হুতিদের ভান্ডারে কতটা ভয়ংকর অস্ত্র আছে, কোথা থেকে আসছে, সৌদি আরব কেন হামলা ঠেকাতে পারছে না

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দিনটি ছিল শনিবার, ঘড়িতে বেলা ৩টা গড়িয়ে গেছে। সৌদি আরবের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনালে তখন দারুণ ব্যস্ততা। বিমানবন্দরের এই দুটি টার্মিনাল অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য ব্যবহৃত হয়।

সেদিন লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বহু মানুষ ইমিগ্রেশন পার হচ্ছিলেন। যাত্রীদের বেশির ভাগের পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তাঁরা ওমরাহ যাত্রী। সময় তখন আনুমানিক সোয়া তিনটা, হঠাৎ একটি তীব্র আলোর ঝলকানি, তারপর বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

১০ অক্টোবর সৌদি আরবের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময়ে সিসিটিভি ফুটেজে এসব দৃশ্য ধরা পড়ে।

নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে সৌদি আরবের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হামলার চিত্র। ১০ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: সৌদি তথ্য মন্ত্রণালয়/রয়টার্স

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীরা ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে। হামলায় ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।

হুতিদের এই হামলা শুধু সৌদি আরব নয়; বরং সারা বিশ্বের জন্য একটি বিশাল ধাক্কা হয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্য বহু বছর ধরেই অশান্ত; কিন্তু সৌদি আরব এত দিন সেই অশান্তিকে নিজ দেশের সীমানা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে অনেকটাই সফল হয়েছিল।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তিল তিল করে বিশ্বের সামনে নিজের দেশকে বিনিয়োগ ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে কাজ করে যাচ্ছেন। বড় বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজক দেশ হিসেবেও সৌদি আরব নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছিল।

জায়দি সম্প্রদায় বৈষম্যের শিকার—গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এমন অভিযোগ তুলে হুতিরা প্রথম প্রতিরোধে নামে। জায়দিদের বেশির ভাগই ইয়েমেনের দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে।

কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটিতে হুতিদের একের পর এক হামলা সৌদি আরবের উজ্জ্বল–শান্ত ভাবমূর্তি একঝটকায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

মাত্র কয়েক দশক আগে তৈরি হওয়া একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কীভাবে এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠল এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হলো, সেই আলোচনা করা যাক।

হুতি কারা

হুতিরা ইয়েমেনের জায়দি সম্প্রদায়ভুক্ত। জায়দিরা শিয়াদের একটি শাখা। ইয়েমেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুন্নি। জায়দিরা সংখ্যালঘু।

জায়দি সম্প্রদায় বৈষম্যের শিকার—গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এমন অভিযোগ তুলে হুতিরা প্রথম প্রতিরোধে নামে। জায়দিদের বেশির ভাগই ইয়েমেনের দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে।

হুতিদের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা এক দিনে তৈরি হয়নি। ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর তারা অস্ত্রের বড় একটি ভান্ডার হাতে পায়
ফাইল ছবি: রয়টার্স

হুতিরা শুরুতে ‘আনসার আল্লাহ’ নামে পরিচিত ছিল। এর অর্থ ‘আল্লাহর সমর্থক’। তাদের প্রয়াত ধর্মীয় নেতা বদরেদ্দিন আল-হুতির নামানুসারে পরে এই সংগঠনের নামকরণ হয়। তাঁর ছেলে হুসেইনও এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত হন।

বদরেদ্দিনের আরেক ছেলে আবদুলমালিক পরে সংগঠনের নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন। জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন একটি গোষ্ঠী তাঁর নেতৃত্বে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে।

হুতিদের বড় ধরনের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। ওই বছর তারা ঝড়ের গতিতে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়। এরপর ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হন। ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়।

হুতিদের ড্রোনের ভান্ডারও বেশ সমৃদ্ধ। তাদের হাতে আছে ‘ওয়ায়েদ-১’ ও ‘ওয়ায়েদ-২’ নামের ড্রোন। এগুলো ইরানের ‘শাহেদ-১৩১’ ও ‘শাহেদ-১৩৬’ একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনের স্থানীয় সংস্করণ।

২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশ এখনো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে।

বর্তমানে হুতিদের হাজার হাজার যোদ্ধা রয়েছেন। ইয়েমেনের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় লড়াইয়ের জন্য তাঁরা প্রশিক্ষিত। দীর্ঘদিনের যুদ্ধেও তাঁরা অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে।

ইয়েমেনের জনসংখ্যার বড় অংশ যেসব এলাকায় বসবাস করে, হুতিরা সেসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

হুতিদের শক্তির উৎস কোথায়

হুতিরা তেহরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’র অংশ। এই অক্ষে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের ইরানের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে দেখে আসছে। তাদের অভিযোগ, তেহরান হুতিদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করে। ইরান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ‘চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে মানে না। তবে বছরের পর বছর ধরে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলের একের পর এক হামলায় হামাস এবং হিজবুল্লাহর শক্তি অনেকটাই কমে গেছে। এই সময়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে হুতিরা দৃশ্যপটে চলে আসে।

হেলিকপ্টার নিয়ে লোহিত সাগরে একটি জাহাজের পিছু নিয়েছে হুতিরা
ফাইল ছবি: রয়টার্স

২০২৪ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, এসব জাহাজের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক রয়েছে। গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালানোর কথা জানায়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বছরের পর বছর হুতিদের সামরিক শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছে। একটি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হুতিরা নিজেদের সক্ষমতা অনেকটাই বাড়িয়েছে।
...ফারেয়া আল-মুসলিমি, চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ

এ বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরু করলে মার্চে তেহরানের পক্ষে হুতিরা ইরান যুদ্ধে যোগ দেয়।

তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। তবে এসব হামলায় ইসরায়েলের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

পুরোনো শত্রুর সঙ্গে নতুন লড়াই

২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব। তারা দেশটির সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দেয়।

২০২২ সালে ইয়েমেনে সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তারপর থেকে চলতি বছর পর্যন্ত মোটামুটি ওই যুদ্ধবিরতি বজায় ছিল।

বর্তমানে হুতিদের হাজার হাজার যোদ্ধা রয়েছেন। ইয়েমেনের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় লড়াইয়ের জন্য তারা প্রশিক্ষিত
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে। এ যুদ্ধের প্রভাব ইয়েমেনেও ছড়িয়ে পড়ে। দেশটিতে নতুন করে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুতিদের বড় ধরনের লড়াই শুরু হয়। হুতিরা সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে বাব আল–মানদেব প্রণালিসহ লোহিত সাগর উপকূলের একটি বড় অংশের দখল নেয়।

হুতিদের এই আগ্রাসনে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়ে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক–পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হতো।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল–মানদেব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হয়ে ওঠে। প্রণালিটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের প্রবেশপথ। ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

হুতিরা সেটির দখল নেওয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব ভীষণ বিপদে পড়ে গেছে। হুতিরা সৌদি আরবের জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো শুরু করে।

হুতিদের দমন করতে সৌদি আরব সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের প্রস্তাবিত অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল, হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় অর্জিত সাফল্য উল্টে দেওয়া।

কিন্তু হুতিরা সৌদি আরবের এই পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত সফল হতে দেয়নি। বরং তারা হামলার জবাব হামলা দিয়ে দেওয়া শুরু করে। গত জুলাইয়ে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ করেছিল সৌদি আরব। হুতিদের একটি প্রতিনিধিদল যাতে সেখানে নামতে না পারে, সে জন্য ওই হামলা চালানো হয়েছিল। তারপর থেকে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।

হুতিরা শুধু রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে অন্তত ২০ বার হামলা চালিয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। যদিও বেশির ভাগ হামলাই দেশ রুখে দিয়েছে; কিন্তু সব হামলা রুখে দেওয়া সম্ভব হয়নি। আর এখানে এগিয়ে গেছে হুতিরা।

ইয়েমেনের হুতিদের হাতে এখন নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়ে তারা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে।

হুতিদের হাতে কী কী অস্ত্র

হুতিদের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা এক দিনে তৈরি হয়নি। ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর তারা অস্ত্রের বড় একটি ভান্ডার হাতে পায়। পরে ইরানের কাছ থেকে পাওয়া প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ এবং নিজেদের তৈরি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের অস্ত্রভান্ডার আরও শক্তিশালী হয়েছে।

হুতিদের হাতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। আছে নানা ধরনের ড্রোন। এসব ড্রোন আকাশপথে ও সমুদ্রপথে ব্যবহার করা যায়।

হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক কুচকাওয়াজ
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনের সরকারি অস্ত্রভান্ডারে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ হাতে পাওয়ার বাইরে হুতিরা চোরাচালানের মাধ্যমে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে। আবার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চোরাই পথে ইয়েমেনে এনে সেগুলো দিয়েও অস্ত্র তৈরি করা হয়েছে।

জেনস নামের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অস্ত্র বিশ্লেষক নিরঞ্জন বিএস–এর মতে, এসব যন্ত্রাংশ মূলত আরব সাগর হয়ে ইয়েমেনে ঢুকেছে।

হুতিদের হাতে মাঝারি পাল্লার বিভিন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এগুলোর কয়েকটি ইরানি মডেল থেকে তৈরি। এর মধ্যে রয়েছে ‘খাইবার শেখান’।

হুতিদের হাতে স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও আছে। ‘আসেফ’ এ ধরনের একটি ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইরানের ‘খালিজ ফার্স’ শ্রেণির জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি।

হুতিদের হাতে ‘কুদস’ পরিবারের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। ‘কুদস-৪’ সংস্করণের পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়।

হুতিদের ড্রোনের ভান্ডারও বেশ সমৃদ্ধ। তাদের হাতে আছে ‘ওয়ায়েদ-১’ ও ‘ওয়ায়েদ-২’ নামের ড্রোন। এগুলো ইরানের ‘শাহেদ-১৩১’ ও ‘শাহেদ-১৩৬’ একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনের স্থানীয় সংস্করণ।

হুতিদের হাতে ‘প্যালেস্টাইন-২’ ও ‘তুফান’ নামের দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র আছে। ‘প্যালেস্টাইন-২’ দুই ধাপে কাজ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। এটির হাইপারসনিক সক্ষমতা রয়েছে বলেও ধারণা করা হয়।

‘তুফান’ ক্ষেপণাস্ত্রকে ইরানের ‘ঘাদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন নামে পরিচিত সংস্করণ বলে মনে করা হয়। এর পাল্লা ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ কিলোমিটার।

এ ছাড়া হুতিদের হাতে ‘বুরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। এগুলো ইরানি উৎস থেকে পাওয়া বলে ধারণা করা হয়ে থাকে।

অস্ত্র আসছে কোথা থেকে, কারা দিচ্ছে সহায়তা

হুতিদের অস্ত্র কর্মসূচিতে ইরানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান হুতিদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা দিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে।

ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। পরে সেগুলো চোরাই পথে ইয়েমেনে নেওয়া হয়। ছোট নৌকা, কনটেইনারবাহী জাহাজ কিংবা ওমান-ইয়েমেন সীমান্ত দিয়ে এসব যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়। পরে ইয়েমেনে সেগুলো জোড়া লাগানো হয়।

হুতিদের অস্ত্র তৈরির জন্য চীন থেকেও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আসছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে।

কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ বা সিএআরের অনুসন্ধানে হুতিদের অস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তাকারী বিদেশি সরবরাহকারীদের একটি বড় নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের তথ্যেও দেখা গেছে, হুতিদের জন্য পাঠানো যেসব পণ্য জব্দ হয়েছে, সেগুলোর সবচেয়ে বড় উৎস চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।

সম্প্রতি ইয়েমেন কর্তৃপক্ষ হুতিদের দুটি চালান জব্দ করেছে। এসব চালানে অন্য পণ্যের আড়ালে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম নেওয়া হচ্ছিল।

জব্দ করা সরঞ্জামের মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন ও মূল কাঠামো তৈরির বিশেষ ধাতব যন্ত্রাংশ। ছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ভারসাম্য ধরে রাখার পাখাও।

তদন্তকারীরা এসব চালানে ইরানের ‘খাইবার শেখান’ ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত রকেট ইঞ্জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত যন্ত্রাংশ শনাক্ত করেছেন।

ছিল ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সরঞ্জাম, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল। এর মধ্যে বিশেষ তাপরোধী উপাদানও ছিল। উড্ডয়নের সময় প্রচণ্ড তাপ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু অংশ রক্ষা করতে এটি ব্যবহার করা হয়।

চালানের নথিতে চীনের একটি সূক্ষ্ম ধাতব যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নামও ছিল। প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে মহাকাশযানের বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক হিসেবে পরিচয় দেয়। গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।

কিছু যন্ত্রাংশ বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করা যায়। আবার কিছু যন্ত্রাংশ বিশেষভাবে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য নকশা করা। এ কারণেই এসব সরঞ্জাম কীভাবে সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‘খাইবার শেখান’ বানানোর চেষ্টা

২০২২ সালে ইরান প্রথম ‘খাইবার শেখান’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করেছিল। এটি তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সহজে নেওয়া যায়।

এই ক্ষেপণাস্ত্র নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে। উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এ কারণে মাঝপথে এটিকে ঠেকানো কঠিন।

ইয়েমেনের ওপর নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক পর্ষদের সাবেক বিশেষজ্ঞ হেনরি টমসন বলেন, হাতে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত দুই বছর ধরে চীন থেকে ‘সলিড ফুয়েল’চালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ আমদানি করছে হুতিরা।

ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। পরে সেগুলো চোরাই পথে ইয়েমেনে নেওয়া হয়। ছোট নৌকা, কনটেইনারবাহী জাহাজ কিংবা ওমান-ইয়েমেন সীমান্ত দিয়ে এসব যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়। পরে ইয়েমেনে সেগুলো জোড়া লাগানো হয়।

সিএআরের অনুসন্ধানেও হুতিদের হাতে ইরানি নকশার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রস্তুতির তথ্য উঠে এসেছে।

এই ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা ১ হাজার ২০০ মাইলের বেশি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের পুরো ভূখণ্ড এর আওতায় আসতে পারে।

ইয়েমেনের ওপর নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক পর্ষদের সাবেক বিশেষজ্ঞ হেনরি টমসনের মতে, মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সহায়তায় হুতিরা সৌদি আরবের অনেক ভেতরের এলাকাতেও আঘাত হানতে পারবে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের তুলনায় বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে।

আরও পড়ুন

হুতিদের বিদেশ থেকে অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহের চেষ্টা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সিএআরের বিশেষজ্ঞরা স্বল্প পাল্লার ‘সদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ আমদানির তথ্য নথিবদ্ধ করেন।

তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, তাদের এই চেষ্টা এখন আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সরঞ্জাম সংগ্রহ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা কেন সব হামলা ঠেকাতে পারছে না

সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক বাহিনীগুলোর একটি। দেশটির রয়েছে বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

তারপরও হুতিদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে।

সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ২০২৬ সালের ২১ মে মক্কায় একটি সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নেন
ছবি: এএফপি
আরও পড়ুন

হুতিরা একই সঙ্গে বিভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। এতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য একসঙ্গে এত হুমকি সামলানো কঠিন হচ্ছে।

রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০৯ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এটি সৌদি আরবে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।

সৌদি কর্তৃপক্ষ গত সপ্তাহে হুতিদের ছোড়া বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে। তবে বিমানবন্দরে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রটি তারা আটকাতে পারেনি।

রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবরের হামলার পরের দিন আরেকটি বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ১ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হন।

সর্বশেষ গত বুধবার সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের দাম্মাম শহরের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আটজন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ খবর জানিয়েছে।

কিংস কলেজের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক নওয়াফ ওবায়েদ বলেন, সৌদি আরবের বিশাল আয়তনের কারণে মাঝেমধে৵ আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে ক্ষেপণাস্ত্র চলে আসা অস্বাভাবিক নয়। বহু হামলা প্রতিহত করার পরও একটি হামলা সফল হতে পারে।

আরও পড়ুন

সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার আরেকটি সমস্যা হলো প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। যুক্তরাষ্ট্র ও তার অন্যান্য মিত্রের মতো সৌদি আরবও প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত নিয়ে সমস্যায় পড়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম দিকের মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এসব অস্ত্র দ্রুত ব্যবহার করে ফেলেছে। ফলে হুতিদের হামলা ঠেকানো সৌদি আরবের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করাও সহজ নয়। সৌদি বিমান হামলায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ও ড্রোন তৈরির কারখানা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে; কিন্তু হুতিদের হাতে কত ক্ষেপণাস্ত্র এখনো রয়ে গেছে, তা স্পষ্ট নয়।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে হুতিদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হুতিদের হামলা বেড়ে যাওয়ায় রিয়াদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করতে বলেছে। নগর কর্তৃপক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি পাঠদান বন্ধ করে অনলাইন ক্লাসের নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি রাজধানীতে অনুষ্ঠেয় বড় একটি জ্বালানি সম্মেলন শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে গেছে।

হুতিরা বলছে, ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাবেই তারা সৌদিতে হামলা চালাচ্ছে।

হুতিদের নিজেদেরও বিশ্বাস, এই লড়াই তাদের পুরো অঞ্চলে আরও প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে
ফাইল ছবি: রয়টার্স
আরও পড়ুন

হুতি পরিচালিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ইয়েমেনে আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপ বন্ধ না করলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।

তবে সৌদি আরবও বিমান হামলা বন্ধ করার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বছরের পর বছর হুতিদের সামরিক শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছে। তাঁর মতে, একটি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হুতিরা নিজেদের সক্ষমতা অনেকটাই বাড়িয়েছে।

হুতিদের হাতে থাকা নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, সেগুলোর পেছনে ইরানি প্রযুক্তি ও চীনা যন্ত্রাংশের ব্যবহার এবং দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী এখন শুধু ইয়েমেনের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

হুতিদের নিজেদেরও বিশ্বাস, এই লড়াই তাদের পুরো অঞ্চলে আরও প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: এএফপি, আল–জাজিরা, রয়টার্স, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল