সরকারের পুনর্বিবেচনার আবেদন ফেরত পাঠালেন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানছবি: রয়টার্স

কারাবন্দী পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের করা পুনর্বিবেচনার আবেদন আজ বৃহস্পতিবার ফেরত পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে ইসলামাবাদের চিফ কমিশনারের করা এ আবেদনে আপত্তি তোলা হয়েছে। তারা জানায়, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের আপত্তি দূর করার পর পুনর্বিবেচনার আবেদনটি আবার দায়ের করা হবে।

এদিকে এক্সে করা পোস্টে পিটিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সালমান আকরাম রাজা বলেছেন, ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনার আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছে ফেডারেল সরকার।

আকরাম রাজা আরও বলেন, ১৮ আগস্টের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ না মানার কোনো অজুহাতই আর অবশিষ্ট নেই। ইমরান খানকে অবিলম্বে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে।

কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের আদেশের বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকারের সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বিবেচনার আবেদন করার এক দিন পর এ ঘটনা ঘটল।

ইসলামাবাদ ক্যাপিটাল টেরিটরির (আইসিটি) অ্যাডভোকেট জেনারেলের মাধ্যমে আবেদনটি করেন ইসলামাদের চিফ কমিশনার।

৭৩ বছর বয়সী ইমরান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর ও তাঁর দলের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে বন্দী রাখা হয়েছে। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি একাধিক আইনি মামলার সম্মুখীন হয়েছেন।

এক দিন আগে কেন্দ্রীয় সরকারের করা আবেদনে বলা হয়েছিল, ইমরান খানকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ১৮ আগস্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশটি আদালতের এখতিয়ার অতিক্রম করেছে এবং এটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

আবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়, মনে হচ্ছে, উল্লিখিত সংবিধিবদ্ধ বিধানটি মাননীয় আদালতের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে, যার ফলে নথিপত্রে স্পষ্ট এক ভুল তৈরি হয়েছে। আদালত যদি আইনের উল্লিখিত বিধান বিবেচনা করতেন, তবে পুনর্বিবেচনাধীন আদেশটি জারি করা সম্ভব হতো না। তাই এটি পুনর্বিবেচনা পাওয়ার যোগ্য।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট অতিরিক্ত দায়রা জজ ইমরান খানকে তিন বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। পরে তিনি ওই সাজা বাতিল চেয়ে ইসলামাবাদ হাইকোর্টে (আইএইচসি) আপিল করেন।

আবেদনে দাবি করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের আবেদন করেছিলেন, তবে আইএইচসি গত ১২ মার্চ সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপরই শীর্ষ আদালতে আপিল করা হয়েছিল।

এতে বলা হয়, হাসপাতালে স্থানান্তরিত বন্দীদের অবশ্যই পুলিশের নজরদারিতে রাখতে হবে। আবেদনে ১৯৭৮ সালের পাকিস্তান প্রিজন রুলসের ১৯৭ নম্বর বিধির কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে বন্দী ব্যক্তিকে জেল থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের পদ্ধতি নির্ধারণ করা আছে।

সরকারের আবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি প্রথমবার সুপ্রিম কোর্টের সামনে আসে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে কোনো নোটিশ জারি করা হয়নি। আবেদনে বলা হয়, অতীতে নিয়মিত ইমরানের শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছে এবং একাধিক উপলক্ষে মেডিক্যাল বোর্ডের কাছ থেকে তিনি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন।

এতে আরও যুক্তি দেওয়া হয়, স্বাস্থ্যগত কারণে তাঁর স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আদালতের উচিত ছিল চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত সুপ্রিম কোর্টের আদেশে, দুই দিনের মধ্যে পিটিআই প্রতিষ্ঠাতাকে চিকিৎসা মূল্যায়ন ও চিকিৎসার জন্য শিফা হাসপাতালে স্থানান্তর করার জন্য আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।

ইমরান খানকে পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত। এতে বলা হয়, তাঁর চিকিৎসা মূল্যায়ন ও চিকিৎসার সময় ড. উজমা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক উপস্থিত থাকতে পারবেন এবং যাবতীয় খরচ তাঁর পরিবার বহন করবে।

কর্তৃপক্ষকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করতে এবং কয়েক দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে আদালত সতর্ক করে বলেছেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশের কোনো লঙ্ঘন হলে পিটিআই প্রতিষ্ঠাতাকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করা হতে পারে।

এই রায়ের পর পিটিআই সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে স্বাগত জানিয়েছে এবং দলীয় কর্মীদের হাসপাতালের বাইরে জমায়েত হওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

সরকারের সঙ্গে সমঝোতা

দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আদেশে দেশটির রাজনৈতিক ও আইনাঙ্গনের অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে প্রায় তিন বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) জন্য রাজনৈতিক পরিসর তৈরির ইঙ্গিত মিলছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক ও আইনবিষয়ক কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করেন, ইমরান খানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্যথায় এমন আদেশ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে। ইমরান খান নতুন প্রদেশ গঠন ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের মতো কোনো কোনো প্রস্তাব মেনে নিতে পারেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।