ভারতের জেন-জি প্রজন্মও মুঠোফোনের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে রাস্তায় নেমেছে
তাঁরা গান গাইছেন, সেলফি তুলছেন, গলা ভেঙে যাওয়া পর্যন্ত স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরিয়ে ফেলছেন নানা মিম দিয়ে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে তরুণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা যায়নি।
এসব বিক্ষোভকারী বয়সে তরুণ, তাঁরা জেনারেশন জেড বা জেন-জি নামে পরিচিত। তাঁরা ক্ষুব্ধ, তাঁরা দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করছেন।
এই বিক্ষোভকারীদের একজন ২১ বছর বয়সী শিবম। দিল্লির যন্তর মন্তরে জনসমুদ্র ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় শিবম এক হাত দিয়ে তাঁর মায়ের কাঁধ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকে, যেন ভিড়ের চাপে দুজনে আলাদা হয়ে না যায়।
পূর্ব দিল্লির বাসিন্দা এই মা ও ছেলে দুই দিন ধরে তাদের দুই চাকার যানটি কাছেই শিবমের বাবার অফিসে রেখে হেঁটে যন্তর মন্তরে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া সবচেয়ে বড় বিক্ষোভগুলোর একটি হচ্ছে এই যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থল।
দিল্লির উপকণ্ঠে নয়ডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী শিবম বলেন, চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকে তিনি এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন।
সত্যি বলতে, আমি খুব ভয় পাচ্ছি। আমার অনেক সিনিয়র এখনো চাকরি পাননি। তাদের কেউ কেউ ব্লিঙ্কিটের ডেলিভারি পার্টনার হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ র্যাপিডোতে গাড়ি চালাচ্ছেন। আমার মা–বাবা সব সময় আশা করেন, আমি একটি ভালো চাকরি পাব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি আমাকে র্যাপিডোর চালক হতে হয়, তাহলে সেটা তাদের হৃদয় ভেঙে দেবে।
এই তরুণ বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি খুব ভয় পাচ্ছি। আমার অনেক সিনিয়র এখনো চাকরি পাননি। তাদের কেউ কেউ ব্লিঙ্কিটের ডেলিভারি পার্টনার হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ র্যাপিডোতে গাড়ি চালাচ্ছেন। আমার বাবা-মা সব সময় আশা করেন, আমি একটি ভালো চাকরি পাব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি আমাকে র্যাপিডোর চালক হতে হয়, তাহলে সেটা তাঁদের হৃদয় ভেঙে দেবে।’
ভিড়ের মধ্যে শিবমকে শক্ত করে ধরে থাকা তাঁর মা বলেন, ‘প্রত্যেক বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে, তাঁদের সন্তান মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, ভালোভাবে উপার্জন করবে এবং সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপন করবে। কিন্তু এখন আমি ভয় পাই, যখন দেখি কলেজে ভর্তি হতে না পেরে বা চাকরি না পেয়ে অনেক সন্তান আত্মহত্যা করছে। এসব ছেলেমেয়েদের দেখুন...পাথরের মেঝেতে ঘুমাতে হচ্ছে, পাখাবিহীন তাঁবুতে থাকতে হচ্ছে—এটা দেখে আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে।’
নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস–কাণ্ডে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। এই বিক্ষোভ এখন দেশজুড়ে তরুণদের জমে থাকা নানা অসন্তোষের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে এ বিক্ষোভ করার পর গত ২০ জুলাই বিক্ষোভকারীরা দিল্লিতে পার্লামেন্ট ভবন অভিমুখে যাত্রা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়, লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের মিছিল আটকে দেওয়া হয়।
শুরুর দিকে আন্দোলনে তেমন সাড়া ছিল না। মনে হচ্ছিল, যন্তর মন্তরে আগের অনেক বিক্ষোভের মতো এটিও সীমিত পরিসরেই আটকে থাকবে এবং দিল্লিবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে না।
কিন্তু যন্তর মন্তরে অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। হঠাৎই আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়।
যে প্রজন্মকে প্রায়ই উদাসীন ও অতিরিক্ত সুবিধাভোগী বলে সমালোচনা করা হয়, তারাই এবার মুঠোফোনের পর্দা থেকে চোখ তুলে রাস্তায় নেমে এসেছে। আন্দোলনটি এখন আর শুধু একটি পরীক্ষা বা একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই।
স্বরাজ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং ভারত জোড়ো অভিযানের জাতীয় আহ্বায়ক যোগেন্দ্র যাদবের মতে, যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া মানুষের ভিড় বয়স্ক প্রজন্মকে ভারতীয় তরুণদের সম্পর্কে নিজেদের দীর্ঘদিনের ধারণা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
যোগেন্দ্র আরও বলেন, ‘আমরা যাঁরা বয়সে বড়, আমাদের মধ্যে একধরনের ধারণা কাজ করে যে আমাদের চেয়ে কম বয়সীরা রাজনীতির বিষয়ে খুব একটা সচেতন নয়। আমাদের সাধারণ ধারণা ছিল, তাঁরা আরাম-আয়েশেই বেশি অভ্যস্ত, তাঁরা রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী নয়। কিন্তু এটি নতুন প্রজন্মকে নিয়ে বড় ধরনের ভুল ধারণা।’
ভারত জোড়ো অভিযানের জাতীয় আহ্বায়ক আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে আমাদের মধ্যে নিজেদের প্রজন্মকে নিয়েও বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি আদর্শিক ছবি আঁকার প্রবণতা রয়েছে। সমস্যা এই নয় যে নতুন প্রজন্মের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ নেই। সমস্যা হলো, তাদের রাজনীতি বোঝার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি বোঝার চেষ্টা আমরা করিনি।’