লেবাননে ৯০০ বছরের পুরোনো কৌশলগত দুর্গ দখল করে নিল ইসরায়েলি বাহিনী

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গে অবস্থান করছে ইসরায়েলি সেনারাছবি: ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর দেওয়া ছবিটি প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান

লেবাননের আরও গভীরে ঢুকে পড়েছে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী। তারা প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে নিয়েছে। সেখানে তারা ইসরায়েলি পতাকা উড়িয়েছে। এটাকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইরানপন্থী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলা লড়াইয়ে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ কৌশলগত অর্জন বিবেচনা করা হচ্ছে।

লেবাননের অভ্যন্তরে লিতানি নদী পেরিয়ে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। গত ২৬ বছরের বেশি সময় ধরে কখনোই দেশটির এতটা ভেতরে ইসরায়েলি বাহিনী অনুপ্রবেশ করেনি।

দুর্গের কাছাকাছি গ্রামগুলোয় কয়েক দিন ধরে তীব্র লড়াই চলছিল। চালানো হয়েছে বিমান হামলাও। এরপর আজ রোববার ইসরায়েলের উগ্র ইহুদিবাদী সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেন, তাঁদের সেনারা বিউফোর্ট দুর্গটি দখলে নিয়েছেন। এ দুর্গ ‘কালাত আল–শাকিফ’ নামেও পরিচিত। সবশেষ ১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে দখলদারির সময় এ দুর্গকে নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রকাশ করা ছবি ও বার্তা সংস্থা এএফপির যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিউফোর্ট দুর্গে ইসরায়েল ও গোলানি ব্রিগেডের পতাকা উড়ছে। ভিডিওতে দেখা যায়, আশপাশের পাহাড়ে গোলাবর্ষণ হচ্ছে। সেই শব্দও শোনা যাচ্ছে। সেখান থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মধ্যযুগীয় দুর্গটি থেকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বড় একটি অংশের ওপর নজরদারি করা যায়। তাই ইসরায়েলি বাহিনীর এ অর্জনকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে।

এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত অবকাঠামো ধ্বংস করা ও এলাকাটিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ করতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বিউফোর্ট চূড়া ও ওয়াদি আল–সালুকি এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। তাদের বাহিনী লিতানি নদী পেরিয়ে সেসব অবস্থান দখল করে নিয়েছে, যেখান থেকে হিজবুল্লাহ হামলা চালাচ্ছিল এবং ইসরায়েলের ভূখণ্ডে রকেট ছুড়ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনা এখন অনেকটাই থমকে রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অঞ্চলটিতে যে শূন্যতা দেখা দিয়েছে, সেটার সুযোগ নিয়ে লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনা এখন অনেকটাই থমকে রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অঞ্চলটিতে যে শূন্যতা দেখা দিয়েছে, সেটার সুযোগ নিয়ে লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। বিশ্লেষকদের মত, ওয়াশিংটন ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হওয়া এবং সেই চুক্তি মোতাবেক এখনকার অভিযানে সীমা টানা বা পুরোপুরি বন্ধ করার আগেই ইসরায়েলের কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডাররা হিজবুল্লাহর যথাসম্ভব বেশি ক্ষতি করতে চাইছেন।

ইসরায়েলি বাহিনী এখন লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নাবাতিয়েহ শহরটি ঘিরে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এর আশপাশের পাহাড়গুলোয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল অংশ ও পশ্চিম বেকা উপত্যকায় নজরদারি করা যাবে। এটা রণক্ষেত্রে ইসরায়েলি বাহিনীকে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে।

আরও পড়ুন
ইসরায়েলের বিমান হামলার পর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের মারজাইউন এলাকার কফার তিবনিত গ্রাম থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে
ছবি: এএফপি

গত ১৭ এপ্রিল ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু শুরু থেকেই তা ভঙ্গুর পরিস্থিতির মুখে পড়ে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একের পর এক অভিযান চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। হিজবুল্লাহও পাল্টা জবাব দেয়। প্রায় প্রতিদিনই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। সেই সঙ্গে জবাব দেওয়ার যুক্তিতে নিজেদের অভিযানকে ন্যায্যতা দেওয়া চেষ্টা করেছে।

লেবাননের বাসিন্দাদের কাছে নাবাতিয়েহ শহরের তাৎপর্য এর কৌশলগত গুরুত্বের চেয়ে বেশি। শহরটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক স্মৃতি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মনের গভীরে গেঁথে আছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এ শহর বারবার ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মুখে পড়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ইসরায়েলি বাহিনী জাওতার আল–শারকিয়াহ ও মেফাদৌন শহর অতিক্রম করেছে। এখন চৌকিনের দিকে এগোচ্ছে। সেখানে বড়সড় সামরিক অভিযানের আশঙ্কায় গতকাল শনিবার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন
বিশ্লেষকদের মত, ওয়াশিংটন ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হওয়া এবং সেই চুক্তি মোতাবেক এখনকার অভিযানে সীমা টানা বা পুরোপুরি বন্ধ করার আগেই ইসরায়েলের কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডাররা হিজবুল্লাহর যথাসম্ভব বেশি ক্ষতি করতে চাইছেন।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম গতকাল অভিযোগ করেন, ইসরায়েলিরা হামলা চালিয়ে তাঁর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের গ্রাম ও শহরগুলো ধ্বংস করছে। সেখানকার অধিবাসীদের নির্বাসনে যেতে বাধ্য করছে। এর মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে ‘পোড়ামাটি নীতি’ বাস্তবায়ন করছে ইসরায়েলি বাহিনী। স্থানীয় লোকজনকে ‘সম্মিলিত শাস্তি’ দেওয়া হচ্ছে।

নাওয়াফ সালাম সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ইসরায়েলিরা নিরাপত্তা কিংবা স্থিতিশীলতা—কোনোটাই অর্জন করতে পারবে না।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী জানান, শান্তি ফেরাতে তাঁর সরকার প্রতিবেশী ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করছে। গত শুক্রবারও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে দুই দেশের প্রতিনিধিরা নিরাপত্তা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আরও আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে।

নাওয়াফ সালাম বলেন, আলোচনার ফলাফল ‘নিশ্চিত নয়’। তবে এ উদ্যোগকে তিনি ‘আমার দেশ ও জনগণের জন্য সবচেয়ে কম মূল্য চোকানোর পথ’ বলে মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন

গতকাল দিনের শুরুতে হিজবুল্লাহ জানায়, তারা ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের মেরন ঘাঁটির এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ইউনিটকে নিশানা করে হামলা চালিয়েছে। এটি লেবাননের সীমান্তের একেবারে কাছে অবস্থিত একটি কৌশলগত নজরদারি ও কমান্ড কেন্দ্র। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের কিরয়াত সামোনায় রকেট হামলার দায় স্বীকার করেছে। চলমান লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ইসরায়েলি জনপদগুলোর অন্যতম এটি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, রকেট ছোড়ার পরপর ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের সমুদ্রসৈকতে থাকা লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। গত তিন সপ্তাহের মধ্যে লেবানন থেকে ইসরায়েলের উপকূলীয় শহর নাহারিয়ার দিকে এটি প্রথম হামলার ঘটনা।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে ইসরায়েলের হামলায় ৩ হাজার ৩৭১ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

তেহরানের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তি ফেরানোর যেকোনো প্রচেষ্টা ও চুক্তিতে অবশ্যই লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

আরও পড়ুন