ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরুর এক মাসের মধ্যে অন্তত ৯টি দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন হাজারো মানুষ। প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে শত শত কোটি ডলার। গোটা বিশ্বকে দাঁড় করিয়েছে জ্বালানিসংকটের মুখোমুখি। তবে এই যুদ্ধের পরিধি আরও অনেক বেশি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশ কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে এখন পর্যন্ত এসব দেশের কেউই তেহরানের ওপর পাল্টা হামলা চালায়নি।
‘সৌদি আরব চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে,’ বলছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ সাঈদ। তিনি আরও বলেন, ‘যদি সৌদি আরব সামরিকভাবে পাল্টা জবাব দেয়, তবে তারা একা থাকবে না। আর তা পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে।’
যুদ্ধে সৌদি আরবের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সৌদি আরব।
গত রোববার ইসলামাবাদে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর মিত্র দেশটিকে ‘অসাধারণ সংযম’ দেখানোর জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি সৌদি কূটনীতিককে এ-ও আশ্বাস দেন, পাকিস্তান সব সময় সৌদি আরবের ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশে থাকবে’।
এর অর্থ হলো, ইরান যদি সৌদি আরবকে খুব বেশি উসকে দেয়, তবে রিয়াদকে রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তানকেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়াতে হতে পারে।
অবশ্য পাকিস্তানের নেতৃত্ব যে যুদ্ধের জন্য মুখিয়ে আছে, বিষয়টি ঠিক তেমন নয়।
এক বছরের কম সময় আগে বৈরী প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে চার দিনব্যাপী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধে জড়ায় পাকিস্তান। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে আছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
তাই সংঘাত কমানোর জন্য কাজ করতে পাকিস্তানের যথেষ্ট উৎসাহ রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে এ অঞ্চলে ইরানের হাতে গোনা কয়েকটি মিত্রই অবশিষ্ট রয়েছে।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের সিনিয়র রেসিডেন্ট ফেলো কামরান বোখারি বলেন, ‘কৌশলগত দিক থেকে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কই সবচেয়ে কম সমস্যামূলক।’
ইরানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভিন্ন অন্য কোনো বিকল্প এখন না দেখার কথাও বলেন তিনি।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের মতে, বর্তমান সংঘাত কেবল ‘মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ’ ডেকে আনবে। এমন উপলব্ধি থেকেই সংকট সমাধানে আলোচনার জন্য রোববার পাকিস্তানের রাজধানীতে তাঁর সঙ্গে তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন।
ওই আলোচনার পর ইসহাক দার জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে একধরনের শান্তি আলোচনার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
ইসহাক দার বলেন, ‘আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই পাকিস্তানের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে।’ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই এ ধরনের বৈঠক হতে পারে বলেও আভাস দেন তিনি।
রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসহাক দার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে সাম্প্রতিক ফোনালাপের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার আয়োজনে পাকিস্তানের উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন করে চীন।’
মিসরীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের সময় পড়ে গিয়ে কাঁধের হাড়ে চিড় ধরার পরেও মঙ্গলবার আলোচনার জন্য চীনে উড়ে যান পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তবে পাকিস্তানের এই সংকটকালীন কূটনীতি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত সপ্তাহের শেষে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা এই লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। তারা চলমান বৈরিতায় প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও প্রসারিত করেছে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে হাজারো সেনা মোতায়েন করছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযানের আশঙ্কা তৈরি করছে। আর ইরানের ভেতরেও অনেকেই দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিচ্ছেন।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিএনএনের ফ্রেড প্লেইটগেনকে বলেছেন, ‘ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে একটি চরম শিক্ষা না দেওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রতিরোধ থামবে না।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই সোমবার বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের আয়োজিত সাম্প্রতিক কোনো বৈঠকেই ইরান অংশ নেয়নি। তিনি জানান, ওই বৈঠকগুলো এমন একটি কাঠামোতে হয়েছে, যেটিতে ইরান সম্মতি দেয়নি।
ইসমাইল বাগাইয়ের ভাষ্যে, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তান যে বৈঠকগুলো করছে, তা তাদের নিজেদের তৈরি করা কাঠামোর মধ্যেই হচ্ছে এবং আমরা এই কাঠামোতে অংশ নিইনি।’
ওই মুখপাত্রের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদিও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আলোচনার প্রস্তাব পাঠিয়েছে, কিন্তু চলমান হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করাই এখন ইরানের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন ও হামলা যখন তীব্রভাবে চলছে, তখন নিশ্চিতভাবেই আমাদের সব প্রচেষ্টা ও সক্ষমতা নিজেদের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে।’
পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির ও বিপজ্জনক। ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরান উভয়ই নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করতে চাইছে, আবার একই সঙ্গে একে অপরের ওপর প্রচুর প্রাণঘাতী অস্ত্রও ছুড়ছে। তবে এই সংঘাতের যুদ্ধরত পক্ষগুলোও বেশ কয়েকবার সংযমের দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে। তারপরও এই যুদ্ধ যে আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেই ঝুঁকিটিও অত্যন্ত প্রকট।