ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রথম দফার ফলাফল কী বার্তা দিচ্ছে, কে হতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট

লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা (বাঁয়ে) ও ফ্লাভিও বলসোনারোছবি: এএফপি

ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছেন ডানপন্থী প্রার্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। তিনি ক্ষমতাসীন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছেন। ফলে চলতি মাসের শেষ দিকে দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফার ভোট হতে যাচ্ছে।

গত রোববার রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের ফ্লাভিও বলসোনারো বলেন, ‘ব্রাজিল পরিবর্তন চায়। আর এই ফলাফলে আমি খুবই খুশি।’

ফ্লাভিও একই সঙ্গে ‘লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির শাসনের যুগের অবসান’ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।

৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। ২৫ অক্টোবর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় ভোট গ্রহণ হবে। সেখানে ৮০ বছর বয়সী লুলার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ফ্লাভিও।

৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারো দেশটির ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। আগামী ২৫ অক্টোবর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় ভোট গ্রহণ হবে। সেখানে ৮০ বছর বয়সী লুলার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ফ্লাভিও।

২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে যান জইর বলসোনারো। পরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে তাঁকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর লুলা চতুর্থবারের মতো (টানা নয়) ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য নির্বাচনে লড়ছেন।

গতকাল রোববার প্রথম দফার ভোটের আগে প্রকাশিত একাধিক জনমত জরিপে লুলা ও বলসোনারোর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। জরিপগুলোয় বলা হয়েছিল, ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট লুলা প্রায় ৩ শতাংশ ব্যবধানে জয়ী হতে পারেন।

আরও পড়ুন

কিন্তু জনমত জরিপের পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে চমক দেখিয়েছেন বলসোনারো। তিনি ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে লুলাকে পেছনে ফেলেছেন। লুলা পেয়েছেন ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ ভোট।

‘প্রথম দফার ভোটের পর তিনি (লুলা) শুধু পিছিয়েই পড়েননি, বরং অন্য প্রার্থীরা মোট প্রায় ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই মধ্যডানপন্থী। ফলে এসব প্রার্থীকে যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁদের লুলার দিকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
অলিভার স্টুয়েনকেল, ব্রাজিলের গেতুলিও ভারগাস ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক

তবে প্রথম দফাতেই জিততে প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট কেউই পাননি। ফলে চার বছর পর আবারও লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে লড়াই হতে যাচ্ছে। চার বছর আগে জইর বলসোনারোকে সামান্য ব্যবধানে হারিয়েছিলেন লুলা।

ব্রাজিলের নির্বাচনে ফ্লাভিওকে কেন এগিয়ে রাখা হচ্ছে

প্রথম দফা ভোটে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারে গতি আনতে পারে। ব্যবসাবান্ধব এই প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনায় ব্রাজিলের মুদ্রা ও শেয়ারবাজারে যে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, এই ফল তা আরও জোরালো করতে পারে।

গত জুন মাসে ৪৪ বছর বয়সী মিশেল বলসোনারোর সঙ্গে তাঁর সৎছেলে ফ্লাভিওর প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এর আগে কখনো সরকারি কোনো পদে না থাকা মিশেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ ভিডিও পোস্ট করে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে তাঁকে অসম্মান করার অভিযোগ তোলেন। পরে অবশ্য তাঁদের মধ্যে মিটমাট হয়ে যায়।

ব্রাজিলের সাও পাওলোতে গেতুলিও ভারগাস ফাউন্ডেশনের (এফজিভি) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক অলিভার স্টুয়েনকেল বলেন, লুলা কঠিন অবস্থায় পড়েছেন। কারণ, প্রথম দফায় অন্য ১০ প্রার্থীকে যাঁরা ভোট দিয়েছেন, দ্বিতীয় দফায় তাঁদের ভোট লুলা পাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।

স্টুয়েনকেল আল–জাজিরাকে বলেন, ‘প্রথম দফার ভোটের পর তিনি (লুলা) শুধু পিছিয়েই পড়েননি, বরং অন্যান্য প্রার্থী মোট প্রায় ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই মধ্যডানপন্থী। ফলে এসব প্রার্থীকে যারা ভোট দিয়েছেন, তাঁদের লুলার দিকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

তাই লুলাকে তাঁর নির্বাচনী কৌশল বদলাতে হবে বলে মনে করেন এই অধ্যাপক। স্টুয়েনকেল আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যাঁরা ভোট দিতে যাননি, তাঁদের একটি বড় অংশকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।’

‘অ্যান্টিপেটিসমো’ বা লুলার ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) বিরোধী মনোভাবের একটি প্রবণতা ব্রাজিলে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ক্ষমতায় উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।

প্রথম দফার ভোটে প্রায় ৩ কোটি ব্রাজিলীয় ভোট দেননি, যা মোট ভোটারের ২১ শতাংশ।

রিও ডি জেনিরো থেকে আল–জাজিরার মনিকা ইয়ানাকিয়েভ জানান, লুলার সমর্থকদের ধারণা, ডানপন্থী শিবিরের তুলনায় তাঁদের প্রার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ততটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেননি।

ইয়ানাকিয়েভ বলেন, ‘দ্বিতীয় দফার ভোটে তাঁদের এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে।’

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই প্রার্থীর ব্যানারের সামনে দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন একজন। ব্রাসিলিয়া, ব্রাজিল, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: এএফপি

তবে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এসব প্রচেষ্টায় নির্বাচনের ফলাফল বদলানোর সম্ভাবনা কম।

স্টুয়েনকেল বলেন, ‘আগামী তিন সপ্তাহে খুব অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে ফ্লাভিও বলসোনারোর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে ১৯৮৯ সালের পর প্রথম দফার ভোটে দ্বিতীয় হওয়া কোনো প্রার্থী শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি।’

বলসোনারো পরিবার কি ব্রাজিলের রাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে

ব্রাজিলের জাতীয় নির্বাচনের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বিভিন্ন নির্বাচনে বলসোনারো পরিবারের বেশ কয়েকজন রাজনীতিক জয় পেয়েছেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর স্ত্রী এবং ফ্লাভিওর সৎমা মিশেল বলসোনারো রাজধানী ব্রাসিলিয়ার ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।

গত জুনে ৪৪ বছর বয়সী মিশেল বলসোনারোর সঙ্গে তাঁর সৎছেলে ফ্লাভিওর প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এর আগে কখনো সরকারি কোনো পদে না থাকা মিশেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ ভিডিও পোস্ট করে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে তাঁকে অসম্মান করার অভিযোগ তোলেন। পরে অবশ্য তাঁদের মধ্যে মিটমাট হয়ে যায়।

জইর বলসোনারোর দ্বিতীয় ছেলে ৪৩ বছর বয়সী কার্লোস বলসোনারো দক্ষিণাঞ্চলীয় সান্তা কাতারিনা অঙ্গরাজ্যের সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এবার সিনেট নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন।

জইর বলসোনারোর চতুর্থ ও ছোট ছেলে জইর রেনান বলসোনারো কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

আরও পড়ুন

কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতে, ‘অ্যান্টিপেটিসমো’ বা লুলার ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) বিরোধী মনোভাবের একটি প্রবণতা ব্রাজিলে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ক্ষমতায় উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।

বলসোনারোর লিবারেল পার্টি (পিএল) কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ চেম্বার অব ডেপুটিজের ৫১৩টি আসনের মধ্যে ১২১টি পেয়েছে। আর লুলার ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) পেয়েছে ৭০টি আসন।

ফ্লাভিও বলসোনারো জিতলে কী প্রভাব পড়তে পারে

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

সাও পাওলো থেকে আল–জাজিরার লুসিয়া নিউম্যান বলেন, লুলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ‘সংঘাতের পথে’ রয়েছেন। ট্রাম্প বলসোনারো শিবিরের প্রকাশ্য ও জোরালো সমর্থক।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর স্ত্রী মিশেল বলসোনারো। ব্রাসিলিয়া, ব্রাজিল, ৪ অক্টোবর ২০২৬।

নিউম্যান বলেন, ‘এর ফলে ব্রাজিল রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ওয়াশিংটন ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে এসব ক্ষেত্রেই ব্রাজিল একটি শক্তিশালী দেশ।’

বলসোনারোরা যে ধরনের রাজনীতি করেন, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও চীনের সঙ্গে ব্রাজিলের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। চীন দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।

বলসোনারো ট্রাম্পকে মিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং নির্বাচিত হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

জিতলে ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর বাবার জন্য কংগ্রেসে সাধারণ ক্ষমার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রে ভূমিকার রাখার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে জইর বলসোনারো কারাগারে রয়েছেন। এ ধরনের ক্ষমার প্রস্তাব কার্যকর করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের অনুমোদন লাগবে। বর্তমানে উভয় কক্ষেই রক্ষণশীলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

আরও পড়ুন