আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা: আবার যুদ্ধের হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে আবারও যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। গতকাল সোমবার দুই দেশ একে অপরকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তারা যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। দুই দেশের এই মুখোমুখি অবস্থানের ফলে পাকিস্তানে নতুন করে শান্তি আলোচনা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার দ্বিতীয় দফা শুরু হবে। আলোচনায় যোগ দিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের পাকিস্তানে যাওয়ার কথা।
যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে এখন দৃশ্যত ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। এই যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে বিশ্ববাজার টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে।
তবে তেহরান এখন পর্যন্ত এই আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তারা উল্টো অভিযোগ তুলেছে, ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ দিয়ে এবং জাহাজ জব্দ করে ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, বন্দর অবরোধ ও যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন করে ট্রাম্প আলোচনার টেবিলকে আত্মসমর্পণের টেবিলে পরিণত করতে চাইছেন এবং নিজের সুবিধামতো নতুন করে হামলা চালানোর অজুহাত খুঁজছেন।
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার শান্তি আলোচনায় বাঘের গালিবাফ ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘হুমকির মধ্যে আমরা কোনো আলোচনায় বসব না। দুই সপ্তাহ ধরে আমরা রণাঙ্গনে নতুন “চমক” দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ যাওয়ার চেষ্টা করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
এদিকে ট্রাম্পও অভিযোগ করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে ইরান।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর দেশটি গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।
ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কায় গতকাল বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘মার্কিন অবরোধ ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। একটি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না।’ এই চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চাপ দিচ্ছে।
পিবিএস নিউজকে ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় দফার আলোচনায় ইরানের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে আবারও প্রচুর বোমাবর্ষণ শুরু হবে।’
ব্লুমবার্গ নিউজকে ট্রাম্প বলেন, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা ‘খুবই কম’।
তেহরানের স্থানীয় সময় আগামীকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাতেই যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কথা। তবে ব্লুমবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, এর মেয়াদ আরও এক দিন পর, অর্থাৎ ওয়াশিংটন সময় বুধবার সন্ধ্যায় শেষ হবে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা
ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কায় গতকাল বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে।
একই দিন তেহরানের প্রধান বিমানবন্দরগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানকার জীবনযাত্রা আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের ৩০ বছর বয়সী এক চিকিৎসক এএফপিকে বলেন, ‘দেখা যাক মঙ্গলবার কী ঘটে। ৫০ দিনের এই যুদ্ধ কেবল একটি বিষয়ই প্রমাণ করেছে। তা হলো ইরানি জনগণের কথা কেউ ভাবে না।’
৩৯ বছর বয়সী সাগর জানান, সরকার এবং যুদ্ধের প্রভাবে পিষ্ট ইরানিদের জন্য আশার আলো খুব কম। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির অবস্থা ভয়াবহ। মানুষকে অকারণে আটকে রাখা হচ্ছে।’