যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি স্বাক্ষরের পরও যে কারণে শঙ্কা

ভার্সাই প্রাসাদে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ওই মুহূর্তের ভিডিও পোস্ট করেন। ১৭ জুন, ২০২৬ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন দুই দেশের প্রেসিডেন্ট। ১৪ দফা সমঝোতার এই স্মারককে ‘অন্তর্বর্তী চুক্তি’ বলা হচ্ছে। এখন চূড়ান্ত একটি চুক্তির জন্য সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আলোচনায় বসবেন ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিরা। আলোচনা চলার কথা ৬০ দিন পর্যন্ত। যদিও শান্তির দেখা শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ সময় গত বুধবার গভীর রাতে সই হওয়া এই স্মারককে ‘ঐতিহাসিক’ বলেছে ইরান। দেশটি ইতিবাচক থাকলেও শঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিক দিয়ে। স্মারকে সই করার পরই হুমকি আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে। সমঝোতার শর্ত মেনে না চললে ইরানে হামলা করা হবে বলে জানান তিনি। আর সমঝোতা স্মারকের বিপরীতে গিয়ে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

শঙ্কা থাকলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সবচেয়ে বড় ঘটনা। যুদ্ধে সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এর ধাক্কা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের ওপর পড়েছে।

যদিও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি ভালো হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সমঝোতা অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু জাহাজ পারাপারের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের পতাকাবাহী একটি জাহাজ রয়েছে। ইরানের ১১টি জাহাজও দেশটির বন্দর ছেড়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়েছে। এদিন তেলের দামও প্রতি ব্যারেলে কমে ৭৯ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে চুক্তি টেকসই করার বড় দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বলে মনে করেন তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তাফা কোসচেশম। তাঁর শঙ্কাও ইসরায়েলকে নিয়ে। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, লেবাননে যদি ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে ইরান চুক্তি থেকে সরে যেতে পারে। ইসরায়েলকে সামলে রাখার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই পড়ে।

লেবানন-ইসরায়েল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যে ২১ এপ্রিল দক্ষিণ লেবাননের মানসৌরি গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি বাড়ির সামনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি পড়ে আছে
ছবি: রয়টার্স

‘সমঝোতা সহজ ছিল না’

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। লক্ষ্য হিসেবে কখনো ইরানের সরকার পতন, কখনো দেশটির পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস—এমনকি ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ কথাও বলেছেন দুই দেশের নেতারা। তবে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরুর আগপর্যন্ত প্রায় ছয় সপ্তাহ হামলা চালিয়ে সেসব লক্ষ্যের একটিও অর্জন করতে পারেননি তাঁরা।

এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যে চুক্তিতে পৌঁছেছে, তাতেও ট্রাম্পের অর্জন খুব কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন সমঝোতা স্মারকে ইরানের সরকার পরিবর্তনের প্রসঙ্গ নেই। ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে নিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। তেহরান এ বিষয়টি চুক্তিতে যুক্ত করতে রাজি হয়নি। হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ও চুক্তিতে আসেনি।

উল্টো এই সমঝোতা থেকে ইরান যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় কিছু সুবিধা করে নিতে পেরেছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। বিদেশে জব্দ থাকা শত শত কোটি ডলারের অর্থ ছাড় পেতে চলেছে ইরান। যুদ্ধ–পরবর্তী ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাচ্ছে দেশটি। অবাক করা বিষয় হলো, স্মারকে সইয়ের পর ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র না থাকা ‘কিছুটা অন্যায্য’।

সব মিলিয়ে এই সমঝোতা স্মারকে সই করা ‘সহজ ছিল না’ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর এ কথা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে বুধবার স্মারকে সই করার সময়ের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার চুক্তি এই প্রাসাদেই হয়েছিল। স্মারকে সইয়ের পর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আবার বলেন, ‘ইরান যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে, তাহলে আমরা ভয়াবহ বোমা হামলা চালাব।’

আজ আলোচনা শুরু

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার কথা ছিল আজ শুক্রবার। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। তবে কোনো আভাস না দিয়ে এক দিন আগে বুধবার স্মারকে সই করা হয়। ফ্রান্স থেকে ভার্চ্যুয়ালি স্মারকে সই করেন ট্রাম্প। আর তেহরান থেকে সই করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

পরে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘের গালিবাফ জানিয়ে দেন, শুক্রবার জেনেভায় সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে না। তবে এদিন সুইজারল্যান্ডে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়েছে দেশটি। এ আলোচনা হবে পর্বতের শীর্ষে অবস্থিত একটি প্রমোদকেন্দ্রে। সেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান, কাতারসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা থাকবেন।

এই আলোচনা চলবে ৬০ দিন। সেখানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও জব্দ করা অর্থ ছাড় নিয়ে আলোচনা হবে। তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ২০১৫ সালে চুক্তি করতে প্রায় দুই বছর লেগেছিল। তাই এবারের আলোচনার ৬০ দিনের সময়সীমা নিয়ে ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকেরা। তাঁর ভাষ্য, ইরান যত দিন ঠিকঠাক ‘আচরণ’ করবে, এই সময়সীমা নিয়ে তিনি ভাববেন না।

ওমানের মুসান্দাম থেকে দেখা হরমুজ প্রণালির জাহাজ, ১৫ জুন ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

সমস্যা যখন ইসরায়েল

সমঝোতা স্মারকে ট্রাম্প বড় গুরুত্ব দিয়েছেন হরমুজ প্রণালি চালুর ওপর। সে অনুযায়ী স্মারকে সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ কোনো টোল ছাড়াই ৬০ দিনের জন্য খুলে দেবে ইরান। আর ইরানের বন্দরের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে তেহরান যে বিষয়টি নিয়ে বারবার সতর্ক করছে, তা হলো লেবাননে ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে হবে।

এ নিয়ে ঘোরতর আপত্তি রয়েছে ইসরায়েলের। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ট্রাম্প যেমন নভেম্বরের আগেই যুদ্ধ শেষ করতে চেয়েছেন, তেমনই অক্টোবরে ইসরায়েলের সম্ভাব্য নির্বাচনের কথা ভেবে লেবাননে হামলা চালিয়ে যেতে চান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ইসরায়েলি লেবাননে হামলা বন্ধ চান না।

লেবাননে হামলার কারণে নেতানিয়াহুর ওপর চটেছেন ট্রাম্পও। সম্প্রতি তাঁকে ‘পাগল’ বলেছেন। তবে সেসবের তোয়াক্কা না করে গতকালও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া লেবাননের দক্ষিণে দখল করা অঞ্চলগুলো ছাড়বে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী সরকারের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকিল বলেছেন, ‘আমি মনে করি না যে আমরা (লেবানন থেকে) সেনা প্রত্যাহার করব। আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে না করে দিতে হয়।’

‘ইরান স্বাধীনতা বিক্রি করেনি’

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো চুক্তিতে সই করলেন। বিপ্লব–পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক সব সময়ই ছিল অবিশ্বাসে ঘেরা। হয়তো এ কারণেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা হওয়া বিষয়গুলো মেনে চলছে কি না, তা ইরান কঠোরভাবে নজরদারি করবে।

ইরানের গণমাধ্যমে গালিবাফের ভাষ্য, ওয়াশিংটন যদি নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তেহরানও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে না। এ ছাড়া লেবাননে হামলা না চালাতে ইসরায়েলকে বাধ্য করাও যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্য হলো—সমঝোতা স্মারক এটাই দেখিয়েছে যে ইরান কোনো ‘হুমকি বা চাপের কাছে নিজেদের মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিক্রি করেনি’।

আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের শিক্ষক রামি খুরি আল–জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন, ইসরায়েলের অতিরিক্ত সামরিক আগ্রহের কারণে তিনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে এখন বুঝতে পেরেছেন যে এটি ভুল ছিল। তাই সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে, ইসরায়েলকেও নিয়ন্ত্রণে আনবে। তবে তা এত দ্রুত ঘটবে না।

আরও পড়ুন