বলসোনারোর শাসন মেয়াদে আমাজন জঙ্গলের যে হাল হয়েছে

ব্রাজিলকে একসময় প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হতো। গত দুই দশকের বেশির ভাগ সময়জুড়ে দেশটিকে আদিবাসীদের ভূমি সংরক্ষণ, অবৈধভাবে বন উজাড়কারীদের ওপর ধরপাকড়, কী পরিমাণ বন ধ্বংস হচ্ছে, তা আরও বেশি করে পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গিয়েছিল। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বন উজাড়ের হার উল্লেখজনকভাবে কমেছিল তখন।

তবে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে জইর বলসোনারো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ক্রমাগত আমাজন জঙ্গল ধ্বংসের হার বাড়তে দেখা গেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বলসোনারো ব্রাজিলের পরিবেশের সুরক্ষাজনিত পদক্ষেপগুলো কমিয়ে ফেলেন, বিজ্ঞান ও পরিবেশগত সংস্থাগুলোতে খরচ কমিয়ে দেন, পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের বরখাস্ত করেন এবং আদিবাসীদের ভূমির অধিকার নড়বড়ে করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।

বন উজাড় করে এসব এলাকাগুলোকে কৃষি জমিতে পরিণত করা হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বারবারই অভিযোগ করেছে, বলসোনারোর সরকার স্থানীয় কৃষকদের আমাজনে আগুন দিতে উৎসাহ দিয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বন উজাড় এবং আগুনের কারণে আগের দশকের তুলনায় ২০১৯ ও ২০২০ সালে কার্বন ডাই–অক্সাইড নির্গমনের হার দ্বিগুণ হয়েছে। সবশেষ একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছর আমাজন জঙ্গলের প্রায় ১০ লাখ হেক্টর এলাকা আগুনে পুড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরে বনে আগুনের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্রাজিলের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (আইএনপিই) গবেষক লুসিয়ানা গাত্তি বলেন, বলসোনারো সরকারের অধীন আমাজনে কার্বন ডাই–অক্সাইড নির্গমনের হার দ্বিগুণ হয়েছে।

ব্রাজিলের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (আইএনপিই)-এর জলবায়ুবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক লুসিয়ানা গাত্তির নেতৃত্বাধীন এক গবেষণায় দেখা গেছে বলসোনারোর শাসন মেয়াদে আমাজন জঙ্গলে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং প্রচণ্ডরকম বন উজাড় করার কারণে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। গাত্তি বলেন, এতে যে শুধু ব্রাজিলের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা নয়, এর মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছে। আইনিব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ায় পরিবেশবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির বোধ তৈরি হয়েছে।

২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বলসোনারোর শাসন মেয়াদের প্রথম তিন বছরে আমাজন জঙ্গলের ৩৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা উজাড় হতে দেখা গেছে। এ সময় আগের ৩ বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি বন এলাকা উজাড় হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট দাবানলে ধ্বংস হওয়া বন এলাকাকে বাদ দিয়ে এ হিসাব করা হয়েছে।

গাত্তির দলের গবেষণা প্রতিবেদনটি নেচার সাময়িকীর পর্যালোচনাধীন। গবেষণার আওতায় দশক ধরে আমাজন বনের ওপর দিয়ে ছোট ছোট উড়োজাহাজ উড়িয়ে বাতাসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০-২০১৮ সালে গড় কার্বন ডাই–অক্সাইড নির্গমন হারের তুলনায় ২০১৯ সালে কার্বন ডাই–অক্সাইডের নির্গমন হার ৮৯ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ১২২ শতাংশ বেড়েছে।

২০২০ সালে কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো ওই বছর বন উজাড়ের হার ৭৪ শতাংশ এবং আগুনে পুড়ে যাওয়া বনের এলাকার পরিমাণ ৪২ শতাংশ বেড়ে যাওয়া। আবার একই বছরে পরিবেশ–সম্পর্কিত অপরাধের ঘটনায় জরিমানা আদায়ের পরিমাণ ৮৯ শতাংশ কমেছে। কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করার হার ৫৪ শতাংশ কমেছে। ২০১৯ সালেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।

লুলা কি আমাজন জঙ্গলকে বাঁচাতে পারবেন?

লুলা তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বারবারই আমাজন জঙ্গলের সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। ২০০৩ সালে ব্রাজিলে আমাজন জঙ্গল উজাড়ের হার আগের বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ ছিল। ওই বছর ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা উজাড় হয়েছিল। এমন সময়ই প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লুলা। ২০০৪ সালেও পরিবেশ বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতা দেখা গিয়েছিল।

ব্রাজিলের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (আইএনপিই)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৪ সালে আমাজন জঙ্গলের ২৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ধ্বংস হতে দেখা গিয়েছিল। তবে ২০১২ সাল নাগাদ বন ধ্বংসের এলাকা কমে ৪ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। পরবর্তী কয়েক বছরেও বন ধ্বংসের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কমতে দেখা গেছে। ২০০৪-২০১২ সালের মধ্যে বেশির ভাগ সময় ক্ষমতায় ছিলেন লুলা।

লুলা তাঁর আগের শাসন মেয়াদে পরিবেশ নিয়ে যেমন ভূমিকা দেখিয়েছিলেন, তার ভিত্তিতে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার বিজয় আমাজনের জন্য টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। ব্রাজিলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমাজনের গবেষক ব্রেন্দা ব্রিতো বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যা কিছু ঘটেছে, তা সত্যিকার অর্থে মর্মান্তিক। আমাদের পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাজন বন সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝেন লুলা। কারণ, এর আগে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তিনি তা করে দেখিয়েছেন।’

আমাজনকে রক্ষার দাবিতে সোচ্চার সংগঠন আমাজন ওয়াচের প্রকল্প পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান পয়রিয়ের বলেন, ‘লুলা যা বলছেন এবং তাঁর পূর্ববর্তী কর্মের যে রেকর্ড রয়েছে, তাতে বলা যায় তিনি বলসোনারো সরকারের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডগুলোর প্রভাব দূর করবেন।’

তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লুলা দায়িত্ব নেওয়ার পরও কিছু পরিমাণে বন উজাড় চলতে পারে। কারণ, আইনিব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে কার্যকর করতে কিছু সময় লেগে যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক জলবায়ুবিষয়ক ওয়েবসাইট কার্বন ব্রিফের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লুলা যদি তাঁর আগের মেয়াদের মতো করে বন উজাড়ের হার কমাতে পারেন, তাহলে আগামী দশকে বন উজাড়ের হার ৯০ শতাংশ কমে যাবে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্য দিয়ে আমাজন জঙ্গলের ৭৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি জায়গা সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ভক্স, বিজনেস ইনসাইডার