হরমুজ প্রণালির কাছে কয়েকটি জাহাজে সফলভাবে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। হামলার শিকার হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজও রয়েছে। তেহরানের ভাষ্য, এসব হামলার কারণে ওয়াশিংটন তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের উপকূল থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ১৪ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একটি জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার পর আট মার্কিন মেরিন সদস্য ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়ার কারণে অসুস্থ হন। তাঁদের কয়েকজনের মস্তিষ্কে আঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে।
যদিও পেন্টাগন এর আগে অনেকটা নীরবে যুদ্ধাহত মার্কিন সেনাসদস্যদের তালিকায় ২৯ জন নাবিক ও ৮ জন মেরিন কোর সদস্যের নাম যুক্ত করেছে। এর ফলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর আহত মার্কিন সেনাসদস্যের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬১ জনে। এ পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
আল–জাজিরা এসব প্রতিবেদন নিয়ে মন্তব্য জানতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু সেন্টকম কোনো জবাব দেয়নি।
এর আগে সেন্টকম বলেছিল, চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন জাহাজগুলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা সফলভাবে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন মেরিন সদস্যদের আহত হওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, হামলার সময় তাঁরা যে জাহাজে ছিলেন, সেটি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ছিল না।
যদিও পেন্টাগন এর আগে অনেকটা নীরবে যুদ্ধাহত মার্কিন সেনাসদস্যদের তালিকায় ২৯ জন নাবিক ও ৮ জন মেরিন সদস্যের নাম যুক্ত করেছে। এর ফলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আহত মার্কিন সেনাসদস্যের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬১ জনে। এ পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
যখনই তারা সেই ঝুঁকি নিয়েছে, তখনই নিজেদের জন্য ক্ষতি ডেকে এনেছে। আর শিগগিরই আরব সাগরও তাদের থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের সরকারসংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো তাদের আগের অবরোধ অবস্থান থেকে পিছিয়ে গেছে। এর আগে এসব জাহাজ ইরানের চাবাহার বন্দর ও ওমান উপসাগরের প্রবেশমুখের কাছাকাছি অবস্থান করছিল। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এড়াতে এখন সেগুলো আরব সাগরের মধ্যভাগের দিকে সমুদ্রের আরও গভীরে সরে গেছে।
গতকাল সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বার্তা প্রকাশ করা হয়। সেখানে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর গতিবিধির কথা উল্লেখ করেছেন।
ওই বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, ‘যখনই তারা সেই ঝুঁকি নিয়েছে, তখনই নিজেদের জন্য ক্ষতি ডেকে এনেছে। আর শিগগিরই আরব সাগরও তাদের থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।’
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট রোববার বলেছেন, এখন প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট অবশ্য আরও বেশি—প্রতিদিন ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল চলাচল করছে বলে হিসাব দিয়েছেন। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে যেত।
উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেও বেড়েছে তেল পরিবহন
ইরানি কর্তৃপক্ষের এ ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এমন সময় আসছে, যখন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি জ্বালানি বহনকারী জাহাজ চলাচল করাতে সক্ষম হয়েছে। যদিও যুদ্ধের আগে এই জলপথ দিয়ে যেভাবে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল করত, সেই অবস্থায় ফিরে আসতে এখনো অনেক দেরি।
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট রোববার বলেছেন, এখন প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট অবশ্য আরও বেশি—প্রতিদিন ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল চলাচল করছে বলে হিসাব দিয়েছেন। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে যেত।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) জোর দিয়ে বলছে, ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় না করে কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না।
‘এর অর্থ হতে পারে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সংখ্যা ও তীব্রতা আরও বাড়ানো, প্রতিটি হামলায় আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করা, জাহাজগুলোর নিরাপত্তায় থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা, এমনকি মার্কিন সেনাসদস্যদের হতাহত করার চেষ্টা করা।’
গত রোববার বেসেন্ট আরও দাবি করেছেন, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান নিজেদের তেল রপ্তানি করতে পারছে না। ফলে সমুদ্রে আগে থেকে মজুত থাকা প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেলই কেবল এখন তাদের হাতে রয়েছে, যা সম্ভবত দুই সপ্তাহের মধ্যে চীনে পাঠানো হবে।
সোমবার কেপলার প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়ে থাকতে পারে। তথ্য ও বিশ্লেষণবিষয়ক প্রতিষ্ঠানটি গত শুক্রবার জানিয়েছিল, গত সপ্তাহে ১৯টি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। এর মধ্যে ১৭টি ছিল অতি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি)। প্রতিটি ভিএলসিসিতে ২০ লাখ ব্যারেল করে তেল বহন করা যায়।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, ওমান, কাতার, কুয়েত ও ইরান থেকে পাঠানো তেলসহ ওই অঞ্চলে আঞ্চলিক তেল রপ্তানি সেপ্টেম্বরে বেড়ে প্রতিদিন ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকেরা বলেন, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সরকার নিজেদের তেল ওই অঞ্চল থেকে বাইরে বের করতে শাটল ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, আর মার্কিন বাহিনী এতে নিরাপত্তা দিচ্ছে। তাঁদের মতে, এসব কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিমা কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। ফলে বেশি প্রিমিয়ামও দিতে হচ্ছে না।
এই ব্যবস্থায় পুরোনো বা তুলনামূলক কম মূল্যবান ভিএলসিসি এবং ছোট আকারের অন্যান্য জাহাজ ব্যবহার করা হয়। এসব জাহাজ কখনো কখনো তাদের ট্রান্সপন্ডার (জাহাজে থাকা একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা জাহাজটির পরিচয়, অবস্থান, গতি ও চলার দিক সম্পর্কে তথ্য পাঠায়) বন্ধ করে ওমানের উপকূল ঘেঁষে চলতে থাকে, যতক্ষণ না তারা প্রণালির বাইরে চলে যায়। এরপর তারা জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করে এবং আবার তেল ভরার জন্য জলপথটিতে ফিরে আসে।
মধ্যস্থতাকারীরা উত্তেজনা কমিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু এরপরও দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং মধ্যস্থতাকারীরা এই কূটনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর সরাসরি আলোচনা হবে না। ভবিষ্যৎ চুক্তির ভিত্তি হিসেবে তারা জুনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং ওমানের সঙ্গে চূড়ান্ত করা হরমুজ চুক্তি ব্যবহার করতে চায়। এতে হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টিও থাকবে।
এই ব্যবস্থায় পুরোনো বা তুলনামূলক কম মূল্যবান ভিএলসিসি এবং ছোট আকারের অন্যান্য জাহাজ ব্যবহার করা হয়। এসব জাহাজ কখনো কখনো তাদের ট্রান্সপন্ডার (জাহাজে থাকা একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা জাহাজটির পরিচয়, অবস্থান, গতি ও চলার দিক সম্পর্কে তথ্য পাঠায়) বন্ধ করে ওমানের উপকূল ঘেঁষে চলতে থাকে, যতক্ষণ না তারা প্রণালির বাইরে চলে যায়। এরপর তারা জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করে এবং আবার তেল ভরার জন্য জলপথটিতে ফিরে আসে।
ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, বর্তমান কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকলে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে আরও বেশি হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান। কারণ, ইরান চায় না ওয়াশিংটনে এমন ধারণা তৈরি হোক যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব কমে যাচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রেখেই যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে পারবে।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘এর অর্থ হতে পারে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সংখ্যা ও তীব্রতা আরও বাড়ানো, প্রতিটি হামলায় আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করা। এর পাশাপাশি জাহাজগুলোর নিরাপত্তায় থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা, এমনকি মার্কিন সেনাসদস্যদের হতাহত করার চেষ্টা করা।’
অক্সিলিয়ামের রালবি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সহিংস পদক্ষেপই ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো পক্ষকেই এমন অবস্থায় নিতে পারেনি, যেখানে তারা তাদের প্রচেষ্টা থেকে সরে এসে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে যেতে রাজি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করে যাওয়ার মতো ইরানের সক্ষমতা ওয়াশিংটনের প্রচার করা কিছু বয়ানকে দুর্বল করে দিয়েছে।
রালবি বলেন, ‘এটি ইরানের স্বার্থে কাজে লাগতে পারে। তবে এর ফলে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ দ্রুততর হওয়ার সম্ভাবনা কম।’