‘আমাদের অনুমতি ছাড়া কিংবা নির্ধারিত রুটের বাইরে দিয়ে কোনো জাহাজ এই প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে যেকোনো পরিণতির জন্য তারা নিজেরাই দায়ী থাকবে।’ ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে এমন হুঁশিয়ারি দেয়। হরমুজ প্রণালি জ্বালানি তেল পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের জন্য যে সমঝোতা হয়েছে, তার জন্য এই প্রণালি এখন বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কয়েক দিন ধরে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের নজরদারি এড়াতে এখন অনেক জাহাজ প্রণালির দক্ষিণ দিকে ওমান উপকূলের কাছাকাছি রুট ব্যবহার করছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন ইরানকে যে বিষয়টিতে প্রধান ছাড় দিতে হবে তা হলো প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা।
সমঝোতা স্মারকের একটি অস্পষ্ট ধারায় বলা হয়েছে, ইরান ও ওমান যৌথভাবে এই পথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ঠিক করবে। এর মাধ্যমে তেহরান মূলত এই জলপথ পরিচালনার আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব পেয়েছে।
ইরানের জন্য প্রণালিটি খুলে দেওয়ার মানে এই নয় যে তারা এর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে। সমঝোতা স্মারকের একটি অস্পষ্ট ধারায় বলা হয়েছে, ইরান ও ওমান যৌথভাবে এই পথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ঠিক করবে। এর মাধ্যমে তেহরান মূলত এই জলপথ পরিচালনার আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব পেয়েছে। তেহরানের অনুমোদন নেই, এমন কোনো রুটকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে ঘোষণা দিয়েছে আইআরজিসি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত রোববার এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা একই ধরনের ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। এতে উত্তেজনা বাড়বে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ আবার খুলে দিতে দেরি হবে। ‘একই ধরনের ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা’ বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছেন, তা স্পষ্ট করেননি আরাগচি। তবে অনেক জাহাজ এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণ এড়াতে প্রণালির দক্ষিণ দিকে ওমান উপকূল দিয়ে চলাচল করার চেষ্টা করছে।
হরমুজ প্রণালির ২১ মাইল প্রশস্ত জলপথে এখন তিনটি আলাদা রুট তৈরি হয়েছে। এসব রুট দিয়ে জাহাজ পারপার সমন্বয় করতে বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। তিনটি রুটের একটি ওমান উপকূলের পাশ দিয়ে গেছে। দ্বিতীয় রুটটি যুদ্ধ শুরুর আগে ব্যবহার করা হতো, এটি প্রণালির মাঝখান দিয়ে গেছে। আর উত্তরের তৃতীয় রুটটি ইরান নিয়ন্ত্রণ করে। কোন পথটি বেছে নেবেন, তা নিয়ে এখন জাহাজ পরিচালনাকারীরা বিপাকে পড়েছেন।
সমুদ্রপথে চলাচলের ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মারিস্কস’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দিমিত্রিস মানিয়াতিস সিএনএনকে বলেন, ‘এই জলপথে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি বেশ বিভ্রান্তিকর।’ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলেও আখ্যা দেন তিনি।
তবে অনেক জাহাজচালক যে ওমান উপকূলবর্তী রুটটি ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তার প্রমাণও পাওয়া গেছে। সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান‘উইন্ডওয়ার্ডের’ তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার হরমুজ দিয়ে ১৮টি জাহাজ ভেতরে ঢুকেছে এবং ৪৫টি জাহাজ বের হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চল ত্যাগ করা জাহাজগুলোর অর্ধেকের বেশি ওমান উপকূলের কাছের রুটটি ব্যবহার করেছে।
হরমুজ দিয়ে জাহাজ পারাপারে কোন রুটটি ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে অস্পষ্টতা কাটছে না। এতে এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে।
হরমুজ দিয়ে জাহাজ পারাপারে কোন রুটটি ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে অস্পষ্টতা কাটছে না। এতে এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে। জাহাজে পণ্য পরিবহন–সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের মধ্যে যা চুক্তি হয়েছে, সমুদ্রে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ‘এভার লাভলি’ নামের একটি জাহাজে ড্রোন হামলা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) একটি সমন্বিত উদ্ধার অভিযান স্থগিত করেছে। এই অভিযানে পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া পাঁচ শতাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ বের করে আনার কাজ চলছিল। জাহাজগুলোয় ১১ হাজারের বেশি নাবিক রয়েছেন। আইএমও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত এই অভিযান বন্ধ থাকবে।
সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর অন্তত চারটি জাহাজ এই জলপথ থেকে ফিরে গেছে বলে উল্লেখ করেছেন সমুদ্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধের সময় জাহাজের বিমার প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হয়েছিল। বিশাল আকৃতির একেকটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তার জন্য মালিকদের তখন ১০ লাখ ডলারের বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছিল। বর্তমানে এমন হামলার ঘটনা কমে এলেও প্রিমিয়ামের উচ্চ হার কমেনি।
বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনের তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইট সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা এখনো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যেই আছি। হরমুজ প্রণালি যে নিশ্চিতভাবে খুলে দেওয়া হবে, তেমন কোনো নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতভেদ দূর না হলে রুট তিনটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এতে জাহাজ চলাচল আরও অনিরাপদ হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।
এত সব বিভ্রান্তির মধ্যেও সমুদ্রপথে ঝুঁকি মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা আশা দেখছে। তারা বলছে, কয়েক মাসের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে জাহাজগুলো শেষ পর্যন্ত এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রা শুরু করেছে। যদিও একই সঙ্গে একাধিক রুটের মধ্য থেকে একটি বেছে নেওয়া এবং অনেক বেশি খরচ বহন করার মতো চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে তাদের নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তবে ওই একই প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করেছে যে আলোচনার টেবিলে নেতাদের মধ্যে যা চুক্তি হয়েছিল এবং প্রণালিতে আসলে যা ঘটছে তার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এখন অপেক্ষা করছে। তারা দেখতে চায়, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই কিছুদিন জাহাজ নিরাপদে এই পথ অতিক্রম করে কি না। এরপরই তারা তাদের জাহাজ আবার যাত্রার অনুমতি দেবে।
বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইট বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড অবিশ্বাস কাজ করছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই সমঝোতা স্মারক অবশ্যই ভালো একটি প্রথম পদক্ষেপ। তবে দুই দেশ যা বলছে, তার মধ্যে স্পষ্টতই একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন খুবই বিশৃঙ্খল একটি সময় পার করছি।’