ভারতে এক মুসলিম বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে ‘নায়ক’ বনে গেলেন যিনি

দীপক কুমারছবি: দীপক কুমারের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট

‘আমার নাম মোহাম্মদ দীপক।’ সাদামাটা এই কয় শব্দ উচ্চারণ করে ভারতে এক মুসলিম দোকানির পাশে দাঁড়িয়েছিলে এক হিন্দু ব্যক্তি। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি ভারতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন এবং অপ্রত্যাশিতভাবে নায়কে পরিণত হয়েছে।

দীপক কুমার ‘ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের প্রতীক’ এবং ‘ভারতের বহুত্ববাদের পোস্টারবয়’ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তাঁকে তীব্র প্রতিবাদের মুখেও পড়তে হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে নিজের হিন্দুধর্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এমনকি তিনি প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন।

গত ২৬ জানুয়ারির একটি ঘটনা দীপককে হঠাৎ করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ওই দিন ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তরাখণ্ডের কোটদ্বার নামের একটি ছোট শহরে ঘটনাটি ঘটেছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে এ নিয়ে অনেক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের কর্মীদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছেন। মুসলিমদের হয়রানির অভিযোগে এই দলের নাম প্রায় সময় খবরে আসে।

তর্কে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তির নাম দীপক। তিনি ওই শহরে একটি ব্যায়ামাগারের (জিমের) মালিক।

দীপক জানান, তিনি পাশের এক বন্ধুর দোকানে ছিলেন। তখন দেখেন, জনা ছয়েক ব্যক্তি ‘বাবা স্কুল ড্রেস অ্যান্ড ম্যাচিং সেন্টার’ নামের একটি পোশাকের দোকানের বয়স্ক মালিক বাকিল আহমেদকে ঘিরে উত্ত্যক্ত করছেন। তাঁরা আহমেদকে তাঁর ৩০ বছরের পুরোনো দোকানের নাম থেকে ‘বাবা’ শব্দটি বাদ দিতে চাপ দিচ্ছিলেন।

ভারতে ‘বাবা’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। সেখানে সাধু-সন্ন্যাসী বা ধর্মগুরুর পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ‘বাবা’ বা ‘দাদা’–কেও এই সম্বোধনে ডাকেন।

কিন্তু উগ্রবাদী বজরং দলের কর্মীদের দাবি ছিল ভিন্ন। তাঁরা জবরদস্তি করছিল, কোটদ্বারে ‘বাবা’ মানে স্থানীয় হনুমান মন্দির সিদ্ধবালি বাবাকে বোঝায়। তাই, কোনো মুসলিম ব্যবসায়ীর তাঁর দোকানের নামে এই শব্দ ব্যবহারের অধিকার নেই।

ভিডিওতে শোনা যায়, আহমেদের ছেলে তাঁদের (বজরং দলের কর্মীদের) কাছে কিছুটা সময় চেয়ে অনুরোধ করছেন। কিন্তু তাঁরা বলে, দেরি করা যাবে না।

ঠিক এই সময় দীপক সেখানে হাজির হন। পরে বিবিসি হিন্দিকে তিনি বলেন, ‘দোকানের সামনে অনেক মানুষের ভিড় দেখে’ তিনি এগিয়ে যান। ভিডিওতে তাঁকে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, ‘মুসলিমরা কি ভারতের নাগরিক নন?’

দীপক বলেন, কোনো পরিকল্পনার অংশ নয়, তাঁর হস্তক্ষেপ ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর ভাষায়, ‘কয়েকজন তরুণ একজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে এত রূঢ়ভাবে কথা বলছে, এটা আমার ভালো লাগেনি। তাঁর ধর্মের কারণে তাঁকে নিশানা করা হচ্ছিল। তাঁরা মুসলিমদের নিশানা করে আসছিল।’

৬৮ বছর বয়সী আহমেদ বলেন, দীপক সেখানে না থাকলে কী ঘটত, বলা কঠিন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ভীত ছিলাম। তারা নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য যেকোনো কিছু করতে পারত।’

দীপকের প্রতিরোধের পর হিন্দুত্ববাদী বজরং দলের কর্মীরা তাঁর নাম জানতে চান।

দীপক বলেন, ‘নিজেকে মোহাম্মদ দীপক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে বলতে চেয়েছিলাম, আমি একজন ভারতীয়। এটি ভারত এবং এখানে প্রতিটি মানুষ ধর্মনির্বিশেষে থাকার অধিকার রাখে।’

হিন্দু ও মুসলিম নামের এমন অস্বাভাবিক সংমিশ্রণ দেখে বজরং দলের কর্মীরা হতভম্ব হয়ে চলে যান। কিন্তু এর কয়েক দিন পর দীপকের জিমের বাইরে বিক্ষোভ করতে উগ্রবাদী দলটির ১৫০ জনের বেশি সমর্থক জড়ো হন।

আহমেদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ‘কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির’ বিরুদ্ধে মামলা করেন। আবার দুজন হিন্দু কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে দীপকের বিরুদ্ধেও একটি মামলা হয়।

এই বিক্ষোভ ও পুলিশের পদক্ষেপ ভারতের সংবাদমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছে। এমন এক সময়ে এ ঘটনা ঘটল, যখন বিনা উসকানিতে উচ্ছৃঙ্খল হিন্দুত্ববাদী জনতার হাতে মুসলিমদের ওপর হামলা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে দীপকের এই রুখে দাঁড়ানোর ঘটনাটি এক বিরল বীরত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে।

কংগ্রেস দলীয় সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধী দীপককে ‘ভারতের একজন নায়ক’ বলে মন্তব্য করেছেন। রাহুল বলেছেন, তিনি এমন একজন নায়ক, যিনি ‘সংবিধান ও মানবতার জন্য লড়ছেন’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্ট রাহুল লিখেছেন, দীপক ‘ঘৃণার বাজারে ভালোবাসা’ ছড়াচ্ছেন। তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের আরও অনেক দীপক প্রয়োজন—যাঁরা মাথানত করেন না, ভয় পান না এবং যাঁরা সংবিধানের পক্ষে পূর্ণ শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।’

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভিডিওটি ‘বিপুল আশার’ সঞ্চার করেছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, এমন মনে হওয়া এক সমাজে দীপকের কথাগুলো যেন নতুন উদ্দীপনা জোগায়। সেগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এটাই ‘প্রকৃত ভারত’, যেখানে প্রত্যেক মানুষের নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে, আর নিজের দোকানের নামও নিজের পছন্দমতো রাখার স্বাধীনতা রয়েছে।’

আরও অনেকে দীপকের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং গুন্ডাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রশংসা করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেছে নিয়েছেন। তাঁর ফোন অবিরাম বেজে চলেছে। সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও অন্যান্য দর্শনার্থীদের কাছে তিনি ভীষণ কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছেন।

ইনস্টাগ্রামে দীপকের অনুসারীর সংখ্যা হু হু করে বেড়ে চলেছে। ২৯ জানুয়ারি শেয়ার করা একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে ৫০ লাখের বেশি লাইক পড়েছে। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি হিন্দু নই, আমি মুসলিম নই, আমি শিখ নই, আমি খ্রিষ্টান নই। সবার আগে আমি একজন মানুষ।’

নতুন পাওয়া খ্যাতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন দীপক। তিনি বলেন, একটি সাধারণ প্রতিবাদ এত বড় বিষয় হয়ে উঠবে, এটা কখনো ভাবেননি।

দীপক বলেন, ‘যা ঠিক মনে হয়েছে, আমি শুধু তা–ই করেছি। বিষয়টি এত বড় হয়ে যাবে ভাবিনি। কিন্তু এখন এটি জাতীয় খবর।’

তবে এই সাহসী অবস্থানের জন্য দীপককে মূল্যও দিতে হচ্ছে।

দীপক তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সমালোচকেরা তাঁকে নিজ ধর্মের প্রতি ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দিচ্ছে এবং তাঁকে গালিগালাজ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন বা মন্তব্য করছেন।

দীপক অসংখ্য প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন। গত বুধবার তিনি এক্সে এমন একটি হুমকিমূলক ফোন কলের রেকর্ডিং পোস্ট করেছেন। ফোন দেওয়া ওই ব্যক্তি দীপককে বলছিলেন, ‘বজরং দলের তোমাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত হয়নি...আমি শিগগির তোমাকে শিক্ষা দেব।’

দীপক বলেন, এসব ঘটনা তাঁর পরিবারকে ‘মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’ করে ফেলেছে। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁরা ভীত। আর আমিও এখন প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে আছি।’

দীপকের জিমটি একসময় জমজমাট ছিল। এখন তা অনেকটা জনশূন্য। জিমে সদস্য সংখ্যা কমায় তাঁর আর্থিক দুশ্চিন্তা বেড়েছে।

দীপক বলেন, ‘আগে এখানে প্রতিদিন ১৫০ জনের বেশি মানুষ প্রশিক্ষণ নিতে আসতেন। এখন সেই সংখ্যা কমে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। অনেকে ভয়ে আর আসছে না।’

গত সপ্তাহে ভারতের বিরোধী দলের সংসদ সদস্য জন ব্রিটাস দীপকের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে ‘হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক আশার আলো’ বলে অভিহিত করেন।

আরও পড়ুন

এ রাজনীতিবিদ জানান, তিনি দীপকের ‘জিমের সদস্যপদ নিয়েছেন, যা সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হুমকির কারণে বর্তমানে জনশূন্য হয়ে পড়ে আছে।’

দীপকের আর্থিক সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাঁর জিমের সদস্যপদ কেনার প্রস্তাব দিতে শুরু করেন। উদাহরণ হিসেবে জয় দাস নামের এক ব্যক্তির কথা বলা যায়। তিনি এক্স পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা একজন ভালো মানুষকে হারতে দিতে পারি না।’

হুমকি ও দুশ্চিন্তা সত্ত্বেও দীপক বলেন, ভবিষ্যতে তিনি আবারও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আজ নীরব থাকি, তবে কাল আমাদের সন্তানরাও একই নীরবতা শিখবে।’