পেছনে ফিরে সামনে যাই

রাজনীতিতে আসার আগে ক্রিকেট মাঠে ইমরান ছিলেন অলরাউন্ডার। নিজের এ নৈপুণ্যকে আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতেই হয়তো বিশ্বকাপ জয়ের চার বছরের মধ্যেই রাজনীতির মাঠেও নামেন তিনি। ১৯৯৬ সালে গঠন করেন রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। এরপর ২২ বছরের মাথায় ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসে হন দেশের ২২তম প্রধানমন্ত্রী।

রাজনীতির মাঠে শুরুতে ইমরান খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত তাঁর দল সংসদে কোনো আসন পায়নি। ২০০২ সালের নির্বাচনে ইমরানই প্রথম ব্যক্তি যিনি পিটিআইয়ের প্রার্থী হিসেবে জয়ের দেখা পান। আবার ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন তাঁর দল বর্জন করে। কিন্তু ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইমরানের দল উঠেপড়ে লাগে। ওই নির্বাচনে অল্পের জন্য পিটিআই দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। তবে ২০১৮ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে ছক্কা মারতে ভুল করেননি ইমরান। তাঁর দল পিটিআই ২৭২টির মধ্যে ১১৭টি আসন পেয়ে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেয়। যদিও ঐতিহাসিক কারণ বিশ্লেষণ করে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলে আসছিলেন, এর সবই সামরিক উর্দিধারীদের ক্যারিশমা। পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী তাঁর পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। চলমান ঘটনায় ইমরানের সঙ্গেও সেটিই ঘটল।

হালহকিকত

গত ৮ মার্চ অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও ভুল পররাষ্ট্রনীতির অভিযোগে ইমরান খানের জোট সরকারের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনে বিরোধী দলগুলো। একপর্যায়ে পিটিআই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) বিরোধী শিবিরে যোগ দিলে জাতীয় পরিষদে (পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ) সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় সরকার। এ অবস্থায় অনাস্থা ভোটে ইমরানের প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর বিষয়টি ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু শেষটা হলো আরও নাটকীয়। প্রধানমন্ত্রী ইমরানের সুপারিশে রোববার (৩ মার্চ) জাতীয় পরিষদ ভেঙে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি।

‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার কাসিম খান সুরি নাকচ করে দেওয়ার পরপরই পাকিস্তানে বড় ধরনের এ রাজনৈতিক পরিবর্তন এল। এখন সাংবিধানিকভাবে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের দায়িত্বে থাকবেন ইমরান খান।

তবে বিরোধীরাও বসে নেই। তাঁরা আইনসভার অধিবেশন পুনরায় চালিয়ে গেছেন। ডেপুটি স্পিকারের অনাস্থা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করার পাশাপাশি বিরোধী দলীয় নেতা ও পাকিস্তান মুসলিম লিগের (নওয়াজ) সভাপতি শাহবাজ শরিফকে নতুন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। অনাস্থা ভোটে ৩৪২ আসনের জাতীয় পরিষদে ১৭২ ভোটের প্রয়োজন ছিল বিরোধীদের। শাহবাজের দল বলছে, অনাস্থা প্রস্তাবে ১৭৪ আইনপ্রণেতার সমর্থন ছিল।

ধোপে টেকে না বিরোধীদের অভিযোগ

নাটকীয় সমাপ্তিতে অনাস্থা ভোটের ধাক্কা কাটিয়ে ইমরানকে আপাতত সফলই বলা যায়। কিন্তু তাঁর আসল সফলতা নির্ভর করছে পরবর্তী নির্বাচনে তিনি কতটা জায়গা করে নিতে পারবেন সেটির ওপর।

বিরোধীদের অভিযোগ, ইমরান অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে পারেননি, দুর্নীতিরও মূলোৎপাটন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ক্ষমতায় থাকার উপযুক্ত নন তিনি। তবে ইমরান বলে আসছেন, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে বিদেশি শক্তি। বিশেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাম বলছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করেছে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল পাকিস্তান। আবার ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ইমরান মস্কোয় গিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইমরান খানের প্রতি চটেছে। ইমরান খানের ভাষ্য, মার্কিন কর্মকর্তারা পাকিস্তানি কূটনীতিকদের সতর্ক করে বলেছেন যে, পররাষ্ট্র নীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কারণে তাঁকে (ইমরান) ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে।

ব্যক্তি ইমরানকে এখন পর্যন্ত সৎ–ই বলতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী স্লোগানে ক্ষমতায় আসা ইমরান খানের মূল লক্ষ্য ছিল, দেশের ভেতরের মধ্যবিত্ত ও অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্ম। যেমন, তিনি প্রচারণা চালান দুর্নীতি ও রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে।

১৫তম জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরিবারতন্ত্রের বাইরে গিয়ে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। তিনি এমন একটি পাকিস্তান গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যেখানে মুদ্রা, পানি ও বিদ্যুতের কোনো সংকট থাকবে না। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তাঁর মেয়ের নাম জড়ানোয় ২০১৮ সালে পোয়াবারো হয় তাঁর। সেই সময়ের প্রধান বাধা পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ) এক ধরনের ফাঁদে পড়ে যায়। অন্যদিকে ইমরানের বিরুদ্ধে মাথা তুলতে পারেনি পাকিস্তান পিপলস পার্টিও (পিপিপি)। কারণ এই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও আছে দুর্নীতির অভিযোগ। এখন প্রশ্ন, আসন্ন নির্বাচনে পিএমএল (নওয়াজ)-পিপিপি আসলে কতটা মাঠের ভোট পাবে। না কি এবার দেশটির সেনাবাহিনীর আশীর্বাদ পেতে যাচ্ছে তারা। বিরোধীরা তো বলেই ফেলেছেন, ইমরানের মাথার ওপর থেকে সামরিক ছায়া সরে গেছে।

এখন কী করবেন ইমরান

রাজনীতি বিজ্ঞানে এলিট থিওরির আলোচনায় ক্ষমতার চক্রে থাকা দু ধরনের ব্যক্তির কথা বলা হয়ে থাকে। এক প্রকার হলেন সাহসী। আরেক প্রকার চালাক। ব্যক্তিগতভাবে ইমরান খানকে দ্বিতীয় কাতারে রাখতে চাই। কারণ রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে নিজের খেলোয়াড়ি জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েছিলেন ইমরান। তাঁর দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ডাক বিশেষ করে তরুণদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

রাজনীতির মাঠে জায়গা করে নিতে ইমরান স্ববিরোধী কৌশলও অবলম্বন করেন। পশ্চিমা–ঘেঁষা জীবনযাপন করা ‘প্লেবয়’খ্যাত ইমরানকে কখনো কখনো অতিমাত্রায় রক্ষণশীলের ভূমিকায় দেখা যায়। ইউরোপের সভ্যতায় বেড়ে ওঠা ইমরান কঠোর সমালোচনা করেন পশ্চিমা ধ্যানধারণার। তিনি সন্ত্রাসবাদবিরোধী প্রচারণায় যেমন অংশ নিয়েছেন, তেমনি দেশটির কট্টরপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন। বুশরা মানেকাকে বিয়ে করে তিনি বাগিয়ে নেন পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক নেতাদের ভক্তকুলের আশীর্বাদও। আর ক্ষমতায় থাকাকালে ইমরান কি তাঁর রাজনীতির মাঠ গোছাননি? এমনটা মনে হয় না।

বিশ্ববিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অক্সফোর্ডের ডিগ্রিধারী ইমরানের যে রাজনৈতিক জ্ঞানও কম নয় তা তিনি এতদিনে ভালোভাবে বুঝিয়েছেন। তবে দেশটি যে পাকিস্তান। তাই আগামী দিনে কী হতে যাচ্ছে তা নিয়ে এখনই স্পষ্ট কিছু বলা যাচ্ছে না। এদিকে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ আপাত ম্রিয়মাণ। হয়তো ইমরান ৯০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পুনরুদ্ধারও করে ফেলবেন। আবার দেখাবেন বাজিমাত। তাঁর জীবনে যোগ হবে আরেকটি ২২ ভাগ্যের পালক।

মো. ছানাউল্লাহ, প্রথম আলোর সহসম্পাদক

পাকিস্তান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন