আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার
ভেনেজুয়েলার তেলে ১০০ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, কার লাভ, কার ক্ষতি
ভেনেজুয়েলার বিপুল জ্বালানি তেল ভান্ডারের বড় একটি অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির জ্বালানিসম্পদ ‘ফিরিয়ে নেবে’ যুক্তরাষ্ট্র।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ তাঁর সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছেন। চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলায় প্রমাণিত ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল মজুতের ওপর ‘সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ’ পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
চুক্তিটির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, চুক্তিতে ভেনেজুয়েলার ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত থাকছে। জ্বালানি তেল উত্তোলনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে।
ট্রাম্পের ঘোষণা করা জ্বালানি তেলের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ কারণে কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাঙা করার অংশ হিসেবে ট্রাম্প জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য পরিমাণ বড় করে দেখিয়েছেন।
দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এইমাত্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। বিশ্বের ইতিহাসের এটা সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল চুক্তি।’
চুক্তিটির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কী জানা গেল? নতুন এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র আর ভেনেজুয়েলার সম্পর্কই-বা কোনদিকে যেতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তরসহ আরও কিছু বিষয় এ ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
কী পরিমাণ তেল নিয়ে চুক্তি
চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলায় মজুতের ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল রয়েছে। দেশটিতে জ্বালানি তেলের প্রমাণিত মজুতের প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ এটি।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল মজুত ছিল। এটি বিশ্বে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত মজুত।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ ভেনেজুয়েলায় রয়েছে বলেও ধারণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র এইমাত্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। বিশ্বের ইতিহাসের এটা সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল চুক্তি।
ট্রাম্পের ঘোষণা করা ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেলের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ কারণে কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাঙা করার অংশ হিসেবে ট্রাম্প জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য পরিমাণকে বড় করে দেখিয়েছেন।
এ বিষয়ে জ্বালানি তেলের বাজারবিষয়ক গবেষক রোরি জনস্টন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে বলেন, ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের সংখ্যাটি বিভ্রান্তিকর। চুক্তির আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো প্রায় পুরোপুরি অজানা।
রোরি জনস্টন আরও বলেন, এটি এমন একটি বড় সংখ্যা, ট্রাম্প সহজেই প্রচারে ব্যবহার করতে পারবেন ও ভবিষ্যতেও বারবার উল্লেখ করবেন।
মার্কিন তেল সরবরাহে প্রভাব
ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের মজুত ‘দ্বিগুণেরও বেশি’ বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রমাণিত জ্বালানি তেলের মজুত ক্রমেই কমছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি ব্যারেল।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) পরিচালনা করে। জরুরি পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে এটি ব্যবহার করা হয়। এ জরুরি মজুতও ফুরিয়ে আসছে। সর্বোচ্চ প্রায় ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতার সংরক্ষণাগারগুলোয় বর্তমানে ২৮ কোটি ৯৭ লাখ ব্যারেল তেল মজুত আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে করা চুক্তি মার্কিন জ্বালানি তেলের মজুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।
চুক্তির নেপথ্যের ঘটনাবলি
২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
তখন ভেনেজুয়েলায় নেতৃত্বে ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। ২০১৩ সাল থেকে সমাজতান্ত্রিক এ রাজনীতিবিদ ভেনেজুয়েলা শাসন করছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘বিতর্কিত নির্বাচন’ আয়োজন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ট্রাম্প অভিযোগ করতেন, মাদুরো মাদক কারবারিদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন। অন্যদিকে মাদুরোর অভিযোগ ছিল, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্প হস্তক্ষেপ করছেন।
গত ৩ জানুয়ারি ট্রাম্প-মাদুরোর বিরোধ চরমে পৌঁছায়। ওই দিন ভোরে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করে এনে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে রাখার অভিযানে অনুমোদন দেন। সেই অনুযায়ী ‘সফল’ অভিযানও চালানো হয়।
মাদুরো এখন নিউইয়র্কে মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায়। অভিযানের পর ট্রাম্প মাদুরো সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে কারাকাসের সরকার পরিচালনায় সমর্থন দেন। এরপর শপথ নেন দেলসি।
ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয়, ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ভার ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ ওয়াশিংটন নেবে। সমালোচকেরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের দাবি পূরণে রাজি করাতে রদ্রিগেজের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে।
গত জানুয়ারিতে দ্য আটলান্টিক সাময়িকীকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তিনি (রদ্রিগেজ) যদি সঠিকভাবে কাজ করতে না পারেন, তবে তাঁকে খুব বড় মূল্য চোকাতে হবে। সম্ভবত সেটা মাদুরোর চেয়েও বড় হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে করা চুক্তি মার্কিন জ্বালানি তেলের মজুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।
ট্রাম্পের দাবি কী ছিল
বিশ্লেষকদের অনেকে সমালোচনা করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ অবৈধ। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর নিজেদের দাবিকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
৩ জানুয়ারির অভিযানের আগে ট্রাম্প ও তাঁর মিত্ররা বারবার দাবি করছিলেন, ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল যুক্তরাষ্ট্রেরই প্রাপ্য। এর পেছনে তাঁরা দেশটিতে তেল অনুসন্ধানের প্রাথমিক ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন।
বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তেলসম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার বিষয়ে ভেনেজুয়েলা সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করেন ট্রাম্প ও তাঁর মিত্ররা। জীবাশ্ম জ্বালানি খাত জাতীয়করণের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছিল লাতিন আমেরিকার দেশটি।
এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার চারপাশে অবরোধ আরোপ করেন। লক্ষ্য ছিল, দেশটি থেকে জ্বালানি তেল রপ্তানিতে লাগাম টানা। ভেনেজুয়েলার রপ্তানি পণ্যগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে জ্বালানি তেল।
নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তেলক্ষেত্র ‘চুরি করেছে’ ভেনেজুয়েলা।
ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল শিল্পের জাতীয়করণকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পদ চুরির সবচেয়ে বড় নথিভুক্ত ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। যদিও আন্তর্জাতিক আইনে কোনো দেশের নিজের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিজস্ব ‘স্থায়ী সার্বভৌমত্ব’ রয়েছে।
এখনই চুক্তির ঘোষণা কেন
ইরানে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ যুদ্ধ শুরুর পর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ জ্বালানি তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাস এ প্রণালি দিয়ে অবাধে পরিবহন করা হতো।
হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়েছে। আসছে নভেম্বরে দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগে গত সপ্তাহে আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ) জানায়, চলতি আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন ভোক্তাদের প্রতি গ্যালন (প্রায় ৩ দশমিক ৮ লিটার) পেট্রলের জন্য গড়ে ৪ ডলারের বেশি দিতে হচ্ছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ এখনো চলছে। যুদ্ধও চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেল সরবরাহের ওপরও চাপ তৈরি করেছে।
ট্রাম্প যেভাবে চুক্তিটি তুলে ধরছেন
দেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বাধীন ভেনেজুয়েলাকে ট্রাম্প বারবার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। ইরানের মতো বিদেশি প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করতে চায়, ভেনেজুয়েলাকে সেটার মডেল হিসেবেও দেখাচ্ছেন তিনি।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেলের ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণকে মার্কিন অর্থনীতির জন্য লাভজনক হিসেবে তুলে ধরছেন ট্রাম্প।
এ মাসে লাস ভেগাসে এক সমাবেশে নিজ সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় আমরা দারুণ করছি। আমরা দেশটি থেকে প্রচুর জ্বালানি তেল নিচ্ছি। তাঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও দারুণ।’ এরপর ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা থেকে ‘যা নেওয়া হয়েছে, সেটা দিয়েই’ দেশটির বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের খরচ’ মেটানো হয়েছে।
শুক্রবার নতুন চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়বে। এতে সব মার্কিনের জন্য জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নতুন তেল চুক্তিকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুবিও লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাহসী পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে আমেরিকা ফার্স্ট নীতির সাফল্য এনে দিচ্ছে, এটা সেটাই প্রমাণ করে।’
রুবিওর ভাষ্য, চুক্তিটির ফলে পশ্চিম গোলার্ধে (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু অংশ) যুক্তরাষ্ট্র স্থিতিশীল জ্বালানি তেলের মজুত গড়তে ও কম দামে জ্বালানি তেল নিশ্চিত করতে পারবে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম কমবে। এ চুক্তি ভেনেজুয়েলার জন্যও লাভজনক হবে। দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়াবে।
দেলসি রদ্রিগেজের প্রতিক্রিয়া
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজও এ চুক্তিকে তাঁর সরকারের জন্য একটি সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় রদ্রিগেজ চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, এটি ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
রদ্রিগেজ আরও লেখেন, এ চুক্তির ফলে বিনিয়োগের বড় প্রবাহ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে হাইড্রো-কার্বনশিল্পের উন্নয়নে কৌশলগত অবকাঠামো পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে।
দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকটে ভুগছে ভেনেজুয়েলা। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ২০১৪ সাল থেকে ‘রাজনৈতিক দমন–পীড়ন’ ও আর্থিক সংকটে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছেন।
সমালোচকেরা আর্থিক সংকটের জন্য সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় শিল্প খাতের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। তেল ও খনিশিল্পও এর মধ্যে রয়েছে। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ টানার উদ্যোগ নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অনুরোধে তিনি এ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। রদ্রিগেজ সরকারের হিসাবে, শুক্রবারের চুক্তি থেকে ভেনেজুয়েলা ২০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার কর পাবে। পাশাপাশি ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ আসবে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রদ্রিগেজের সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেলসম্পদ ১০০ বছরের জন্য ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে।
সমালোচকেরা যা বলছেন
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপের দীর্ঘদিনের ইতিহাস রয়েছে। ট্রাম্পও পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় জোর দিচ্ছেন। এ নীতিকে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
সমালোচকেরা চুক্তিটিকে ভেনেজুয়েলার সম্পদ দখলের চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের মতে, ঔপনিবেশিক যুগে পশ্চিমা শক্তিগুলো যেভাবে সম্পদ দখল করত, এ চুক্তির সঙ্গে সেটার মিল রয়েছে।
চুক্তির বিষয়ে ঘোষণা আসার কিছুক্ষণ আগে জ্বালানিবিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ সম্ভাব্য চুক্তিটির সঙ্গে ২০ শতকের শুরুর দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চাওয়া তেলসুবিধার তুলনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘এমন ঘটনার কোনো নজির নেই।’
এ বিশ্লেষকের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইরাক ও ইরানের জ্বালানি তেলের মজুতের মালিকানা দাবি করেছিল ব্রিটিশ সরকার। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের ওই ঘটনার সঙ্গে এ চুক্তির ঘটনা বেশ কাছাকাছি।
ট্রাম্প নিজেও ঔপনিবেশিক যুগের ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ ধারণা গ্রহণ করেছেন। তাঁর পরিকল্পনায় এক বড় লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ বাড়ানো ও ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করা।