লেবাননের ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ কী, ইসরায়েল কেন এটি দখল করল

মধ্যযুগীয় বিউফোর্ট দুর্গের ওপর ইসরায়েলের পতাকা উড়ছে। ছবিটি ৩১ মে দক্ষিণ লেবাননের মারজাইয়ুন এলাকা থেকে তোলাছবি: এএফপি

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত মধ্যযুগীয় বিউফোর্ট দুর্গ দখল করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের মধ্যে ঐতিহাসিক এ দুর্গ দখলের ঘটনা ঘটেছে।

ইসরায়েল–লেবানন যুদ্ধবিরতি আলোচনা চলার মধ্যে গত রোববার দুর্গটি দখল করার ঘোষণা আসে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ওই দিন ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধে নিহত সেনাদের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘গ্যালিলি অঞ্চলের (ইসরায়েলের উত্তরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক পাহাড়ি এলাকা) জনপদগুলোর ওপর নজর রাখায় ব্যবহৃত পাহাড়চূড়াগুলোতে আবারও ইসরায়েলের পতাকা উড়ছে।’

ইসরায়েলি সংবাদপত্র দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে কাৎজের এমন বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ বহুবার হাতবদল হয়েছে। ক্রুসেডার শাসকদের কাছ থেকে এর নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির হাতে গেছে। এর মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যও ছিল। ঐতিহাসিকভাবে দুর্গটির উঁচু অবস্থানের কারণে এটি এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল।

কাৎজ আরও বলেন, ‘আমাদের বীর সেনারা আবারও বিউফোর্ট দুর্গ দখল করেছেন এবং লেবাননের ভেতর “নিরাপত্তা অঞ্চলের অংশ” হিসেবে সেখানে অবস্থান করবেন।’

কাৎজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিউফোর্ট দুর্গের একটি ছবি প্রকাশ করেছেন। সেখানে ইসরায়েলের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি দেশটির সেনাবাহিনীর গোলানি ব্রিগেডের (প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরিচিত ও সম্মুখসারির পদাতিক ব্রিগেড) পতাকাও দেখা যায়।

প্রশ্ন হলো—বিউফোর্ট দুর্গ প্রকৃতপক্ষে কী, ইসরায়েল কীভাবে এটি দখল করল এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

ইসরায়েলি সেনারা লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিউফোর্ট রিজে অভিযান চালাচ্ছেন। ৩১ মে, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

বিউফোর্ট দুর্গ কী

বিউফোর্ট দুর্গ আরবিতে কালাত আল-শাকিফ নামে পরিচিত। ৯০০ বছরের পুরোনো দুর্গটির অবস্থান লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০ মিটার (২ হাজার ৩০০ ফুট) উঁচু একটি পাথুরে পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত। ১২ শতকে ক্রুসেডাররা এই দুর্গটি নির্মাণ করেছিল। এখান থেকে লিতানি নদীর ওপর নজর রাখা যায়।

ক্রুসেডাররা (ক্রুসেডার হলেন মধ্যযুগে, বিশেষ করে একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইউরোপের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত রাজ্যগুলো থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ বা ক্রুসেডে অংশ নেওয়া যোদ্ধারা) দুর্গটির নাম রাখেন বিউফোর্ট। প্রাচীন ফরাসি ভাষায় এটির অর্থ ‘সুন্দর দুর্গ’।

শতাব্দীর পর শতাব্দী এ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ বহুবার হাতবদল হয়েছে। ক্রুসেডার শাসকদের কাছ থেকে এর নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির হাতে গেছে। এর মধ্যে ছিল অটোমান সাম্রাজ্যও। উঁচু অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল এটি। ফলে দুর্গটি যে পক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকত, সেই পক্ষ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় চলাচলের ওপর নজরদারি রাখতে পারত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা এ স্থানকে একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় এটি দখল করেছিল ইসরায়েল। ২০০০ সালে ওই এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার করা হয়।

লেবাননের পঞ্চম বৃহত্তম শহর নাবাতিয়েহর কাছে একটি কৌশলগত পাহাড়চূড়ায় বিউফোর্ট দুর্গের অবস্থান। ইসরায়েলি বাহিনী এর আশপাশের পাহাড়ি চূড়ার নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে। বিউফোর্ট দুর্গটি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

দুর্গটির কৌশলগত গুরুত্ব

লেবাননের পঞ্চম বৃহত্তম শহর নাবাতিয়েহর কাছে একটি কৌশলগত পাহাড়চূড়ায় বিউফোর্ট দুর্গের অবস্থান। ইসরায়েলি বাহিনী এর আশপাশের পাহাড়ি চূড়ার নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে। বিউফোর্ট দুর্গটি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

দুর্গটি দখল করার কারণে ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর নজরদারির এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র পেয়েছে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল, হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করা ও ইসরায়েলি সীমান্তের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ উঁচু ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থানকারী আল–জাজিরার সাংবাদিক ওবাইদা হিত্তো বলেন, দুর্গটি দখল করার কারণে ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ‘উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা’ পেয়েছে।

ওবাইদা বলেন, ‘এখান থেকে নাবাতিয়েহ শহরের আশপাশের সব শহর ও গ্রামের ওপর নজর রাখা হয়। পাশাপাশি পশ্চিম বেকা উপত্যকা, অধিকৃত গোলান মালভূমি ও উত্তর গ্যালিলি পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা যায়।’

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে এখন কী ঘটছে

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষেরা যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানের মধ্যে আছেন। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় অঞ্চলটিতে ৩ হাজার ৪১২ জনের মতো নিহত ও ১০ হাজার ২৬৯ জন আহত হয়েছেন।

ইসরায়েলি বাহিনী কয়েক দিন ধরে লড়াই ও আশপাশের গ্রামগুলোতে বিমান হামলার পর বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে। নাবাতিয়েহর কাছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার দিকে অগ্রসর হয়ে তারা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।

আল–জাজিরার হিসাব অনুযায়ী, শুধু গত রোববারই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ৩৬টির বেশি হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন।

ভিডিও থেকে নেওয়া স্ক্রিনশটে বিউফোর্ট দুর্গে ইসরায়েলি সেনাদের দেখা যাচ্ছে। ৩১ মে, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। এরপর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশ দখল করে ইসরায়েল। দেশটি বর্তমানে প্রায় ২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, যা লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

লেবাননে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ গত ২ মার্চ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে হাইফা এলাকার কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা স্থাপনায় রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিকতম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তারা। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে দুপক্ষের যুদ্ধবিরতির পর থেকে গত ২ মার্চের আগ পর্যন্ত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা করেনি।

আরও পড়ুন

গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননে আরও ভেতরে ঢুকে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যেসব এলাকা আগে হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করা হবে।

গতকাল সোমবার লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি গ্রামের বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় ইসরায়েল। গ্রামগুলো হলো—হুমাইন আল-ফাওকা, বনাফৌল, আরব সালিম, রুমিন, আজজি, আরকি ও জাবা।

এসব গ্রামের বাসিন্দাদের অন্তত এক হাজার মিটার দূরে সরে যেতে বলা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, সেখানে তাদের নতুন হামলার পরিকল্পনা আছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদ্রাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ঘোষণা করেন, ইসরায়েল হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে বলে ওই সব এলাকার বাসিন্দাদের অবিলম্বে অন্তত এক হাজার মিটার দূরে সরে যেতে হবে।

আরও পড়ুন