মানুষের হার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৯ শতাংশ। ইউরোপের প্রবীণ মানুষের দেশটি হলো ইতালি। বৃদ্ধ মানুষের হার সে দেশের ২৪ শতাংশ। ২১ থেকে ২৩ শতাংশ বয়স্ক মানুষের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, গ্রিস ও স্পেনের মতো দেশ।
এসব দেশে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কম। জীবনযাত্রার উন্নত মান ও চিকিৎসার সুব্যবস্থার কারণে মানুষের গড় আয়ু অনেকটাই বেশি। এসব দেশ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সময় পেয়েছে। প্রথমে তারা ধনী হয়েছে, পরে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ভারত ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক মানুষের হার বৃদ্ধির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। চিন্তার দিক সেটাই।
ভারতের এই হাল কেন? মুডিজের গবেষণায় সেই সহজ উত্তর হলো, জন্মহার কমে যাওয়া। বিশ্বজুড়ে জন্মের হার বা ‘ফার্টিলিটি রেট’ ১৯৫০ সালে ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার ‘রিপ্লেসমেন্ট রেট’ হলো ২ দশমিক ১ শতাংশ।
পৃথিবীর ৭০ শতাংশ মানুষ যেসব দেশে বসবাস করেন, সেখানকার জন্মহার এই রিপ্লেসমেন্ট রেটের কাছাকাছি বা কম। ভারত সেই দেশগুলোর একটি। যদিও প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল কমিটির গবেষণাপত্র দেখাচ্ছে, বর্তমান ভারতের জন্মহার ১ দশমিক ৯ শতাংশ; অর্থাৎ জন্ম হচ্ছে কম, মৃত্যুও হচ্ছে কম। নিট ফল, সমাজে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
সঞ্জীব সান্যালের তৈরি প্রতিবেদন এ–ও দেখাচ্ছে, ভারতের ওই জন্মহার আরও কমে ১ দশমিক ৬–এ দাঁড়াবে, যদি বিহার ও উত্তর প্রদেশকে হিসাবের বাইরে রাখা যায়। পঞ্চাশের দশকে ভারতে প্রতি হাজারে মৃত্যুহার ছিল ২২ দশমিক ৭০, বর্তমানে তা কমে হয়েছে ৬ দশমিক ৬ থেকে ৬ দশমিক ৪। সেই সময়; অর্থাৎ ৭৫ বছর আগে ভারতীয়দের গড় আয়ু ছিল ৩২ বছর। বর্তমানে গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭২ বছর।
ভারত জন্ম ও মৃত্যুহার কমার ক্ষেত্রে জাপানের সমকক্ষ হলেও অর্থনীতির দিক থেকে দুই দেশের ফারাক আসমান–জমিনের। জাপান ‘বৃদ্ধ’ হয়েছে আয় ও ব্যয়ের বৈভব দেখার পর। ভারত সেই দিকে এগিয়ে চলেছে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের ৬০ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ১৩৪ শতাংশ ও ৮০ বছরের বেশি মানুষের সংখ্যা ২৭৯ শতাংশ বেড়ে যাবে। ২০৪৬ সালের মধ্যে দেশে প্রবীণদের সংখ্যা ছাপিয়ে যাবে ১ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশু–কিশোরদের।
বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন এই বাস্তব চিত্রের সঙ্গে খুব একটা মানানসই হতে পারছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। ভারতের বিশালত্ব, তার জনসংখ্যা ও অর্থনীতির বহরের ফলে মোট জাতীয় আয়ের দিক থেকে দেশটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ অর্থনীতি।
প্রধানমন্ত্রী মোদি এই অর্থনীতিকেই তৃতীয় বৃহৎ করতে চান, কিন্তু ওই অর্জন দেশের মানুষের ভালো বা মন্দ থাকার প্রমাণ নয়। কেননা, মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সব দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান এখন ১৪৯তম। পাশাপাশি মাথাপিছু ব্যয়ের দিক থেকে ভারত রয়েছে ১২০ থেকে ১২৫–এর মধ্যে।
এই অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে ভারতে ক্রমে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া অবশ্যই চিন্তার বিষয়। মুডিজ জানিয়েছে, এখনকার ‘তরুণ ভারতের’ ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে দেশের নীতিনির্ধারকেরা কী কী পদক্ষেপ নেন, তার ওপর। বয়স্ক মানুষেরা বোঝা হয়ে উঠবেন, নাকি তাঁদের উপস্থিতি অন্য ধরনের ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি করবে, সেটাই ভারতের অর্থনীতির গতিপথ ঠিক করে দেবে।