১৭ আগস্ট ১৯৮৮। সেদিন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক বাহওয়ালপুরে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এম-১ আব্রামস ট্যাংকের কার্যকারিতা–সংক্রান্ত প্রদর্শনী দেখতে। ট্যাংকটি কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে চাপ দিচ্ছিল। সেদিন কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাও জিয়াউলের সঙ্গে ছিলেন।
পাকিস্তানে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্নল্ড রাফেল ও ঊর্ধ্বতন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা হার্বার্ট এম ওয়াসম স্থানীয় একটি খ্রিষ্টান মঠ পরিদর্শনের জন্য আগের দিন থেকেই বাহওয়ালপুরে অবস্থান করছিলেন।
বাহওয়ালপুরের তামেওয়ালি এলাকায় ট্যাংকের প্রদর্শনী শেষে জিয়া ও তাঁর সঙ্গীরা হেলিকপ্টারে করে বাহওয়ালপুর বিমানঘাঁটিতে ফেরেন। সেখানেই দুপুরের খাবার খান তাঁরা। এরপর পাক–ওয়ান নামের পরিচিত লকহিড সি-১৩০ উড়োজাহাজে ওঠার সময় জিয়াউল তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী কয়েকজনকে সঙ্গে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। মার্কিন রাষ্ট্রদূত রাফেল সঙ্গে সঙ্গেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। কিছুটা ইতস্তত করার পর মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ওয়াসমও উড়োজাহাজে ওঠেন।
ওই উড়োজাহাজের পাইলট ছিলেন উইং কমান্ডার মাশহুদ হাসান ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাজিদ। জিয়াউল হক, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল আখতার আবদুর রহমান এবং দুই পাইলটসহ ওই উড়োজাহাজে ৩১ জন আরোহী ছিলেন। উড্ডয়নের পর বাহওয়ালপুর থেকে কয়েক মাইল দূরের সুতলেজ নদীর কাছে উড়োজোজটি আছড়ে পড়ে।
১৯৮৯ সালে ভ্যানিটি ফেয়ারে মার্কিন সাংবাদিক জে এপস্টিনের বর্ণনায় জিয়াউল হকের মৃত্যুর ঘটনাটি এভাবে উঠে এসেছিল—
‘গ্রামবাসীরা দেখেছিলেন, পাক-ওয়ান উড়োজাহাজটি আকাশে বারবার ওপর-নিচ করছিল, যেন কোনো অদৃশ্য রোলার কোস্টারে ছুটছে। তৃতীয়বার ঘুরে যাওয়ার পর উড়োজাহাজটি সরাসরি মরুভূমির দিকে ছুটে গিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। এরপর সেটিতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং জ্বালানি পুড়তে শুরু করলে বিমানটি আগুনের গোলায় পরিণত হয়।’
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ। জিয়াউল হকসহ উড়োজাহাজে থাকা ৩১ জন আরোহীর সবাই নিহত হন।
ওই ঘটনার চার দশক হতে চললেও একটি প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। সেটি হলো এটি কি নিছক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ছিল, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?
আজও সেই প্রশ্ন ঘিরে আছে নানা সন্দেহ, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং এমন কিছু তথ্য, যা দুর্ঘটনার সাধারণ ব্যাখ্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। তদন্তে যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ মেলেনি; বরং একটি সরকারি কারিগরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নাশকতাই হতে পারে দুর্ঘটনার কারণ।
ওই ঘটনার চার দশক হতে চললেও একটি প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। সেটি হলো এটি কি নিছক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ছিল, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? আজও সেই প্রশ্ন ঘিরে আছে নানা সন্দেহ, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং এমন কিছু তথ্য, যা দুর্ঘটনার সাধারণ ব্যাখ্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
জিয়াউল হক যেভাবে প্রেসিডেন্ট হন
জিয়াউল হক ১৯২৪ সালের ১২ আগস্ট ব্রিটিশশাসিত ভারতের জলন্ধরে একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কেরানি হিসেবে কাজ করতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জিয়াউল হক ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কমিশন পান। তিনি বার্মা, মালয়া ও জাভায় যুদ্ধে অংশ নেন।
ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দেশ ভাগ হলে জিয়ার পরিবার পাঞ্জাব পেরিয়ে নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে চলে যায়।
১৯৫৫ সালে জিয়া পাকিস্তানের কোয়েটার স্টাফ কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের ফোর্ট লিভেনওয়ার্থে কমান্ড অ্যান্ড জেনারেল স্টাফ কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি দ্রুত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৬ সালে জিয়াকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। জ্যেষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তাকে টপকে জিয়াকে এই পদে বসানো হয়। এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ভুট্টোর জন্য আত্মঘাতী হয়ে ওঠে।
১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিজের নিয়োগকর্তা ভুট্টোকেই ক্ষমতাচ্যুত করেন জিয়াউল হক। সেনাপ্রধানের পদ ধরে রেখেই তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। পরে প্রেসিডেন্ট ফজল ইলাহী চৌধুরী পদত্যাগ করলে জিয়াউল হক প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।
১৯৭৯ সালে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর সরকারে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তপোক্ত করেন জিয়াউল হক। ওই বছরই তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম স্থগিত করেন, শ্রমিকদের ধর্মঘট নিষিদ্ধ করেন এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেন। তিনি দেশে সামরিক আইনও জারি করেন, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৫ সালে তুলে নেওয়া হয়।
১৯৭৯ সালে প্রতিবেশী আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক অভিযান শুরু হলে জিয়াউল হক যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তি আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করেন।
তবে জিয়াউল খুব বেশি দিন টিকতে পারেননি। ১৯৮৮ সালের ১৭ আগস্ট উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত
জিয়াউল হকের মৃত্যুর পরপরই তদন্ত শুরু হয়। ওই বছরের ১৯ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, বিমান দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ইসলামাবাদকে সহায়তা করার জন্য তারা একটি বিশেষ দল গঠন করেছে। ছয় সদস্যের ওই দল ২২ আগস্ট পাকিস্তানে পৌঁছে এবং সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় থাকা উড়োজাহাজের দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
ওই বছরের ২৩ আগস্ট ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশি ও পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারছিলেন না কীভাবে উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে পারে। কারণ, বাহওয়ালপুরে বিমানটি অবতরণের পর থেকে আবার উড্ডয়নের আগ পর্যন্ত ১৪ জন কারিগরি কর্মী সেটি পরীক্ষা করেছিলেন। ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেও পাঠানো হয়েছিল।
বাহওয়ালপুরে জিয়াউল হকের জন্য দেওয়া উপহারের মধ্যে ছিল আমের বাক্স। সেটি নিয়েও সন্দেহ করা হচ্ছিল। উপহারদাতাদের মধ্যে একজন প্রাদেশিক মন্ত্রী ও তৎকালীন বাহওয়ালপুরের মেয়রও ছিলেন। তাঁদের কয়েকজনকে অন্তত আট ঘণ্টা পুলিশ হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উড়োজাহাজটির গ্রাউন্ড ক্রুসহ প্রায় ৮০ জন ব্যক্তিকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল।
পাইলট উইং কমান্ডার মাশহুদ হাসান ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাজিদের অতীতও খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া যায়নি। ক্যাপ্টেন মাশহুদকে দক্ষ ও অভিজ্ঞ পাইলট হিসেবে বিবেচনা করা হতো। জেনারেল জিয়াউল হকও তাঁকে খুব পছন্দ করতেন।
‘সম্ভবত নাশকতা’
১৯৮৮ সালের ১৬ অক্টোবর পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ওই উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা নিয়ে তৈরি ৩৬৫ পৃষ্ঠার লাল মলাটের একটি কারিগরি প্রতিবেদন প্রেসিডেন্ট গোলাম ইসহাক খানের কাছে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিল এয়ার কমোডর আব্বাস এইচ মির্জার নেতৃত্বাধীন একটি তদন্ত দল।
ওই তদন্ত দলে ছিলেন সি-১৩০ উড়োজাহাজের পাইলট ও বিশেষজ্ঞ সাবাহাত আলী খান এবং উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা তদন্তের বিশেষজ্ঞ জহিরুল হাসান জায়েদি। তাঁদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একদল কারিগরি ও বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞও তদন্তে অংশ নেন।
ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে দেখা যায়, উড়োজাহাজটি মাঝ–আকাশে ভেঙে পড়েনি। কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেও এটি বিধ্বস্ত হয়নি। উড়োজাহাজের ভেতরে আগুন লাগারও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একমাত্র যে ব্যক্তির ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল, সেই মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াসমের শ্বাসনালিতে কোনো কালি বা ধোঁয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এতে বোঝা যায়, দুর্ঘটনার পর আগুন লাগার আগেই তিনি মারা গেছেন।
বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের পক্ষেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রপেলারের ব্লেডের অবস্থা দেখে বোঝা যায়, ঘটনার সময় ইঞ্জিনগুলো পূর্ণ গতিতে চলছিল। বৈদ্যুতিক–ব্যবস্থা ও জ্বালানি পাম্পও স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল।
যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়ও খতিয়ে দেখা হয়; কিন্তু সি-১৩০ উড়োজাহাজটিতে দুটি হাইড্রলিক ব্যবস্থা ছিল এবং দুর্ঘটনার সময় দুটিই সচল ছিল। বলা চলে, উড়োজাহাজটি পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত আকাশে স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছিল। তারপরও কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই সেটি বিধ্বস্ত হয়।
ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ধ্বংসাবশেষের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে অস্বাভাবিক মাত্রায় কিছু বিদেশি উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল পেন্টারিথ্রিটল টেট্রানাইট্রেট (পিইটিএন)-এর চিহ্ন। এটি একটি বিস্ফোরক, যা পরে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে।
ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ধ্বংসাবশেষের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে অস্বাভাবিক মাত্রায় কিছু বিদেশি উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল পেন্টারিথ্রিটল টেট্রানাইট্রেট (পিইটিএন)-এর চিহ্ন। এটি একটি বিস্ফোরক, যা পরে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি হামলার উদ্দেশ্য ছিল উড়োজাহাজ ভূপাতিত করা।
এ ছাড়া অ্যান্টিমনি ও ফসফরাসের মতো কিছু উপাদানের অবশিষ্টাংশও পাওয়া যায়, যা সাধারণত উড়োজাহাজের কাঠামো, জ্বালানি বা অন্যান্য অংশে থাকার কথা নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যেহেতু দুর্ঘটনার কোনো কারিগরি কারণ পাওয়া যায়নি, তাই এর একমাত্র সম্ভাব্য অন্য কারণ হতে পারে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা নাশকতা। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের পরিচয় খুঁজে বের করতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশও করা হয় প্রতিবেদনে।
ওই বছরের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ হয়তো পুরো তদন্ত প্রতিবেদনটি দেখতে পারবেন না। কারণ, ‘দেশের অখণ্ডতা ও সংহতির জন্য ক্ষতিকর’ মনে হলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে না।
নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের মৃত্যুর ঘটনায় পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন ও রহস্য তৈরি হয়। নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আসতে থাকে।
২০২০ সালে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জিয়াউলের ছেলে ইজাজুল হক নতুন করে বেশ কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সামনে নিয়ে আসেন।
ইজাজুল হক দাবি করেন, উড়োজাহাজে থাকা একটি আমের বাক্সে বিস্ফোরক থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর দাবি, পাইলটদের অক্ষম করে দিতে উড়োজাহাজের কেবিনে নার্ভ গ্যাসও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ইজাজুলের দাবি, ষড়যন্ত্রকারীরা কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। তারা নার্ভ গ্যাস ও বিস্ফোরক ব্যবহার করেছিল। বাইরে থেকেও একটি প্রজেক্টাইল ছোড়া হয়েছিল।
২০২০ সালে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া ওই বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইজাজুল হক সন্দেহের তির তাক করেন জেনারেল আসলাম বেগের দিকে। জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর আসলাম বেগ সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। ইজাজুল হক তৎকালীন মুলতানভিত্তিক সাঁজোয়া ডিভিশনের কমান্ডার জেনারেল মাহমুদ আলী দুররানির দিকেও সন্দেহের আঙুল তুলেছিলেন।
জিয়াউল হকের ছেলে ইজাজুল উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় জেনারেল বেগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, বেগ সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনায় আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। আর তা জেনারেল জিয়াউল হক পছন্দ করতেন না। তিনি তাঁকে সরিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আফজালকে ওই পদে বসানোর পরিকল্পনা করছিলেন।
জেনারেল দুররানির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ইজাজুল হক বলেন, ঘটনার দিন ট্যাংকের পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী দেখতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, জিয়াউল হক সেখানে যেতে মোটেও আগ্রহী ছিলেন না।
ইজাজুল বলেন, তাঁর বাবা যে আর্মি হাউসে থাকতেন, সেখানকার রেজিস্টার অনুযায়ী দুররানি ১৬ বার ফোন করে জিয়াউল হককে বাহওয়ালপুর যাওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন।
ধারণা করা হয়, জিয়াউল হক এই ট্যাংক কেনার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না; বরং তিনি এডব্লিউএসিএস কেনার বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
এরপর নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে আনাদোলুকে বেগ বলেছিলেন, এসব অভিযোগের জবাব দেওয়াকে তিনি নিজের জন্য উপযুক্ত মনে করেন না। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর সুষ্ঠুভাবে বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
বেগ বলেন, ‘সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে চাপ থাকা সত্ত্বেও আমি সামরিক শাসন জারি করিনি। এমনকি সেনাপ্রধান হিসেবে আমার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবও গ্রহণ করিনি। তাহলে এমন কোনো ষড়যন্ত্রে আমি কেন জড়াব, যাতে আমার কোনো লাভই হয়নি?’
বেগ পাল্টা অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ জড়িত ছিল বলে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ তাঁর রয়েছে।
বেগ আরও দাবি করেন, তাঁর দায়িত্বকালে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালিয়েছিল। সেই তদন্তেও সিআইএর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে অভ্যন্তরীণ তদন্তের বিষয়ে তিনি আর বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে দুররানি নাশকতার তত্ত্বগুলো নাকচ করে দিয়েছিলেন। তিনি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়াকে নিছক দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের ছেলে ইজাজুল হকের অভিযোগ, যারা সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদেরই হয়রানি ও বদলি করা হয়েছিল।
ইজাজুল দাবি করেন, তদন্তে স্নায়ু গ্যাস ব্যবহারের তথ্যও উঠে এসেছিল; কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো এই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার মতো উদ্যোগ নেয়নি।
ইজাজুল হক আরও দাবি করেন, তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার অংশ হিসেবে নিহত ব্যক্তিদের ময়নাতদন্তও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এতে মৃত ব্যক্তিদের শরীরে স্নায়ু গ্যাস বা অন্য কোনো বিষাক্ত পদার্থের প্রভাব ছিল কি না, তা যাচাই করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়।
ইজাজুল হক ইসরায়েলি ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন।
ইজাজুল হকের আরেকটি অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত নিয়ে। তাঁর বক্তব্য, কোনো মার্কিন নাগরিক বিদেশে নিহত হলে এফবিআইয়ের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শুরু করার নিয়ম রয়েছে; কিন্তু জিয়াউল হকের বিমানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্নল্ড রাফেল নিহত হওয়ার পর এফবিআই প্রায় ১১ মাস পরে তদন্তে আসে।
তত দিনে দুর্ঘটনাস্থলের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট বা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল—এমন অভিযোগও ইজাজুল করেছেন। তাঁর মতে, তদন্তে এই দীর্ঘ বিলম্বও ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অংশ হতে পারে।
বিদেশিদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ
জেনারেল জিয়াউল হকের মৃত্যুর ঘটনায় সম্ভাব্য বিদেশি শক্তি নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সে সময় আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলছিল। পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র মুজাহিদিনদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিতে একসঙ্গে কাজ করলেও আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সরকার এবং জেনেভা চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে অমিল ছিল।
জেনারেল জিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর পারমাণবিক কর্মসূচিও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নও পাকিস্তানের আফগান নীতিতে ক্ষুব্ধ ছিল। উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন সতর্ক করেছিল, পাকিস্তানের নীতি আর সহ্য করা হবে না। ভারতও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল।
তাই সন্দেহের তালিকা দীর্ঘ হয়েছিল; কিন্তু নিশ্চিত প্রমাণ কারও বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যায়নি।
জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর নওয়াজ শরিফের প্রথম সরকারের সময়ে শফিকুর রহমান কমিশনও তদন্ত করেছিল। পরে সেটি একটি গোপন প্রতিবেদন দেয় বলে জানা যায়। সেখানে সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্য তদন্তে বাধা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ছিল; কিন্তু সেই প্রতিবেদনও প্রকাশ্যে আসেনি।
আবার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কেউ কেউ নাশকতার তত্ত্ব মানেন না। তাঁদের মতে, এটি রক্ষণাবেক্ষণজনিত কোনো ত্রুটি হতে পারে। সি-১৩০-এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও তাঁদের দৃঢ় আস্থা ছিল।
যদি যান্ত্রিক ত্রুটি হয়ে থাকে, তদন্তে তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলল না কেন? আর যদি নাশকতা হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের পরিচয় প্রকাশ পেল না কেন? সে প্রশ্নটি থেকেই গেছে।
তথ্যসূত্র: ডন, আনাদোলু এজেন্সি, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, ইউপিআই, এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা