যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা
সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় ইরান
ক্ষেপণাস্ত্র কখনোই কোনো আলোচনার বিষয়বস্তু হবে না: আরাগচি
ইরানের পারমাণবিক দক্ষতা কোনোভাবেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়: হাতামি
ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে যেকোনো ধরনের হামলার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি জানান।
ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল শনিবার হাতামি এ কথা বলেছেন।
ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মার্কিন হামলা এড়াতে তেহরান চুক্তির পথে হাঁটবে—এমন মন্তব্যের পর হাতামি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক দক্ষতা কোনোভাবেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘শত্রু যদি কোনো ভুল করে, তবে নিঃসন্দেহে তারা নিজের দেশের নিরাপত্তা, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং জায়নিস্ট শাসনের (ইসরায়েল) নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলবে।’
হাতামি আরও বলেন, ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে পূর্ণ প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতিতে রয়েছে।’
সরাসরি সংঘাতের শঙ্কা
বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুদ্ধজাহাজের বহর পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান নিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা জড়ো করার বিষয়টি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের ওপর হামলা হলে মার্কিন ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ এবং মিত্ররাষ্ট্রগুলোতে—বিশেষ করে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে এর জবাব দেওয়া হবে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে ইরান বরং তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তিতে আসার পথ খুঁজবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এর আগে বলেছিলেন, তেহরান পারমাণবিক আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকলেও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কখনো কোনো আলোচনা হবে না।
মুছে ফেলা অসম্ভব
গত বছরের জুনে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে যোগ দিয়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি হামলায় দেশটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন। তবে শনিবার হাতামি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি মুছে ফেলা সম্ভব নয়, এমনকি এই জাতির বিজ্ঞানী ও সন্তানেরা শহীদ হলেও।
শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হরমুজ প্রণালিতে দুই দিনের নৌ মহড়া পরিচালনা করবে। এক বিবৃতিতে সেন্টকম মার্কিন বাহিনীর কাছাকাছি আইআরজিসির যেকোনো ধরনের অনিরাপদ ও অপেশাদার আচরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে আইআরজিসিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। গত বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) একই পদক্ষেপ নেয়। ইইউর এই সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান এবং এর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন
গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ৮ ও ৯ জানুয়ারি তা চরম আকার ধারণ করে। ইরান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিক্ষোভটি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে তা ‘দাঙ্গায়’ রূপ নেয় এবং সেখানে হত্যাকাণ্ড ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই অস্থিরতা তৈরির পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে দায়ী করেছে তারা।
সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১১৭। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তারা ৬ হাজার ৫৬৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ১৭০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১২৪ জন শিশু রয়েছে।
বর্তমানে ইরানে বিক্ষোভ থিতিয়ে এসেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গতকাল বিক্ষোভ-পরবর্তী জনদুর্ভোগের দিকে নজর দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমাদের জনগণের সঙ্গে এবং জনগণের জন্য কাজ করতে হবে এবং যতটা সম্ভব মানুষের সেবা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি ন্যায়বিচার ও অধিকারের ভিত্তিতে কাজ করে, তবে কোনো শক্তিই তাকে পঙ্গু করতে পারবে না।
একই দিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দক্ষিণ তেহরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির মাজার জিয়ারত করেন।
শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন কল্পনাপ্রসূত
তুরস্ক সফরে গত মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র কখনোই কোনো আলোচনার বিষয়বস্তু হবে না। তেহরান আলোচনা বা যুদ্ধ—উভয় পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত। পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতেও তারা তৈরি।
আরাগচি আরও বলেন, ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন একটি সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত বিষয়। কেউ কেউ এই মোহের জালে আটকা পড়েছেন।
আমাদের ব্যবস্থা এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত যে কোনো ব্যক্তির আসা-যাওয়ায় কিছু যায় আসে না।’