বিরোধীদের সমালোচনার পরও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা নিয়ে কেন নীরব মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিফাইল ছবি: রয়টার্স

নীরবতার মাশুল দিতে হচ্ছে, ঘরোয়া রাজনীতিতে সমালোচিতও হতে হচ্ছে। তবুও ইরান–সংকট নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো নীরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পরও প্রধানমন্ত্রী কিংবা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কেউ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ করেননি।

কেন এই নীরবতা, তা কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চক্ষুশূল হওয়ার ভয়ে, সেই সমালোচনা প্রধানমন্ত্রী মোদিকে শুনতে হচ্ছে।

অবশ্য ইরানে হামলার তিন দিন পর সফররত কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে আজ সোমবার যৌথ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেবল বলেছেন, ভারত মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার পক্ষে মত দিয়েছে।

মোদি বলেন, ‘পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। ভারত চায় সব দ্বন্দ্ব আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান হোক।’ ব্যস এটুকু। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে আগ্রাসন নিয়ে তাঁর মুখে কোনো কথা নেই।

মোদির এবারের ইসরায়েল সফর শুরু থেকেই সমালোচিত। তাঁকে শুনতে হচ্ছে, ইরানে হামলার তোড়জোর যখন জোর কদমে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে রেখেছেন, ইসরায়েলে সরকার ও বিরোধী পক্ষের দ্বন্দ্ব যখন তীব্র, নির্বাচনের মুখে নেতানিয়াহু সরকার যখন টলমলে, মোদি সে দেশের পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে গেলে বিরোধীরা যখন তা বর্জন করার কথা আগাম হুমকি দিলেন (এবং সেটা তাঁরা করেছেনও), তখন কেন মোদি ইসরায়েল গেলেন?

এ কথাও শুনতে হচ্ছে, সফর শেষ হওয়ার ৪৮ চল্লিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতে ইরানে হামলা করা হবে, সেই তথ্য গোপন রেখেই কি তাহলে মোদির সফর ইসরায়েল চূড়ান্ত করেছিল? প্রশ্নগুলোর একটিরও উত্তর না থাকায় স্পষ্ট, ইরান আক্রমণ, খামেনিসহ প্রথম সারির নেতাদের মৃত্যু ভারত সরকারকে প্রবল চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

এও স্পষ্ট, শিগগিরই সংঘাত বন্ধ না হলে কূটনৈতিক স্তরে ভারতকে সরু সুতার ওপর দিয়ে হাঁটতে হবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, অন্যদিকে ইরানসহ গোটা আরব দুনিয়া। শ্যাম ও কুল দুই-ই ধরে রাখা কঠিন। এই পরিস্থিতিতে মোদির ভারতকে অসহায় দেখাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তর থেকে যেসব প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তার একটারও সদুত্তর সরকার বা শাসক দল বিজেপির কাছে নেই। ফলে সরকার নিরুত্তর।

কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক দীর্ঘ পোস্টে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি, শুল্ক-যুদ্ধে ট্রাম্পের সামনে মোদির নতজানু হয়ে বধির থাকার উল্লেখ করেছেন।

জয়রাম লিখেছেন, সারা পৃথিবী যখন জানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেকোনো দিন ইরান আক্রমণ করবে, ইরানের সরকার বদলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র মরিয়া, তখন কেন মোদি ইসরায়েল গেলেন?

ইসরায়েলে বিরোধীদের ওয়াক আউটের পর সে দেশের পার্লামেন্টে মোদির ভাষণ নৈতিক দিক থেকে কাপুরুষতার লজ্জাজনক উদাহরণ অভিহিত করে জয়রাম লিখেছেন, ইরান আক্রমণ নিয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া দেশের মূল্যবোধ, নীতি ও স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাঘাতকতারই নামান্তর।

সমালোচনায় মুখর কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রও। ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, এক সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশের নেতারা ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় কাজ করেছেন। ওই আক্রমণের পক্ষে যে যুক্তিই খাড়া করা হোক, তা নিন্দনীয়।

প্রিয়াঙ্কার দাবি, আরব দুনিয়ায় বিপদে পড়া ভারতীয়দের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হোক। আবগারি মামলায় দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ দলের সব নেতা বেকসুর খালাস পাওয়ার পর আম আদমি পার্টি (আপ) নরেন্দ্র মোদির কড়া সমালোচনায় নেমেছে। প্রকাশ্য জনসভা ও গণমাধ্যমে তাঁরা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে মূল চক্রী বলে অভিহিত করছেন। কাপুরুষোচিত আচরণ বলে নিন্দা করছেন।

ইরান নিয়েও আপ নেতৃত্ব সেই ভূমিকায়। দলের নেতা সঞ্জয় সিং বলেছেন, গত বছর ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি নিহত হওয়ার পর ভারতে জাতীয় শোক পালন করা হয়েছিল। অথচ সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নিহত হওয়া সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদি শোক জ্ঞাপন করলেন না। কেন? যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে বলে?

সঞ্জয় সিং বলেন, যে প্রধানমন্ত্রী এমন কাপুরুষ ও যিনি ট্রাম্পের পুতুল, তাঁকে দেশের প্রয়োজন নেই।

স্পষ্টতই, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ বৃদ্ধি পেলেও ভূরাজনৈতিক কৌশল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক কারণে মোদি সরকার সাবধানে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে চাইছে। একদিকে ইরান ও আরব দুনিয়া, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, এই সন্ধিক্ষণে কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া ভারতের পক্ষে সম্ভবপর নয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের কথায়, ‘এ এক ঝুঁকিপূর্ণ ভারসাম্যের খেলা। সাবধানে এগোনো ছাড়া উপায় নেই।’ খামেনির মৃত্যুর পর ভারতের নানা রাজ্যে শোকমিছিল ও বিক্ষোভ হয়েছে। বামশাসিত কেরলমে (পুরোনো নাম কেরালা) শাসক দলের পক্ষ থেকে শোক মিছিল বের করা হয়েছে। কর্নাটক, তেলেঙ্গানায়ও শোকমিছিল বেরিয়েছে। কাশ্মীর উপত্যকায় শিয়া ধর্মাবলম্বীরা শোক প্রকাশ করতে রাস্তায় নেমে এসেছেন। গোটা উপত্যকায় দুই দিনের বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। শান্তি রক্ষায় ছিন্ন করা হয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।

মধ্য প্রদেশের ভোপাল, উত্তর প্রদেশের লখনৌ, পাঞ্জাবের লুধিয়ানাতেও শোক সমাবেশে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি রাজ্য সরকারকে বলা হয়েছে, শোক জ্ঞাপন সমাবেশ ও মিছিলকে কেন্দ্র করে যাতে হিংসা না ছড়ায়, সে দিকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে।