ইসরায়েলি বোমা থেকে বাঁচলেও অজানা ভাইরাসে মরছে গাজার মানুষ
ফ্লুয়ের উপসর্গ নিয়ে মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন মারওয়া কালুব। তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত তাঁর মেয়ে মরিয়ম আর বাড়িতে ফিরবে না। মেয়ের মৃতদেহ নিয়ে তাঁকে হাসপাতাল ছাড়তে হবে।
৩৮ বছর বয়সী এই মায়ের বিশ্বাস ছিল, মেয়ের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আর জ্বর-সর্দির সাধারণ ওষুধেই মরিয়ম সুস্থ হয়ে উঠবে, কিন্তু যা হয়েছে তা ছিল অপ্রত্যাশিত।
প্রায় দুই বছর ধরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলছে। গত বছর অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সেখানে ইসরায়েলের হামলা থামেনি। ইসরায়েল গাজায় এখনো ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
ফলে গাজার বাসিন্দাদের মাসের পর মাস তীব্র অনাহারে কাটাতে হচ্ছে। এতে তাদের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, সাধারণ অসুস্থতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
মরিয়মের খালা ইমান কালুব মিডলইস্ট আইকে বলেন, ‘মরিয়মের আগে কোনো শারীরিক জটিলতা বা অসুস্থতা ছিল না। মারা যাওয়ার আগে ওর প্রচণ্ড কাশি, বমি ভাব এবং অনেক জ্বর হয়েছিল। সে খাবার খাওয়াদাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল।’
এই নারী আরও বলেন, ‘গাজায় অনেক মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো তার সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগবে। আমরা কখনো কল্পনাও করিনি, সে এভাবে শেষ হয়ে যাবে।’
কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি রূপান্তরিত (মিউটেড) ভাইরাস গাজাজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
সেখানকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখনো ভাইরাসটি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারেনি। এ জন্য তারা পরীক্ষার সীমিত সুযোগ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের গুরুতর ঘাটতির কথা বলেছেন। স্থানীয়রা ভাইরাসের অপ্রত্যাশিত প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছেন।
৮ বছর বয়সী মরিয়মকে ১১ জানুয়ারি রানতিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই হাসপাতাল একসময় গাজায় কিডনির রোগ ও ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র ছিল।
ইসরায়েলি বাহিনী গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বারবার আঘাত হেনে এটিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বর্তমানে রানতিসি হাসপাতালটি শ্বাসনালি ও অন্ত্রসংক্রান্ত সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটি মেরামত এবং পরিষেবা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। তা সত্ত্বেও হাসপাতালটিকে ব্যাপক চাপ সামলাতে হচ্ছে।
প্রচণ্ড কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত মরিয়মের শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করলে তার মা তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন।
ইমান কালুব বলেন, হাসপাতালে আসা অসুস্থ শিশুর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে তাকে একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানোর জন্য কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন, মরিয়মের ফুসফুসের অবস্থা খুবই গুরুতর। তাকে চিকিৎসা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
ইমান কালুব আরও বলেন, ‘তাঁরা শুধু তাকে অক্সিজেন দিতে পেরেছিল। তাকে এমনকি স্যালাইন পর্যন্ত দিতে পারেনি। হয়তো তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, তাকে আর বাঁচানো যাবে না।’
৮ বছর বয়সী মরিয়মকে ১১ জানুয়ারি রানতিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই হাসপাতাল একসময় গাজায় কিডনির রোগ ও ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বারবার আঘাত হেনে এটিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বর্তমানে রানতিসি হাসপাতালটি শ্বাসনালি ও অন্ত্রসংক্রান্ত সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিবারটি অনেক আশা নিয়ে অক্টোবরের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছিল। তারা একটি বাড়ি মেরামত করছিল এবং মরিয়ম স্কুলে যেতে শুরু করেছিল।
মাসের পর মাস বোমাবর্ষণের ভেতর বেঁচে থাকা একটি শিশু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরে গেল, যা পরিবারটি কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
ইমান বলেন, দুই বছরের যুদ্ধ তাকে হত্যা করতে পারেনি। একটি ছোট ভাইরাস সেটা করল।
‘প্রতিরোধ করা যেত’
দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই রোগের কারণে গাজাজুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে পরিবারগুলোকে শিশুদের বাড়ির ভেতরে রাখার এবং সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা বা সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকেরা এখনো এই রোগের কারণ শনাক্ত করতে বা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি। দুই বছর ধরে ইসরায়েলি জাতি হত্যায় গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
মরিয়মের আগে কোনো শারীরিক জটিলতা বা অসুস্থতা ছিল না। মারা যাওয়ার আগে ওর প্রচণ্ড কাশি, বমি ভাব এবং অনেক জ্বর হয়েছিল। সে খাবার খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল
গাজা নগরের আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজা নজিরবিহীন মানবিক ও স্বাস্থ্যসংকটের মুখোমুখি। এখানে এমন কোনো বাড়ি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে এ রোগে কেউ আক্রান্ত হয়নি।
এই কর্মকর্তার ধারণা, ভাইরাসটি ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি রূপান্তরিত ধরন হতে পারে বা এমনকি কোভিড-১৯ ভাইরাসও হতে পারে।
আবু সালমিয়া বলেন, জরুরি রোগী ভর্তি প্রায় ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ রোগী শ্বাসনালিতে সংক্রমণ, প্রচণ্ড জ্বর, ওজন অনেক কমে যাওয়া এবং জয়েন্টের ব্যথায় ভুগছেন।
গুরুতর নিউমোনিয়া নিয়ে কয়েক হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, কিছু রোগীকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গাজার অধিকাংশ চিকিৎসাকেন্দ্র পূর্ণ সেবা দিতে সক্ষম নয়। হেলথ ক্লাস্টার ওই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৫ শতাংশ জরুরি ওষুধের সরবরাহ নেই। মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জামের মজুত ৭১ শতাংশ খালি হয়ে গেছে।
আবু সালমিয়া আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে ওষুধ এবং পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম নেই, যার কারণে রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে গেছে। রোগীর সংখ্যা হঠাৎ অনেক বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে শয্যার ব্যবহার ১৫০ থেকে ২০০ শতাংশে পৌঁছেছে।’
বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে অতিরিক্ত ভিড়, ছেঁড়া তাঁবু, দূষিত পানি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ বলে মনে করেন তিনি।
এই কর্মকর্তা বলেন, শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন। দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টি সংক্রমণ প্রতিরোধক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে, ফলে কিডনির রোগ, ক্যানসার এবং হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জটিলতা বাড়ছে, তাঁরা মারা যাচ্ছেন। শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেও রোগ দ্রুত ছড়াচ্ছে।
দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই রোগের কারণে গাজাজুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে পরিবারগুলোকে শিশুদের বাড়ির ভেতরে রাখার এবং সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার বা সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলো গত মাসে জানিয়েছে, গাজায় ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ৭৭ শতাংশ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছেন।
অনাহারে থাকা মানুষগুলো রোগাক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। অথচ এই ঝুঁকি কমানো যেত, মৃত্যু আটকানো যেত।
আবু সালমিয়া বলেন, ‘স্বল্প সম্পদ নিয়ে জীবন রক্ষায় কাজ করা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষ্ঠা সত্ত্বেও আমাদের গভীর দুঃখের সঙ্গে বহু মৃত্যু দেখতে হচ্ছে, যেগুলো আটকানো যেত।’