এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করল ইরান
ইরানে চলমান অস্থিরতা ও সহিংস বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর প্রথম বিক্ষোভকারী হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এরফান সোলতানির দণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছে দেশটি। বিষয়টি তাঁর পরিবারকেও জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, ২৬ বছর বয়সী পোশাক দোকানের কর্মচারী এরফানকে গত বৃহস্পতিবার তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারাজে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বুধবার তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ছিল।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে এরফানের পরিবার তাঁর অবস্থা সম্পর্কে খুব কমই জানতে পেরেছিল। শুধু মৃত্যুদণ্ডের আগে শেষবিদায় হিসেবে সংক্ষিপ্ত একটি সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এরফান ও গ্রেপ্তারকৃত অন্যান্য বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ করার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘ভিন্নমত দমন ও আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য আবারও দ্রুত বিচার এবং যথেচ্ছ মৃত্যুদণ্ডের আশ্রয় নিতে পারে’।
তবে গতকাল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা পর কারাগার কর্তৃপক্ষ এরফানের পরিবারকে ফোন করে জানায় যে এটি স্থগিত করা হয়েছে; যদিও এর কোনো বিস্তারিত কারণ জানানো হয়নি।
মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার খবর আসার আগে এরফানের বিদেশে অবস্থানরত এক নিকটাত্মীয় সোমায়েহ (৪৫) বলেন, ‘গতকাল আমি তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি এবং শুধু এটুকুই জানি যে তারা কারাগারে তাঁর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছিল। আমি দুই দিন ধরে ঘুমাতে পারিনি।’
সোমায়েহ ও পরিবারের অন্য সদস্যরা চরম উদ্বেগের মধ্যে রাত কাটিয়েছেন। তাঁরা জানেন, ইরানে সাধারণত ভোরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়ে থাকে। সোমায়েহ কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি এরফানের কথা ভাবা বন্ধ করতে পারছি না। এ অনিশ্চয়তা আমাকে মেরে ফেলছে।’
‘সদাশয় একজন তরুণকে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো হৃদয় কার থাকতে পারে?’ জানতে চান সোমায়েহ।
আমি এরফানের কথা ভাবা বন্ধ করতে পারছি না। এ অনিশ্চয়তা (মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে) আমাকে মেরে ফেলছে।
ইরানে দেশব্যাপী চলা বিক্ষোভে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সেই সঙ্গে এরফান হয়ে উঠেছেন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, দেশটিতে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে অনেক ঘটনা অজানা থাকতে পারে।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হেনগো অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের ভাষ্যমতে, গ্রেপ্তার এরফানকে আইনজীবীর সহায়তা বা আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির (এইচআরএএনএ) তথ্যমতে, ইরানে গত দুই সপ্তাহে ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ২ হাজার ৫৭১ জন নিহত হয়েছেন।
মুদ্রার মানের আকস্মিক পতনের পর গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে এ বিক্ষোভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রূপ নেয়।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এরফান ও গ্রেপ্তারকৃত অন্যান্য বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ করার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘ভিন্নমত দমন ও আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য আবারও দ্রুত বিচার এবং যথেচ্ছ মৃত্যুদণ্ডের আশ্রয় নিতে পারে’।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন, ইরান প্রায়ই কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের দণ্ডাদেশ দিয়ে থাকে। এরফানকে গ্রেপ্তার করার মাত্র চার দিন পরই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা ইরানি মানবাধিকারকর্মীদের মতে তাঁকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করার শামিল।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন, ইরান প্রায়ই কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের দণ্ডাদেশ দিয়ে থাকে। এরফানকে গ্রেপ্তার করার মাত্র চার দিন পরই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা ইরানি মানবাধিকারকর্মীদের মতে তাঁকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করার শামিল।
নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইরান কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ জনের ফাঁসি কার্যকর করেছে।
এরফান তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন, গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি ইরানি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে একটি ফোন পেয়েছিলেন। এটি তিনি উপেক্ষা করেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হুমকি সত্ত্বেও তিনি বিক্ষোভে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখেন।
‘বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে না তেহরান’
এদিকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ হয়েছে—এমন আশ্বাস পেয়েছেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরানের পক্ষ থেকে (বিক্ষোভকারীদের) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করা হয়েছে বলে তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিকল্পনাও স্থগিত করা হয়েছে।
ইরান ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে কাতারের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে কিছু সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গতকাল ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর কয়েক ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।