বিক্ষোভকারীদের তিন দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ ইরানের, গ্রেপ্তার ‘দাঙ্গাবাজদের’ শাস্তি দেওয়া শুরু

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শিক্ষার্থীদের এক বৈঠকে বক্তৃতা করছিলেন। ৩ নভেম্বর ২০২৫, তেহরানছবি: এএফপি

ইরানজুড়ে চলা বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার ‘দাঙ্গাবাজদের’ কঠোর শাস্তির অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা। যাঁরা প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মসমর্পণের জন্য তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সোমবার ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মহসেনি-এজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে বিচার বিভাগের মূল কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। যদি আমরা অকারণে কাউকে দয়া দেখাই যিনি দয়া পাওয়ার যোগ্য নন, তবে তা হবে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হবে।’

বিক্ষোভের পর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্ট প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠকের পর এই তিন নেতা শাস্তির বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেন। এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা জানান, ‘খুনি ও সন্ত্রাসী উসকানিদাতাদের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যাঁরা বিদেশি শক্তির মাধ্যমে ‘প্ররোচিত’ হয়ে বিক্ষোভে নেমেছিলেন, তাঁদের প্রতি ‘ইসলামি সহানুভূতি’ দেখানো হতে পারে।

ইরান সরকার এই বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল রয়েছে বলে শুরু থেকেই বলে আসছে। গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি স্বীকার করেছেন, বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে সরকার দাবি করছে, এই মৃত্যুর জন্য বিদেশি মদদপুষ্ট এজেন্টরা দায়ী, সরকারি বাহিনী নয়।

গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এ আন্দোলনে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, তেহরান থেকে এক ‘সন্ত্রাসী দলের’ সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ইরানে ঢুকেছিল। এ ছাড়া কেরমান, ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহর থেকেও ‘দাঙ্গাবাজ নেতাদের’ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশপ্রধান আহমাদরেজা রাদান বলেছেন, যাঁরা প্ররোচনার শিকার হয়ে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মসমর্পণের জন্য তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অনেকের মুখ ঝাপসা করে তাঁদের ‘স্বীকারোক্তি’ প্রচার করা হয়েছে, যেখানে তাঁরা সহিংসতা ও লুটের কথা স্বীকার করেছেন।

বিক্ষোভের সময় সড়কে একটি গাড়ি জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ইরানের রাজধানী তেহরানে, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

যাঁরা বিক্ষোভকে সমর্থন করেছেন, তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে বিক্ষোভের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রসিকিউটর জেনারেলের প্রধান মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ বলেছেন, আইন অনুযায়ী যাঁরা বিক্ষোভকে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁদের থেকেই দাঙ্গার ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।

ইতিমধ্যেই এক বড় ব্যবসায়ীর সব সম্পদ সরকার জব্দ করেছে। এর মধ্যে মধ্যে নামী ক্যাফে ও খাদ্যপণ্য তৈরির ব্র্যান্ড রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক জনপ্রিয় ফুটবলার ভোরিয়া ঘাফৌরির ক্যাফেও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের প্রতিক্রিয়া

বিক্ষোভের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের সরকারি প্রতিষ্ঠান দখল করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি খামেনির ৩৭ বছরের শাসনের অবসান হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন। জবাবে ইরানের ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন ও মূর্খামি’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতার অবমাননা করার অর্থ রেড লাইন বা চরম সীমা অতিক্রম করা, যার ফলাফল হবে ভয়াবহ।

আরও পড়ুন

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট

ইরানে ইন্টারনেটের ওপর কড়া বিধিনিষেধ এখনো জারি রয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সপ্তাহের শেষ দিকে ধীরে ধীরে ইন্টারনেট খুলে দেওয়া হবে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরকার আসলে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালুর পরীক্ষা চালাচ্ছে।

এরই মধ্যে ‘ইরানসেল’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে পরিবর্তন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ৮ জানুয়ারি যখন দেশজুড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তখন কোম্পানির কিছু অপারেটর তা মানতে দেরি করেছিল। এ ছাড়া বিক্ষোভ নিয়ে খবর প্রকাশের দায়ে একটি সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি টেলিভিশনের স্যাটেলাইট সম্প্রচারেও অজ্ঞাত উৎস থেকে বিঘ্ন ঘটানো হয়েছে।

আরও পড়ুন