বিদেশি এজেন্টরা আমাদের দেশ চালাচ্ছেন না: ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজফাইল ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর দেশটির জ্বালানি তেল উত্তোলনে তোড়জোড় শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কারাকাস তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল ওয়াশিংটনকে দেবে। যদিও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, বিদেশিরা তাঁর দেশ চালাচ্ছেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মঙ্গলবার রাতে এ কথাগুলো বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এদিন সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল, ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলন বাড়াতে দেশটিতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিনিয়োগ–সংক্রান্ত বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পরপরই ভেনেজুয়েলার তেল ‘নিজেদের কাছে নেওয়ার’ কথা বলেছিলেন ট্রাম্প।

ভেনেজুয়েলার একটি জ্বালানি তেল উত্তোলনকেন্দ্র
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের পোস্টে বলা হয়, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকে তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল দেওয়ার কথা বলেছে। এ তেল উত্তোলন করার পর দেশটিতে রয়েছে। তিনি এই তেল বিক্রির অর্থ নিয়ন্ত্রণ করবেন, তা ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাবেন। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটকে এই পরিকল্পনা ‘দ্রুত’ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল সিএনএন। জবাবে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ওই তেল এরই মধ্যে উত্তোলন করে ব্যারেলে ভর্তি করা হয়েছে।

সেগুলোর বেশির ভাগ জাহাজে বোঝাই রয়েছে। পরিশোধনের জন্য এই তেল এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন মার্কিন পরিশোধনাগারে নেওয়া হবে।

ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের নতুন ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১ ডলার কমে ৫৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি বাজারমূল্যে ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে তেল কেনে, তাহলে তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেলের জন্য অতিরিক্ত ২৭৫ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে কারাকাস। ভেনেজুয়েলা বর্তমানে প্রতি ব্যারেল তেল ৫৫ ডলারে বিশ্ববাজারে বিক্রি করে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে অস্পষ্টতা

২০২৩ সালের হিসাবে ভেনেজুয়েলায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের মতো তেলের মজুত রয়েছে। ১৯৯৯ সালে সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর দেশটির তেল খাত জাতীয়করণ করা হয়। ফলে শেভরন বাদে বড় বড় মার্কিন তেল কোম্পানিকে ভেনেজুয়েলা থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হয়। এর জেরে কারাকাসের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন।

নিষেধাজ্ঞার পরও ভেনেজুয়েলা থেকে অল্প পরিমাণে তেল আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। এখন ট্রাম্প যে তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেলের কথা বলছেন, তাতে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বেকার ইনস্টিটিউটের জ্বালানিবিশেষজ্ঞ মার্ক ফিনলে বলেন, এই পরিমাণ তেল কোন সময়ের মধ্যে কেনা হবে, তা বলা হয়নি। ফলে এর প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আটককেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউইয়র্কে আদালতের কাছের একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয় তাঁদের। সেখান থেকে ভ্যানে তুলে আদালতে নেওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারি
ছবি: রয়টার্স

তিন বা পাঁচ কোটি ব্যারেল শুনতে অনেক বেশি মনে হলেও, গত মাসে প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্র দুই কোটি ব্যারেলের বেশি তেল ব্যবহার করেছে। আর সারা বিশ্বে দিনে ব্যবহার করা হয়েছে ১০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল। মার্ক ফিনলে আল–জাজিরাকে বলেন, ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে হয়তো এক মাসে এই তেল নেওয়া হবে। কারণ, এক বছরের হিসাব হলে এই তেলের পরিমাণ খুবই কম।

ভেনেজুয়েলার তেল থেকে আয় কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা–ও স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের জ্বালানিবিশেষজ্ঞ স্কট মন্টগোমেরি। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো ধারণাই নেই যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তেল থেকে আয় ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে বণ্টন করবে। কারণ, এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে।’

আরও পড়ুন

‘বিদেশিরা ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছে না’

গত শনিবার মার্কিন বাহিনী কারাকাসে সামরিক হামলা চালিয়ে নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। গত সোমবার আদালতে তোলার পর তাঁরা বর্তমানে নিউইয়র্কের আটককেন্দ্রে বন্দী রয়েছেন। মাদুরোর অনুপস্থিতিতে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হয়েছেন দেলসি রদ্রিগেজ। তিনি মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা চালাবে—এমন কথা বলে আসছিলেন ট্রাম্প। সোমবারও সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে তিনি বলেছেন, বর্তমানে তিনিই দেশটির দায়িত্বে আছেন। যদিও মঙ্গলবার দেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, ‘বিদেশি এজেন্টরা ভেনেজুয়েলা শাসন করছে না। ভেনেজুয়েলার সরকারই দেশটি শাসন করছে, আর কেউ নয়।’

এদিকে মঙ্গলবার কারাকাসে দেলসির সমর্থনে বিশাল মিছিল বের করেন নারীরা। এদিন রাজধানীতে মাদুরোর সমর্থনে মিছিল বের করেন ভেনেজুয়েলায় মাদকবিরোধী বাহিনীর সদস্যরাও। বিক্ষোভ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতেও। সেখানে একটি প্ল্যাকার্ডে ট্রাম্পের ছবিতে লেখা ছিল, ‘যেমনটি দেখাচ্ছে, তিনি তেমনই অথর্ব।’

আরও পড়ুন