ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে পাল্টা আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরান গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল হিসাব–নিকাশ’ না করার পরামর্শ দিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটনের হামলার জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ–এর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বিক্ষোভকারী। তবে রয়টার্স নিহতের সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। ইরান সরকারিভাবে হতাহতের কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে।
‘দাঙ্গাবাজদের’ সমাজ অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ‘প্রতিবাদ জনগণের অধিকার’ উল্লেখ করে গতকাল তিনি বলেছেন, ‘জনগণকে এটা বিশ্বাস করা উচিত যে আমরা (সরকার) ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইরান। মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ এরই মধ্যে দেশটির বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান দাবি করছেন। ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
চলমান এ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানে ‘হস্তক্ষেপের’ হুমকি দিয়েছেন। ইরানি নেতৃত্বকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ না করার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। গত শনিবারও ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের ‘সহায়তা দিতে প্রস্তুত’।
এর পরদিন গতকাল ইরানের পার্লামেন্টে স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল হিসাব’ না করার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেন। ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক এই কমান্ডার বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, ইরানে হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে।’
ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশটিতে চলমান অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে।
বাড়ছে নিহতের সংখ্যা
বিক্ষোভ মোকাবিলার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে। এতে করে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস গতকাল জানিয়েছে, ইরানে ৬০ ঘণ্টার বেশি সময় ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ গতকাল জানায়, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী; নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন ৪৮ জন।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন পশ্চিমাঞ্চলের গাচসারান, ইয়াসুজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজা ও দাফনের দৃশ্য প্রচার করেছে।
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাতে রাজধানীর তেহরানের পুনাক এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে একটি সেতু বা ধাতব কাঠামোয় আঘাত করছেন। রয়টার্স ভিডিওটিতে দেখানো স্থানটি যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তা
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘জনগণের যদি কোনো উদ্বেগ থাকে, আমরা তা শুনব। এটি আমাদের কর্তব্য। কিন্তু সর্বোচ্চ কর্তব্য হলো দাঙ্গাবাজদের সমাজকে অস্থিতিশীল করতে না দেওয়া।’ তিনি ‘দাঙ্গাবাজদের’ বিরুদ্ধে জনগণকে এক হওয়ার আহ্বান জানান।
পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দোষারোপ করে বলেন, তারা অস্থিরতাকে আরও উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘তারা দেশ ও বিদেশের কিছু ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তারা বিদেশ থেকে সন্ত্রাসীদের দেশে (ইরান) নিয়ে এসেছে।’
‘যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত’
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ইরান এখন বেশি করে স্বাধীনতা খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত!’
এদিকে ইসরায়েলি একটি সূত্র জানায়, শনিবার টেলিফোনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওই আলোচনায় উপস্থিত একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তাও নেতানিয়াহু এবং রুবিওর মধ্যকার কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি আলোচনার বিষয়বস্তুর বিষয়ে কিছু জানাননি।
‘সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়’ ইসরায়েল
সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠকে উপস্থিত তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দেশটি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তবে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ইসরায়েল সরকারের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সেনাবাহিনীও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানে বিমান হামলা চালায়। জবাবে কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান।
ইসরায়েল এখনো সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি। তবে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কারণে দেশ দুটির মধ্যে বরাবরই উত্তেজনা রয়েছে।