মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন
সৌদি ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে তুরস্ক, তাতে কার কী লাভ
সৌদি আরব এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তানের মধ্যকার একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হতে তুরস্ক চেষ্টা চালাচ্ছে। এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইরানে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন সামরিক জোট গঠিত হতে পারে।
গতকাল শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যকার আলোচনা ‘অগ্রগতির’ পর্যায়ে রয়েছে এবং চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তির বরাতে সংবাদমাধ্যমটি এমন খবর প্রকাশ করেছে।
আঙ্কারা ও রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইসলামাবাদ সুদানের দিকে ঝুঁকছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গতকাল রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ১৫০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি করতে চলেছে।
সৌদি আরব ও তুরস্ক সুদানের সেনাবাহিনীকে সমর্থন করছে। সুদানের সেনাবাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত–সমর্থিত আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
সুদানের আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সেনাবাহিনীর কাছে ১০টি কারাকোরাম-৮ যুদ্ধ বিমান, ২০০টির বেশি ড্রোন এবং অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রি করতে পারে পাকিস্তান। রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।
আঙ্কারা ও রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইসলামাবাদ সুদানের দিকে ঝুঁকছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শুক্রবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ১৫০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি করতে চলেছে।
অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি এয়ার মার্শাল আমির মাসুদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, বিক্রি–সংক্রান্ত চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে। জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানও বিক্রির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরব যদি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তাহলে তা তিন দেশের প্রতিটিকেই অনন্য সুবিধা দেবে।
তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব হলো আরব বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা জি–২০ জোটে প্রতিনিধিত্ব করছে। ইসলাম ধর্মের দুই পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার অবস্থান এখানে। পাকিস্তান হলো মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। আর তুরস্ক হলো সামরিক জোট ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনা সমৃদ্ধ দেশ।
পাকিস্তান ও তুরস্ক—দুই দেশই ক্রমাগত অস্ত্রের বড় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহ করেছে তুরস্ক। একই সঙ্গে দেশটি সিরিয়ার সামরিক খাতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছে। লিবিয়ায়ও তাদের সেনা মোতায়েন রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান তাদের অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টায় নিজেদের সামরিক দক্ষতাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। গত ডিসেম্বর মাসে দেশটি লিবিয়ার জেনারেল খলিফা হাফতারের লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির কাছে ১৬টি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানসহ সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির জন্য ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে।
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান তাদের অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টায় নিজেদের সামরিক দক্ষতাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। গত ডিসেম্বর মাসে দেশটি লিবিয়ার জেনারেল খলিফা হাফতারের লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির কাছে ১৬টি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানসহ সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির লক্ষ্যে ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনা চলছে। চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে এই যুদ্ধবিমানগুলো তৈরি করে।
ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে আলাদা করে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তবে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সবসময় মতৈক্য হতে দেখা যায় না।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আরব বসন্তের পরে হওয়া গণবিক্ষোভগুলোকে সমর্থন দিয়েছিলেন। আর ওইসব বিক্ষোভকে সৌদি আরব তাদের রাজতান্ত্রিক শাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিল।
এক দশক আগে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনী মিলে লিবিয়ায় তুরস্কের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। তারা মিসরের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকেও সমর্থন জানিয়েছিল। অথচ এরদোয়ান এক সময় সিসির সমালোচনা করেছিলেন।
তবে এখন এরদোয়ান ও সিসির মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং লেবানন, সিরিয়া ও ইরানের ওপর বড় আকারে হামলাজনিত উদ্বেগকে কেন্দ্র করে তাঁরা এক হচ্ছেন।
সৌদি আরব এবং তুরস্ক ২০২১ সালের দিকে সম্পর্ক মেরামত করতে শুরু করে। সম্প্রতি তারা সিরিয়ার মতো উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় কৌশলগতভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে এরদোয়ান এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
তুরস্ক ও সৌদি আরব সুদানের গৃহযুদ্ধেও একই পক্ষকে সমর্থন করছে। এখানে সুদানের সেনাবাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত–সমর্থিত আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফের সঙ্গে লড়াই করছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে আরব আমিরাতের সম্পর্কে বেশ টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব ইয়েমেনে আমিরাতের মিত্র হিসেবে পরিচিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) ওপর হামলা চালিয়েছে। সৌদি মদদপুষ্ট বাহিনীগুলো ইয়েমেন থেকে এসটিসি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইয়েমেন থেকে বিতাড়িত করেছে।