বিপিনের মৃত্যু ভারতের যেসব দুর্ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে
ভারতের প্রথম প্রতিরক্ষা প্রধান বিপিন রাওয়াত মারা গেলেন কপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে। এই ঘটনার অতীতের আরও কিছু ঘটনাকে সামনে এনেছে। ভারতের গণমাধ্যম হিন্দু বলছে, এর আগে ১৯৬৩ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তরে শীর্ষ ছয় কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৯৭ সালে প্রাণ হারিয়েছেন চারজন। ২০১০ সালে মারা গেছেন ১২ জন।
শুধু সামরিক কর্মকর্তারা নন। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন রাজনীতিকও প্রাণ হারিয়েছেন। বিমান ও হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ভারতের এমন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকদের মধ্যে রয়েছেন সুভাষচন্দ্র বসু, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে সঞ্জয় গান্ধী, অন্ধ্র প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী রাজশেখর রেড্ডি, অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী দোরজি খান্ডু, কংগ্রেসের সাবেক নেতা ও মন্ত্রী মাধবরাও সিন্ধিয়া।
বিপিন রাওয়াত ছাড়াও সর্বশেষ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী মধুলিকা রাওয়াত। এ ছাড়া প্রাণ হারিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার এল এস লিদার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ সিং, উইং কমান্ডার পি এ চৌহান, স্কোয়াড্রন লিডার কে সিং, জুনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার দাস, প্রদীপ এ, হাবিলদার সাতপাল, নায়েক গুরুসেওয়াক সিং, জিতেন্দার, ল্যান্স নায়েক বিবেক ও এস তেজা।
এই দুর্ঘটনার পর এনডিটিভির প্রাইম টাইম শোতে বলা হয়েছে, তামিলনাড়ুর সুলুর বিমানঘাঁটি থেকে উড়েছিল এই কপ্টার। এটি ৯৪ কিলোমিটার ওড়ার পর বিধ্বস্ত হয়। হেলিকপ্টারটি ওয়েলিটংনে ডিফেন্স সার্ভিস স্টাফ কলেজে যাচ্ছিল। সেখানে বিপিন রাওয়াতের ভাষণ দেওয়া কথা ছিল। কিন্তু নানচাপাচাথারাম এলাকায় এটি বিধ্বস্ত হয়। কপ্টারটি খানিকটা নিচ দিয়ে উড়ছিল। তবে এই অনুষ্ঠানে এ-ও বলা হয়, দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ ব্ল্যাকবক্স, ডিজিটাল ফ্লাইট রেকর্ডার, ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের তথ্য থেকে জানা যাবে।
এর ছয় বছর আগে নাগাল্যান্ডের দিমাপুরে জেনারেল রাওয়াতকে বহনকারী একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছিল। তবে সেই যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। কারণ, হেলিকপ্টারটি ২০ ফুট ওপরে যাওয়ার পরই বিধ্বস্ত হয়। সেই সময় তাঁকে যে হেলিকপ্টারটি বহন করছিল, সেটির নাম ছিল চিতা।
এর আগে ১৯৬৩ সালে একটি ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে। জম্মু-কাশ্মীর পুঞ্চ এলাকায় ওই দুর্ঘটনায় সেনা ও বিমানবাহিনীর ছয় কর্মকর্তা নিহত হন। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর এই দুর্ঘটনা ঘটে। পরদিন এ খবর প্রথম পাতায় ছেপেছিল হিন্দু। এতে বলা হয়েছিল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল দৌলত সিং, এয়ারভাইস মার্শাল ই ডব্লিউ পিনটো, লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিক্রম সিং, মেজর জেনারেল এন কে ডি নানভাতি ও ব্রিগেডিয়ার শ্রী রাম উবেরয় প্রাণ হারিয়েছেন। এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, এই দুর্ঘটনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া, কোনো অভিযানে যাওয়ার সময় বা অভিযানের স্থল পরিদর্শনের সময় দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একটি হেলিকপ্টার উড়তে পারবেন না।
সেই সময় ভারতে পার্লামেন্ট অধিবেশন চলছিল। দুর্ঘটনার পরই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়াই বি চাভান লোকসভায় বিষয়টি জানান।
এরপর অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং জেলায় ১৯৯৭ সালে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মারা যান কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এন ভি এন সোমু। এ দুর্ঘটনায় প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিন সদস্য প্রাণ হারান। এর মধ্যে একজন মেজর জেনারেল ছিলেন। তুষারে ঘেরা একটি এলাকা থেকে চারজনের মরদেহ ও ওই হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়। এর এক দশকের বেশি সময় পর অরুণাচলের বমদির এলাকায় একটি এমআই-১৭ সিরিজের হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। এতে প্রতিরক্ষা দপ্তরে ১২ জন নিহত হন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর একজন ছিলেন, যিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার।
এদিকে বিপিন রাওয়াতের মৃত্যুর পর বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খবরে বলা হয়েছে, গত ছয় বছরে দুর্ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন বাহিনীর ৪৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
যেসব রাজনীতিক প্রাণ হারিয়েছেন
অরুণাচলে ১৯৯৭ সালের দুর্ঘটনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী এন ভি এন সোমু যে প্রাণ হারিয়েছেন, সে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আলোচিত দুর্ঘটনার মধ্যে অন্যতম সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যু। ১৯৪৫ সালে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছরের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইপে এই উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে সঞ্জয় গান্ধী মারা গিয়েছিলেন ১৯৮০ সালের ২৩ জুন। দিল্লি থেকে উড্ডয়নের পর তাঁকে বহনকারী উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। ২০০১ সালে কংগ্রেসের সাবেক নেতা ও মন্ত্রী মাধবরাও সিন্ধিয়া মারা যান উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায়। উত্তর প্রদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটে ওই বছরে ৩০ সেপ্টেম্বর।
এ ছাড়া ২০০৪ সালের ১৭ এপ্রিল দক্ষিণী অভিনেত্রী ও বিজেপির নেতা কে এস সৌমিয়া হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। বেঙ্গালুরু থেকে কারিমনগর যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি সেদিন নির্বাচনী প্রচারে যাচ্ছিলেন। অন্ধ্র প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী রাজশেখর রেড্ডি মারা যান ২০০৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর। ওই প্রদেশের নাল্লামালা বনে তাঁর হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল প্রাণ হারান অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী দোরজি খান্ডু। এই প্রদেশেরই ওয়েস্ট কামেং জেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।