আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে রকেট দিয়ে মাইন পাতছে ইরান—এটা কি সম্ভব
দীর্ঘ এক মাসের শান্তিপূর্ণ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে গত রোববার ইরানে আবার হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত লারাক দ্বীপে দেশটির রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান যাতে হরমুজ প্রণালিতে রকেটের মাধ্যমে মাইন বসাতে না পারে, সে জন্যই এ হামলা চালানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এ হামলাকে মাইন স্থাপনে নিযুক্ত ইরানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘সীমিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযান’ বলে উল্লেখ করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) সামুদ্রিক মাইন বহনকারী রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিতে দেখেছে।
সাধারণত বিশেষ ধরনের যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন কিংবা উড়োজাহাজ ব্যবহার করে সাগরে মাইন পাতা হয়। এগুলো সাগরের একদম তলদেশে ফেলে রাখা যায়, আবার পানির নিচে কিছুটা ওপরেও ভাসিয়ে রাখা যায়। মাইনগুলো এমনভাবে তৈরি, যা পাশ দিয়ে কোনো জাহাজ যাওয়ার সময় তার ইঞ্জিনের কাঁপুনি বা চৌম্বকীয় সংকেত টের পেয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরিত হয়।
এদিকে ইরানের নেতারা এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে আগ্রাসী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার পর বসে থাকেনি ইরানও। প্রতিশোধ হিসেবে আইআরজিসি জর্ডানে দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে জানায়।
আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তাদের সদস্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, এতে অন্তত দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী আসলেই কি রকেটের মাধ্যমে সমুদ্রে মাইন পাতা সম্ভব, উঠেছে এমন প্রশ্ন। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে—
রকেটের সাহায্যে সামুদ্রিক মাইন স্থাপনের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের দাবিকে অযৌক্তিক বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান।
মার্কিন গোয়েন্দারা হয়তো গোপনে খবর পেয়েছেন যে ইরান যুদ্ধজাহাজ থেকে উৎক্ষেপণব্যবস্থার মাধ্যমে সমুদ্রে নতুন মাইন স্থাপনে প্রস্তুত। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে এ হুমকিকে ছোট করে দেখাতে তাঁরা রকেটের গল্প সাজিয়েছে।হারলান উলম্যান, মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা
উলম্যানের ধারণা, মার্কিন গোয়েন্দারা হয়তো গোপনে খবর পেয়েছেন যে ইরান যুদ্ধজাহাজ থেকে উৎক্ষেপণব্যবস্থার মাধ্যমে সমুদ্রে নতুন মাইন স্থাপনে প্রস্তুত। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে এ হুমকিকে ছোট করে দেখাতে তাঁরা রকেটের গল্প সাজিয়েছে।
উলম্যান বলেন, রকেট যখন তীব্রগতিতে এসে পানিতে আছড়ে পড়বে, সেই ধাক্কাতেই মাইন বিস্ফোরিত বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সাগরে মাইন পাতার জন্য ইরানের কাছে অনেক ভালো উপায় ও প্রযুক্তি আছে। তারা কেন এত ঝুঁকি নিয়ে রকেট ব্যবহার করতে যাবে? পুরো বিষয়টি তাঁর কাছে একেবারেই অদ্ভুত মনে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে ইরান নিজেই এর আগে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সমুদ্রে মাইন স্থাপনের সক্ষমতার কথা প্রচার করেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, নৌ মহড়ার সময় আইআরজিসি ফজর-৫ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম ব্যবহার করে মাইন স্থাপন করছে।
সাধারণত কীভাবে সমুদ্রে মাইন স্থাপন করা হয়
সাধারণত বিশেষ ধরনের যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন কিংবা উড়োজাহাজ ব্যবহার করে সাগরে মাইন পাতা হয়। এগুলো সাগরের একদম তলদেশে ফেলে রাখা যায়, আবার পানির নিচে কিছুটা ওপরেও ভাসিয়ে রাখা যায়। মাইনগুলো এমনভাবে তৈরি, যা পাশ দিয়ে কোনো জাহাজ যাওয়ার সময় তার ইঞ্জিনের কাঁপুনি বা চৌম্বকীয় সংকেত টের পেয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরিত হয়।
ধারণা করা হয়, হরমুজ প্রণালিতে বেশ কিছু বিস্ফোরক ফেলার জন্য ইরান ছোট ও দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করেছে। এ জাহাজগুলো সাগরে মাইন ফেলে খুব দ্রুত ওই এলাকা থেকে সরে যায়। তবে মার্কিন বাহিনী ইরানের এমন কয়েকটি দ্রুতগতির নৌযানে ইতিমধ্যে হামলা চালিয়েছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, সেন্টকম হরমুজ প্রণালিতে মাইন সরানোর কাজ শেষ করেছে। প্রণালিটি মাইনমুক্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। নতুন করে মাইন পাততে যেসব জাহাজ বা নৌযান ব্যবহার করা হবে, সেগুলো ধ্বংস করা হবে বলে ইরানকে সতর্ক করেন ট্রাম্প।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালিকে নিরাপদ করতে সেন্টকমকে অত্যন্ত ধীরগতির একটি অভিযান চালাতে হবে। প্রতিটি মাইন খুঁজে বের করে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করতে হবে।
সে সময় বিশ্লেষকেরা ইরানের কৌশলটিকে ‘অভিনব’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা উদ্বেগও প্রকাশ করেন। কারণ, এ পদ্ধতিতে একবার রকেট ছুড়েই আইআরজিসি সমুদ্রের বিশাল এলাকায় হাজার হাজার মাইন ছড়িয়ে দিতে পারে।
মার্কিন নৌবাহিনী সাধারণত মাইন অপসারণের কাজে অ্যাভেঞ্জার শ্রেণির মাইনবিধ্বংসী জাহাজ ব্যবহার করে। এগুলো তৈরিতে এমন কিছু উপাদান ব্যবহার করা হয়, যাতে এর ভেতরের চৌম্বকীয় কম্পন বা ইঞ্জিনের কাঁপুনি সাগরের পানিতে খুব একটা ছড়ায় না। ফলে সাগরের নিচে লুকিয়ে থাকা মাইন এ জাহাজের উপস্থিতি সহজে টের পায় না এবং এটি বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকিও অনেক কম থাকে।
ইরানের ফজর-৫ রকেটব্যবস্থা সম্পর্কে কী জানা যায়
কম খরচে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কৌশল বা অসম যুদ্ধপদ্ধতি ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ পরিচিত ইরান।
গত বছরের জানুয়ারিতে ইরানের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, নৌ মহড়ার সময় আইআরজিসি সাগরে মাইন পাতার সম্পূর্ণ নতুন একটি কৌশল প্রদর্শন করেছে। এ কৌশলে স্থলভাগ থেকে ফজর-৫ রকেটব্যবস্থা ব্যবহার করে সরাসরি সাগরে মাইন স্থাপন করে তারা।
সে সময় বিশ্লেষকেরা কৌশলটিকে ‘অভিনব’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা উদ্বেগও প্রকাশ করেন। কারণ, এ পদ্ধতিতে একবার রকেট ছুড়েই আইআরজিসি সমুদ্রের বিশাল এলাকায় হাজার হাজার মাইন ছড়িয়ে দিতে পারে।
১৯৯০-এর দশকে প্রথম তৈরি করা এ ফজর-৫ হলো ৩৩৩ মিলিমিটার ব্যাসের মাঝারি পাল্লার একটি রকেটব্যবস্থা। এটি সাধারণত দূরপাল্লার কামানের মতো রকেট ছোড়ার কাজে ব্যবহার করা হয়।
এ রকেটব্যবস্থার মূল সুবিধা হলো, এটি একটি চলন্ত ট্রাকের ওপর বসানো থাকে। ট্রাকে থাকা উৎক্ষেপণ যন্ত্র থেকে একনাগাড়ে সর্বোচ্চ চারটি রকেট ছোড়া যায়। প্রতিটি রকেটে প্রায় ১৭৫ কেজি ওজনের প্রচণ্ড ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক থাকে। রকেটটি যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন এর ভেতরের অংশগুলো দ্রুতগতির অসংখ্য ধারালো ধাতব টুকরায় পরিণত হয়ে চারপাশের একাধিক লক্ষ্যবস্তুকে একসঙ্গে ঝাঁঝরা করে দিতে পারে।
ফজর-৫-এর পাল্লা প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। ইরানি বাহিনী মূলত বিমানঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনায় হামলার জন্য এটি ব্যবহার করেছে।
৭৫ কিলোমিটার পাল্লা থাকায় স্থলভাগ থেকে ব্যবহার করা হলেও ফজর-৫ রকেট দিয়ে খুব সহজেই পুরো হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় মাইন ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
পরে ইরান এ প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন ঘটিয়েছে। ফজর-৫সি-এর মতো নতুন সংস্করণগুলোতে আরও আধুনিক ও জিপিএসভিত্তিক নির্ভুল নেভিগেশনব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এ উন্নত রকেটগুলো এখন আগের চেয়ে দূরে—প্রায় ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ফজর-৫ দিয়ে কীভাবে মাইন পাতা হতে পারে
ফজর-৫ বা অন্য কোনো রকেটব্যবস্থা দিয়ে ইরান বর্তমানে সমুদ্রে মাইন ছড়াচ্ছে কি না, তা দেশটি নিশ্চিত করেনি।
তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, রকেটের মাথায় যেখানে সাধারণত বিস্ফোরক বা বোমা থাকে, সেই জায়গাটিতে বিস্ফোরকের বদলে সাগরে পাতার মাইন রেখে দেওয়া সম্ভব। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আইআরজিসির নৌ মহড়ায় ঠিক এমন একটি পদ্ধতিই দেখানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
এ ব্যবস্থায় প্রথমে সমুদ্রের উপকূলীয় স্থলভাগ থেকে ট্রাকে বসানো উৎক্ষেপণ যন্ত্র ব্যবহার করে রকেটটি ছোড়া হয়। এরপর মাইনবাহী রকেটটি সমুদ্রসীমার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে। রকেটটি যখন নির্ধারিত সমুদ্র এলাকার আকাশে পৌঁছাবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আকাশেই রকেটের ওপরের খোলস বা আবরণ খুলে যাবে।
রকেটের ভেতরের অবিস্ফোরিত মাইনগুলো তখন আকাশ থেকে সরাসরি সমুদ্রের পানির দিকে পড়তে থাকবে। পানিতে পড়ার সময় মাইনগুলো যাতে তীব্র বেগে আছাড় খেয়ে নিজে নিজেই বিস্ফোরিত না হয়, সে জন্য প্রতিটি মাইনের সঙ্গে ছোট প্যারাসুট বা গতি কমানোর অন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা যুক্ত থাকে। ফলে মাইনগুলো বেশ আলতোভাবে পানিতে গিয়ে পড়ে।
সাগরের পানিতে পড়ার পর মাইনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমুদ্রের একদম তলদেশে ডুবে যেতে পারে অথবা পানির নিচে নির্দিষ্ট গভীরতায় ভেসে থাকতে পারে।