কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত খামেনির, ট্রাম্প বলছেন পরিস্থিতি বিপজ্জনক

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার রাতে বিক্ষোভের এ দৃশ্যটি উত্তর তেহরানেরছবি: বিবিসির সৌজন্যে

ইরানে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থায় অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট বিক্ষোভ চলছেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ জনে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ গতকাল শনিবার বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গতকাল সতর্ক করে বলেছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষাই তাদের জন্য ‘শেষ কথা’। বিদ্যমান পরিস্থিতি আর কোনোভাবেই চলতে পারে না। আর সেনাবাহিনী বলেছে, সরকারি সম্পদ সুরক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক এ বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার যখন তৎপরতা বাড়িয়েছে, তখন আইআরজিসি ও সেনাবাহিনীর তরফে এ বক্তব্য এল।

এর আগে গত শুক্রবার ইরানের নেতাদের আবার সতর্ক করে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানায়, রাজধানী তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি পৌর ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার জন্য ‘দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য দেখানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিরাজ, কোম ও হামেদান শহরে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর এসব সদস্য নিহত হয়েছেন।

মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দেশটির বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান দাবি করছেন। অবশ্য ইরানি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এসব ‘দাঙ্গা’ উসকে দিচ্ছে।

এদিকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর (মোহাম্মদ রেজা পাহলভি) ছেলে রেজা পাহলভি বিদেশ থেকে বিক্ষোভে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন।

হাসপাতালে অনেক আহত বিক্ষোভকারী

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একজন চিকিৎসক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, শুক্রবার থেকে আহত অনেক বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে। কারও মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। কারও হাত-পা ভাঙা। আবার কারও শরীরে গভীর ক্ষত রয়েছে। একটি হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অন্তত ২০ জনকে আনা হয়েছিল। পরে তাঁদের মধ্যে পাঁচজন মারা যান।

বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির জনসংযোগ দপ্তর জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গাচসারানে ‘সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের’ সঙ্গে সংঘর্ষে বসিজ বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচজন। পশ্চিমাঞ্চলীয় হামেদানে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বের মাশহাদের আহমদাবাদ এলাকায় নিহত হয়েছেন এক ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের ছেলে। গত দুই রাতে খুজেস্তানের শুশতার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হয়েছেন।

ইরানের মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত তারা ৬৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫০ জন বিক্ষোভকারী, ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

বিপ্লবী গার্ড ও সেনাবাহিনীর বিবৃতি

ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ (ব্ল্যাকআউট) রেখেছে। এ কারণে অনেক তথ্যই বহির্বিশ্বে পৌঁছাচ্ছে না।

দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের একজন বাসিন্দা টেলিফোনে রয়টার্সকে জানান, তাঁদের এলাকায় আইআরজিসির সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা গুলি চালাচ্ছেন। নিরাপত্তার কারণে ওই ব্যক্তি তাঁর পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, গত দুই রাতে ‘সন্ত্রাসীরা’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। আগুন দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনায়।

আইআরজিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অর্জন রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের জন্য ‘শেষ কথা’ (রেড লাইন)। বর্তমান পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেনাবাহিনী জানায়, তারা ‘জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো ও সরকারি সম্পদের সুরক্ষা’ দেবে।

আইআরজিসির বাইরে পৃথক কাঠামোয় পরিচালিত হয় সেনাবাহিনী। এই বাহিনীও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীন।

‘শহরের কেন্দ্রস্থল’ দখলের প্রস্তুতির আহ্বান পাহলভির

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া সর্বশেষ বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রেজা পাহলভি বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এখন আর শুধু রাস্তায় নামা নয়, শহরগুলোর কেন্দ্রস্থল দখল ও ধরে রাখার প্রস্তুতি নিতে হবে।’ তিনি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত, বিশেষ করে পরিবহন, তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের শ্রমিক ও কর্মচারীদের দেশব্যাপী ধর্মঘটে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আপাতত পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী নন। এতে ইঙ্গিত স্পষ্ট যে সংকট কোন দিকে যায়, তা দেখেই তিনি বিরোধী নেতৃত্বের বিষয়ে অবস্থান নেবেন।

এর আগে গত সপ্তাহে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। শুক্রবার তিনি আরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘তোমরা যদি গুলি চালাও, আমরাও গুলি চালাব।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি শুধু চাই, ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকুক। পরিস্থিতি এখন খুবই বিপজ্জনক।’

রাজপথে কিছু বিক্ষোভকারী অবশ্য পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন। ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’—এমন স্লোগানও শোনা গেছে। তবে অধিকাংশ স্লোগানে বর্তমান সরকারের শাসনের অবসান এবং অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের দাবি তোলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দেশটির অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন

‘সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ’

চলমান বিক্ষোভ অন্তত তিন বছরের মধ্যে ইরানের শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট ও গত বছরের যুদ্ধের পর সরকার আগের তুলনায় বেশি নাজুক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

শুক্রবার ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার নিন্দা জানান। তাঁরা ইরানকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

ইরানের কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, অর্থনৈতিক দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বৈধ। তাদের নিরাপত্তা বাহিনী কেবল ‘সহিংস দাঙ্গাবাজদের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

শুক্রবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অভিযোগ করে বলেন, বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে কাজ করছেন। দাঙ্গাবাজেরা সরকারি সম্পদে হামলা চালাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বিদেশিদের ‘ভাড়াটে’ হিসেবে কাজ করা কাউকে সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন।

নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাওয়ের হিসাবে, ইরানে গত দুই সপ্তাহে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন