ফিরে দেখা
একটি নীল পোশাক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের জন্য বিপদ ডেকে আনল
১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিশংসন তদন্ত শুরু হয়। মনিকা লিউনস্কি নামে হোয়াইট হাউসের এক ইন্টার্নকে ঘিরে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। তবে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও ১৯৯৯ সালে সিনেটের বিচারে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তিনি চূড়ান্তভাবে খালাস পান এবং নিজের মেয়াদ শেষ করেন। মার্কিন রাজনীতিতে তোলপাড় তোলা এ ঘটনা নিয়ে প্রথম আলোর আজকের আয়োজন।
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে সেদিন তুমুল উত্তেজনা, আলোচনা হচ্ছে এমন এক প্রেসিডেন্টকে নিয়ে, যিনি দুই বছরের কম সময় আগে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন। দেশের অর্থনীতি ভালো চলছে। জনমত জরিপেও তাঁর কাজের প্রতি সমর্থন বেশ উঁচুতে। অথচ ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনা তাঁকে টেনে এনেছে এমন এক জায়গায়, যেখানে কোনো প্রেসিডেন্ট কখনো যেতে চান না।
দিনটি ছিল ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে এমন একটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিশংসন তদন্তের পথ খুলে গিয়েছিল।
রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধি পরিষদে রেজোল্যুশনটি সেদিন ২৫৮–১৭৬ ভোটে অনুমোদন পেয়েছিল।
রিপাবলিকান সদস্যদের পাশাপাশি ৩১ জন ডেমোক্র্যাটও অভিশংসন তদন্তের পক্ষে ভোট দেন।
প্রতিনিধি পরিষদের সিদ্ধান্ত ছিল—প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে অভিশংসন করার মতো যথেষ্ট সাংবিধানিক ভিত্তি আছে কি না, বিচার বিভাগীয় কমিটি তা পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্ত করবে।
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ অভিশংসন অনুসন্ধান। এ ঘটনায় দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের শিরোনাম ছিল ‘অভিশংসন তদন্ত অনুমোদিত’।
কেন এই তদন্ত
প্রতিনিধি পরিষদে সেদিন সেই ভোটের আয়োজনের পেছনে ছিল কয়েক মাস ধরে চলা এক রাজনৈতিক ও আইনি কেলেঙ্কারি। কেন্দ্রীয় চরিত্র হোয়াইট হাউসের সাবেক ইন্টার্ন মনিকা লিউনস্কি। ঘটনার শুরু গোপন এক সম্পর্ক ঘিরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল একজন প্রেসিডেন্ট সত্য বলার শপথ নিয়ে মিথ্যা বলেছেন কি না, সেই প্রশ্নে।
একই সঙ্গে আরও কিছু প্রশ্নও উঠেছিল—প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কি বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং যদি করে থাকেন তাহলে তাঁর এসব আচরণ কি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী তাঁকে পদচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট?
হোয়াইট হাউসে মনিকা লিউনস্কি
১৯৯৫ সালের জুনে ২১ বছর বয়সী মনিকা লিউনস্কি হোয়াইট হাউসে অবৈতনিক ইন্টার্ন হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে বছরের নভেম্বরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শুরু হয় বলে পরে তদন্তে উঠে আসে।
১৯৯৬ সালে মনিকাকে হোয়াইট হাউস থেকে পেন্টাগনে বদলি করা হয়। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় সরকারি কর্মচারী লিন্ডা ট্রিপের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে মনিকা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা লিন্ডাকে বলতে শুরু করেন।
এরপর ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। লিন্ডা গোপনে তাঁদের ফোনালাপ রেকর্ড করতে শুরু করেন। সেখানে মনিকা প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছিলেন।
কিন্তু বিষয়টি শুধু ওই সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৎকালীন আরেকটি মামলা মনিকা লিউনস্কির নাম আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসে। সেটি ছিল পলা জোনসের করা যৌন হয়রানির মামলা।
আরকানসাসের সাবেক সরকারি কর্মচারী পলা জোনস প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করেছিলেন। তিনি তাঁর অভিযোগে উল্লেখ করেন, ১৯৯১ সালের মে মাসে আরকানসাসের গভর্নর থাকাকালে ক্লিনটন তাঁকে যৌন হয়রানি করেছিলেন।
সেই মামলার আইনজীবীরা ক্লিনটনের অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছিলেন। সেখানেই উঠে আসে মনিকার নাম।
১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে জোনসের আইনজীবীরা মনিকাকে আদালতের মাধ্যমে ডেকে পাঠান। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে মনিকা একটি হলফনামায় ক্লিনটনের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেন। একই মামলায় ১৭ জানুয়ারি সত্য বলার শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ক্লিনটনও ইন্টার্ন মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেন।
এখান থেকেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি রূপ নিতে থাকে সম্ভাব্য মিথ্যা সাক্ষ্য ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার প্রশ্নে।
গোপন টেপ থেকে কেনেথ স্টারের তদন্তে নতুন মোড়
লিন্ডা ট্রিপের রেকর্ড করা কথোপকথনই শেষ পর্যন্ত পুরো কেলেঙ্কারিকে নতুন মোড় দেয়। ১৯৯৮ সালের ১২ জানুয়ারি লিন্ডা ট্রিপ স্বাধীন কৌঁসুলি কেনেথ স্টারের দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্টার তখন হোয়াইটওয়াটারসহ (আরকানসাসে ক্লিনটন ও তাঁর স্ত্রী হিলারির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পুরোনো রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক লেনদেনের ঘটনা) ক্লিনটন-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয় নিয়ে তদন্ত করছিলেন। ট্রিপের দেওয়া তথ্যে এমন ইঙ্গিত ছিল যে মনিকাকে সত্য গোপন করতে উৎসাহিত করা হয়ে থাকতে পারে।
১৩ জানুয়ারি এফবিআইয়ের সহযোগিতায় লিন্ডা শরীরে রেকর্ডিং যন্ত্র নিয়ে মনিকার সঙ্গে দেখা করেন। ১৬ জানুয়ারি স্টারের তদন্তের এখতিয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়। অর্থাৎ তিনি এখন মনিকাকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল কি না, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কোনো ফেডারেল আইন ভঙ্গ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পারবেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বড় বড় শিরোনামে খবর প্রকাশ পেতে থাকে। চারদিকে তুমুল হইচই শুরু হয়ে যায়।
২৬ জানুয়ারি জনসমক্ষে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন দৃঢ়ভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর সেই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বহুল উদ্ধৃত বাক্যগুলোর একটি হয়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, মনিকার সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক ছিল না এবং তিনি কাউকে মিথ্যা বলতে বলেননি।
কিন্তু প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের পরও কেনেথ স্টারের তদন্ত থামেনি।
মনিকা লিউনস্কির চাকরি পাওয়ার চেষ্টা, প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সচিব বেটি কারির ভূমিকা, উপহার সরানো হয়েছিল কি না, পলা জোনস মামলায় সাক্ষ্য প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না—একটির পর একটি প্রশ্ন তদন্তকারীদের সামনে আসে।
জুলাইয়ের শেষে মনিকা কৌঁসুলি স্টারের দপ্তরের সঙ্গে দায়মুক্তি ও সহযোগিতার চুক্তি করেন। এরপর ৬ আগস্ট তিনি গ্র্যান্ড জুরির সামনে সাক্ষ্য দেন।
এ পর্যায়ে ক্লিনটনের আগের অস্বীকার আরও বড় আইনি সমস্যায় পরিণত হয়।
মনিকার নীল পোশাক এবং ক্লিনটনের স্বীকারোক্তি
লিন্ডা ট্রিপের সঙ্গে ফোনালাপের সময় মনিকা লিউনস্কি তাঁর একটি গাঢ় নীল রঙের পোশাকের কথা বলেছিলেন। পরে মনিকা তদন্তকারীদের বলেন, একবার বিল ক্লিনটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাক্ষাতের সময় তাঁর পরনে ওই পোশাকটি ছিল এবং সেটিতে দাগ লেগেছিল। লিন্ডা ট্রিপ তাঁকে পোশাকটি না ধুতে বলেছিলেন। পরে তদন্তকারীরা পোশাকটি নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেন।
প্রথম পরীক্ষায় দাগটি মানুষের বীর্য বলে শনাক্ত হয়। এরপর তদন্তকারীরা প্রেসিডেন্টের রক্তের নমুনা চান। হোয়াইট হাউসে ক্লিনটনের কাছ থেকে রক্তের নমুনা নেওয়া হয়।
এফবিআই পোশাকে লেগে থাকা বীর্যের নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে এবং ক্লিনটনের রক্তের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। পরীক্ষার ফল তদন্তকারীদের হাতে এমন প্রমাণ এনে দেয়, যা ক্লিনটনের সঙ্গে মনিকা লিউনস্কির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বক্তব্যকে শক্তিশালী করে।
এর মধ্যেই ১৭ আগস্ট ক্লিনটন নিজে গ্র্যান্ড জুরির সামনে সাক্ষ্য দেন।
সেই রাতে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেখানে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে তাঁর ‘অনুপযুক্ত’ সম্পর্ক ছিল। তিনি বক্তব্যে ‘অনুপযুক্ত’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
ক্লিনটন বিষয়টিকে নিজের বিচারবুদ্ধির গুরুতর ব্যর্থতা এবং ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, জানুয়ারিতে দেওয়া তাঁর বক্তব্য আইনগত সংজ্ঞা অনুযায়ী মিথ্যা ছিল না।
আর এখানেই একজন দায়িত্বরত প্রেসিডেন্ট বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছেন কি না, সেই প্রশ্ন থেকে তিনি সেই সম্পর্ক লুকাতে গিয়ে সত্য বলার শপথ নিয়ে মিথ্যা বলেছেন কি না এবং বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেছিলেন কি না—সেই প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে।
কেনেথ স্টারের তদন্ত প্রতিবেদন পৌঁছাল কংগ্রেসে
১৯৯৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কেনেথ স্টার তাঁর তদন্ত প্রতিবেদন এবং বিপুল পরিমাণ সহায়ক নথি প্রতিনিধি পরিষদের কাছে পাঠান।
স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের আচরণ অভিশংসনের সম্ভাব্য ভিত্তি তৈরি করেছে। সেখানে সত্য বলার শপথ নিয়ে মিথ্যা বলা, গ্র্যান্ড জুরির সামনে মিথ্যা বক্তব্য, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা, সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগ তোলা হয়।
কয়েক দিন পর প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। সেই সঙ্গে মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে যৌন সম্পর্কের অত্যন্ত বিস্তারিত বিবরণও প্রকাশ করা হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। সংবাদমাধ্যমগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে এ বিষয়ে খবর প্রকাশ পেতে থাকে।
কংগ্রেসের সামনে তখন দুটি প্রশ্ন।
প্রথমত, একজন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ও নৈতিক স্খলন কি তাঁকে অভিশংসনের জন্য যথেষ্ট কারণ হয়ে উঠতে পারে?
দ্বিতীয়ত, যদি তিনি আদালতে বা গ্র্যান্ড জুরির সামনে মিথ্যা বলে থাকেন, তাহলে সেটি কি সংবিধানের ‘গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণ’–এর পর্যায়ে পড়ে কি না।
এই বিতর্কের মধ্যেই ৫ অক্টোবর প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগীয় কমিটি ২১–১৬ ভোটে পূর্ণাঙ্গ অভিশংসন অনুসন্ধান শুরুর সুপারিশ করে।
৮ অক্টোবর ১৯৯৮ কী ঘটেছিল
প্রতিনিধি পরিষদ এদিন ‘হাউস রেজোল্যুশন ৫৮১’ অনুমোদন দিয়ে বিচার বিভাগীয় কমিটিকে তদন্ত চালানোর ক্ষমতা দেয়। লক্ষ্য ছিল, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে অভিশংসন করার মতো ‘যথেষ্ট ভিত্তি’ আছে কি না, তা পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা।
প্রস্তাবটি ২৫৮–১৭৬ ভোটে পাস হয়। রিপাবলিকানদের পাশাপাশি ৩১ জন ডেমোক্র্যাটও এর পক্ষে ভোট দেন।
অনুসন্ধানটি সীমিত পরিসরের হবে, নাকি বিস্তৃত—এ নিয়েও দুই দলের মধ্যে বিরোধ ছিল।
ডেমোক্র্যাটদের অনেকে তদন্তের সময়সীমা ও বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট করার পক্ষে ছিলেন। রিপাবলিকান নেতৃত্ব তুলনামূলক বিস্তৃত অনুসন্ধান চেয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত যে প্রস্তাব গৃহীত হয়, তা বিচার বিভাগীয় কমিটিকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়। কমিটি চাইলে সাক্ষী তলব, নথিপত্র সংগ্রহ এবং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের সাংবিধানিক ভিত্তি আছে কি না, তা পরীক্ষা করার ক্ষমতা পায়।
এর আগপর্যন্ত ক্লিনটন-মনিকার ঘটনা মূলত বিশেষ কৌঁসুলির তদন্ত এবং রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় ছিল। ৮ অক্টোবরের পর সেটি সরাসরি কংগ্রেসের অভিশংসনপ্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যায়।
যদিও সে সময় জনমতের বড় অংশ প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে সরিয়ে দেওয়ার বিপক্ষে ছিল।
৭ অক্টোবর প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে করা একাধিক জাতীয় জরিপে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ক্লিনটনের অভিশংসন ও অপসারণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
স্বামীর পক্ষে শক্ত অবস্থানে হিলারি ক্লিনটন
ঘটনার শুরু থেকেই ফার্স্ট লেডি হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটনের অবস্থান ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ার পর হিলারি স্বামীর পাশে দাঁড়ান। ২৭ জানুয়ারি এনবিসির একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিলারি স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পেছনে একটি ‘ব্যাপক ডানপন্থী ষড়যন্ত্রের’ কথা বলেছিলেন।
হিলারি এ–ও বলেছিলেন, তাঁর বিশ্বাস, তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ধোপে টিকবে না।
কিন্তু আগস্টে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৭ আগস্ট বিল ক্লিনটন নিজেই স্বীকার করেন, লিউনস্কির সঙ্গে তাঁর অনুপযুক্ত সম্পর্ক ছিল। একই ভাষণে তিনি বলেন, তিনি নিজের স্ত্রীসহ অন্যদের বিভ্রান্ত করেছিলেন।
ফলে স্বামীর পক্ষে হিলারির দৃঢ় অবস্থান নতুন আলোচনায় আসে।
সে সময় এত কিছু সত্ত্বেও হিলারি প্রকাশ্যে স্বামীর পাশেই থেকেছেন। ব্যক্তিগতভাবে এ ঘটনা তাঁদের দাম্পত্যে চাপ সৃষ্টি করেছিল বলে জানা যায়। তবে স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের ওই সংকটময় সময়ে তিনি ফার্স্ট লেডির দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।
পরবর্তী সময়ে হিলারির রাজনৈতিক জীবনেও এ ঘটনার বিস্তৃত প্রভাব দেখা গেছে।
সে সময়ে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা
বিল ক্লিনটন-মনিকা লিউনস্কি ঘটনা ছিল ১৯৯৮ সালের সবচেয়ে বেশি আলোচিত সংবাদগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের বড় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রায় প্রতিদিনই তদন্ত, গ্র্যান্ড জুরির সাক্ষ্য, স্টারের কর্মকাণ্ড এবং কংগ্রেসের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে খবর প্রকাশ করছিল।
শুরুর দিকে সংবাদ প্রতিবেদনের কেন্দ্র ছিল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মনিকা লিউনস্কিকে জড়িয়ে যে সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে, সেটি সত্য কি না। ক্লিনটনের অস্বীকার এবং মনিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঘিরে একের পর এক নতুন তথ্য প্রকাশ পাচ্ছিল।
কিন্তু স্টারের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংবাদ প্রতিবেদনের ধরনও বদলে যায়। তখন প্রধান প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল—ক্লিনটন সত্য বলার শপথ নিয়ে মিথ্যা বলেছিলেন কি না এবং সেটি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁকে অভিশংসনের জন্য যথেষ্ট গুরুতর কি না।
সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ভূমিকা নিয়েও সে সময় বিতর্ক ছিল।
স্টারের ৪৫৩ পাতার তদন্ত প্রতিবেদনে মনিকার সঙ্গে ক্লিনটনের যৌন সম্পর্কের অত্যন্ত বিস্তারিত বর্ণনা থাকায় সংবাদপত্রগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল—কতটুকু ছাপা হবে এবং কীভাবে তা উপস্থাপন করা হবে। বড় অনেক সংবাদপত্র প্রতিবেদনটির বড় অংশ বা প্রায় সম্পূর্ণ অংশ নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছিল।
৮ অক্টোবরের ভোটের খবরও প্রধান শিরোনাম হয়। সংবাদ প্রতিবেদনে বারবার এ ঘটনার সঙ্গে অন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনার তুলনা করা হয়। বলা হয়, রিচার্ড নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি যুগের পর আবার একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিশংসন তদন্ত শুরু হয়েছে।
তবে সংবাদমাধ্যমের সব প্রতিবেদন ক্লিনটনবিরোধী ছিল না। কেনেথ স্টারের তদন্তের পরিধি, তদন্তের তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁসের অভিযোগ এবং তাঁর তদন্ত পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেও অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ পায়।
জনসাধারণের মধ্যেও এ ঘটনায় অতিরিক্ত সংবাদ প্রকাশ নিয়ে বিরক্তি ছিল। ডিসেম্বরে পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জরিপে ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছিলেন, সংবাদমাধ্যম অভিশংসনের বিষয়টিতে অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে।
অর্থাৎ ঘটনাটি যেমন প্রেসিডেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল, একইভাবে সংবাদমাধ্যম, বিশেষ কৌঁসুলি এবং কংগ্রেসের ভূমিকাও জনপরিসরে পরীক্ষার মুখে পড়েছিল।
শেষ পর্যন্ত বিল ক্লিনটন কি অভিশংসিত হয়েছিলেন
৮ অক্টোবরের ভোটের প্রায় আড়াই মাস পর প্রতিনিধি পরিষদে বিল ক্লিনটন সত্যি সত্যিই অভিশংসিত হন। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৯৮ প্রতিনিধি পরিষদ তাঁর বিরুদ্ধে দুটি অভিশংসন অনুচ্ছেদ অনুমোদন করে।
প্রথম অভিযোগ ছিল—ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরির সামনে শপথ নিয়ে মিথ্যা বলা।
দ্বিতীয়টি ছিল—বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া।
প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হওয়ার অর্থ অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্টের পদচ্যুতি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় প্রতিনিধি পরিষদ অভিযোগ আনে; তারপর সিনেটে বিচার হয়। প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণ করতে সিনেটে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট প্রয়োজন হয়।
সিনেটে ক্লিনটনের বিচার শুরু হয় ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে। ১২ ফেব্রুয়ারি সিনেটে চূড়ান্ত ভোট হয়। কোনো অভিযোগেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পাওয়া যায়নি। ফলে ক্লিনটন খালাস পান এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ করেন। সিনেটের সরকারি নথিতে ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯-এর চূড়ান্ত বিচার-সংক্রান্ত ভোটগুলো সংরক্ষিত রয়েছে।
জনমত ও মার্কিন রাজনীতিতে এর যে প্রভাব রেয়ে গেছে
ক্লিনটনের অভিশংসন সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈপরীত্য ছিল—তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে মানুষের অসন্তোষ থাকলেও অধিকাংশ মার্কিন তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরানোর পক্ষে ছিলেন না।
স্টারের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেপ্টেম্বরে পিউ রিসার্চ সেন্টারের তিনটি জরিপে প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ মানুষ অভিশংসনের বিরোধিতা করছিলেন। তাঁদের কাছে ক্লিনটনের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি দুর্বল হলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর কাজের অনুমোদন তুলনামূলকভাবে শক্ত ছিল।
প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন তদন্ত চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারায়। কিন্তু ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বরের ভোটে ডেমোক্র্যাটরা উল্টো পাঁচটি আসন বাড়ায়।
ভোটের এই ফলাফলে রিপাবলিকানদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়। অভিশংসন তদন্তের মধ্যেও যে ক্লিনটনের প্রতি জনসমর্থন ভেঙে পড়েনি, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে তা প্রমাণিত হয়। কেউ কেউ বরং অভিশংসন তদন্তের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথাও বলেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অন্য প্রেসিডেন্টদের অভিশংসন বিতর্কেও ক্লিনটনের ঘটনা বারবার তুলনা হিসেবে ফিরে এসেছে।
একটি গোপন সম্পর্ক থেকে শুরু হওয়া ঘটনা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত নৈতিকতা, আইনের শাসন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা, দলীয় রাজনীতি, সংবাদমাধ্যম এবং অভিশংসনের সাংবিধানিক সীমা—সবকিছুকে একসঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল।
তথ্যসূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, পিউ রিসার্চ সেন্টার, ইমপিচমেন্ট ট্রায়াল অব প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম জেফারসন ক্লিনটন, ইউএস গভর্নমেন্ট পাবলিশিং অফিস–জিপিও