বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত সোমবারের বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে ডনের। ওই সূত্র জানিয়েছে, টিএলপির সঙ্গে চুক্তি করা এবং সেটি আপাতত গোপন রাখা নিয়ে সামরিক কর্মকর্তারা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সূত্রের ভাষ্য, চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিক্ষোভকারীদের রাস্তা থেকে হটানো। এ ছাড়া আশঙ্কা ছিল, চুক্তির বিষয়বস্তু সামনে এলে জনগণের সমালোচনার মুখে পড়তে পারে পাকিস্তান সরকার। এতে চুক্তির বাস্তবায়ন বাধার মুখে পড়তে পারে।

এদিকে এ মুহূর্তে টিএলপির বিক্ষোভ থিতিয়ে পড়েছে। এ সফলতার জেরে পাকিস্তান সরকার চুক্তিটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র।

শক্তি প্রয়োগ করতে বলেছিলেন ইমরান, নারাজ ছিল সেনাবাহিনী

টিএলপির সঙ্গে সমঝোতার আগে বিক্ষোভকারীদের কীভাবে দমানো যায়, তা নিয়ে পর্যালোচনা করছিল পাকিস্তান সরকার। সূত্র জানিয়েছে, রাজধানী ইসলামাবাদের বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন আসে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত শোনার পর আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়টি খতিয়ে দেখেন দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা। কীভাবে বল প্রয়োগ করে টিএলপিকে থামানো যায় এবং হতাহতের পরিমাণ কত হতে পারে, তা নিয়ে একটি হিসাব কষেন তাঁরা। এর ফলে জনমনে কেমন প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ও মাথায় রাখা হয়।

একাধিক সূত্র ডনকে জানিয়েছে, গত ২৯ অক্টোবর পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক শীর্ষস্থানীয় নেতারা অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া টিএলপির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সুবিধা-অসুবিধাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার যদি টিএলপির বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপের মূল্য চোকাতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে সেনাবাহিনী নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে।

অবশ্য সেনাপ্রধান বিষয়গুলো সামনে আনার আগেই টিএলপির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তান সরকার। ২৭ অক্টোবর ইমরান খান মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে জানান, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিক, এমনটি হতে দেবেন না তিনি। টিএলপিকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনকে আখ্যায়িত করেন দেশটির তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী। ভারতের সঙ্গে গোষ্ঠীটির যোগসাজশ আছে বলেও দাবি করেন তিনি।
টিএলপির বিরুদ্ধে রক্তপাত কোনো সমাধান আনবে না বলে জানিয়েছিল সেনাবাহিনী। এর বিপক্ষে গিয়ে পরামর্শও দিয়েছিল তারা। সেনাবাহিনীর পরামর্শকে সে সময় বল প্রয়োগের দিকে না হেঁটে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমেই সমঝোতা হয়েছে। সমঝোতার সময় উপস্থিত কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিটি রাষ্ট্রের পক্ষেই গিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে টিএলপিরও সহিংস অবস্থানে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।

টিটিপির সঙ্গে আলোচনা

এদিকে গত সোমবারের বৈঠকে নিষিদ্ধঘোষিত আরেক গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সরকারের চলমান আলোচনার বিষয়টিও তোলা হয়েছে। বৈঠক শেষে এ নিয়ে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী জানান, সরকার ও টিটিপি এক মাসের অস্ত্রবিরতির চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছাতে আলোচনা করবে।

পাকিস্তান সরকার কেন টিটিপির সঙ্গে এ আলোচনা শুরু করেছে, তার প্রেক্ষাপটও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নির্ভরযোগ্য কয়েকটি সূত্র ডনকে জানিয়েছে, নানা পর্যালোচনার পর পাকিস্তান সরকার মনে করছে, নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানে রাখতে হলে আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যেই টিটিপির সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। সরকারের এমন ধারণার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। সেগুলো হলো—
১.
পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি। এদিকে আফগানিস্তান তালেবানের নিয়ন্ত্রণে আসার পর ভারতের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না টিটিপি। সমর্থন হারিয়েছে আফগানিস্তানে অবস্থানকারী অন্য অনেক দেশগুলো থেকেও। এতে দুর্বল হয়ে পড়েছে টিটিপি। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আফগানিস্তানে ভারত নিজেদের অবস্থান আবারও শক্ত করতে যাচ্ছে বলে মনে করছে পাকিস্তান। এতে আবারও টিটিপি শক্তি ফিরে পেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

২.
আফগানিস্তানে ক্ষমতার মসনদে বসার পর বিভিন্ন বিতর্কের মুখে এখনো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন পায়নি তালেবান। এতে এ মুহূর্তে পাকিস্তানের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের। তবে একবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া শুরু হলে পাকিস্তানের ওপর তালেবানের এ নির্ভরশীলতা কমে আসবে বলে মনে করছেন দেশটির নীতিনির্ধারকেরা। তাই টিটিপির সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে তড়িঘড়ি করছেন তাঁরা। পাকিস্তান ভাবছে, তালেবানের নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে এ মুহূর্তে টিটিপির সঙ্গে চুক্তি পাকিস্তানের পক্ষে যেতে পারে। কারণ, আফগানিস্তানভিত্তিক এ গোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ রয়েছে তালেবানের হাতে। ছয় থেকে আট মাস পর পরিস্থিতি একই রকম না–ও থাকতে পারে।

৩.
টিটিপিকে দমনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা অনেকটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠক থেকে জানানো হয়েছে, কিছু বিষয় মাথায় নিয়ে টিটিপির সঙ্গে সমঝোতা করা হবে। তার মধ্যে রয়েছে, টিটিপিকে পাকিস্তানের সংবিধান ও আইন মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ ছাড়া টিটিপির যে সদস্যরা গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়া চলবে। তবে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা ছাড় পাবেন।

পাকিস্তান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন