বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক অবৈধ, নতুন ১০% শুল্কের ঘোষণা দিলেন তিনি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেটাকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল শুক্রবার দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রয়োগ করে ওই শুল্ক আরোপ করেছিলেন। কিন্তু আইনটি প্রেসিডেন্টকে এই শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে ব্যাপক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি সব দেশের পণ্যের ওপর অন্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারপতির মধ্যে ৬ জন ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণার পক্ষে মত দিয়েছেন। আর ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়া সমর্থন করেছেন তিন বিচারপতি।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট রায়ে গত বছরের ২ এপ্রিল বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেছেন।
সর্বোচ্চ আদালতের ওই রায় আসার পর হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা ‘জাতির জন্য অসম্মানের’। বিচারপতিদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কিছু বিচারপতির জন্য তিনি ‘সত্যিকারে লজ্জা বোধ করছেন’। বিচারপতিরা ‘বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষা’ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে শুল্ককে ব্যবহার করছেন। তবে গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতার নজিরবিহীন ব্যবহার করছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছেন।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপ বিশ্ববাণিজ্যের জন্য বিরাট এক ধাক্কা হয়ে আসে। ওই শুল্ক ঘোষণার সময় ট্রাম্প দিনটিকে আমেরিকার ‘স্বাধীনতা দিবস’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য তা বড় দুঃসংবাদ হয়ে আসে। সে সময় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এরপর বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোটভুক্ত দেশগুলোসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে দেনদরবার চলতে থাকে। তিন মাসের আলোচনার পর গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে আলোচনার মধ্য দিয়ে গত বছর আগস্টে তা ২০ শতাংশে নেমে আসে। এর ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করেছে বাংলাদেশ। তাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা ধরনের পণ্য আমদানির শর্ত রয়েছে। আর বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশ কমে হয় ১৯ শতাংশ।
পাল্টা শুল্কের বাইরে আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে দেশটিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। পাল্টা শুল্কারোপের পর সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্ক দাঁড়ায় ৩৪ শতাংশে। এখন আদালতের রায়ে পাল্টা শুল্ক বাতিল এবং নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মোট শুল্ক পরিবর্তিত হবে। তবে সেটা মোট কত শতাংশ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গতকাল হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সব দেশের পণ্য আমদানিতে বিদ্যমান শুল্কের ওপর বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন। তিনি এ-ও বলেন, তাঁর শুল্কের হুমকির মুখে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে, তার অনেকগুলো বহাল থাকবে। আলাদাভাবে ভারতের নাম উল্লেখ করে চুক্তি বহাল থাকার কথা বলেন তিনি।
অন্য দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের বিকল্প আরও উপায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ওই উপায়গুলো কাজে লাগালে সম্ভবত আরও বেশি আয় করা সম্ভব হবে। এ জন্য কিছু আইন ও ধারার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন এবং ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইন।
আদালতের এই রায় নিয়ে মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো এএফপিকে বলেন, আদালতের রায়ের পর গড় শুল্কহার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে এই কমাটা সাময়িক হতে পারে। কারণ, নতুন করে ব্যাপক হারে শুল্ক আরোপের জন্য অন্য পথ খুঁজতে পারে মার্কিন সরকার।