২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ট্রাম্প প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ অবস্থায় এফবিআইয়ের এ তল্লাশি অভিযানের আইনি গুরুত্ব কতটুকু, এক বিশ্লেষণে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে সিএনএন। ওই বিশ্লেষণের মূল অংশ নিচে তুলে ধরা হয়েছে

কিসের ভিত্তিতে তল্লাশিপরোয়ানা জারি করে বিচার বিভাগ

তল্লাশি অভিযানের বিচারিক অনুমোদন পেতে তদন্তকারীদের বিচারকের কাছে একটি বিস্তারিত হলফনামা উপস্থাপন করতে হয়েছে, যাতে এটা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে। আর সেই অপরাধের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে সাম্প্রতিক দিনগুলোয় তাঁরা যেখানে অভিযান চালাতে চাইছেন।
তল্লাশিপরোয়ানা সিলগালা অবস্থায় দাখিল করা হয়েছিল। এর মানে পরোয়ানার বিস্তারিত এ মুহূর্তে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না (যদিও ভবিষ্যতে এটা প্রকাশ করা হবে)।

আদালতে মামলা নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন থেকে ওয়েস্ট পাম বিচের ফেডারেল কোর্ট হাউস মাত্র একটি সিলগালা করা তল্লাশিপরোয়ানার আবেদন নথিভুক্ত করেছে।

আইনবিশেষজ্ঞরা সিএনএনকে বলেন, তল্লাশি অভিযান চালাতে পরোয়ানা অনুমোদনে ম্যাজিস্ট্রেট জাজের কাছে প্রসিকিউটরদের আবেদনের আগে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তদন্তকারীদের সম্মতি আদায় করতে হয়। বিশেষ করে যেসব তদন্তের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে।

default-image

ট্রাম্পের আইনি ঝুঁকি কতটুকু

আইনজ্ঞদের মতে, সাবেক প্রেসিডেন্টের বাড়িতে তল্লাশিপরোয়ানা কার্যকর করতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার মানে ন্যাশনাল আর্কাইভস এর আগে মার-এ-লাগো থেকে যা উদ্ধার করেছে, তদন্তকারীরা তার চেয়েও বেশি কিছু খুঁজছেন।

জানুয়ারিতে মার-এ-লাগো থেকে ১৫টি বাক্স পুনরুদ্ধার করে ন্যাশনাল আর্কাইভস। এতে এমন কিছু উপাদান ছিল, যাকে অতি গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বসন্তকাল থেকে এ পর্যন্ত এসব বাক্স ঘিরে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

এফবিআইয়ের সাবেক উপপরিচালক ও সিএনএনের প্রদায়ক অ্যান্ড্রু ম্যাককেইব বলেন, ‘আমি আসলেই বিশ্বাস করি না যে ইতিমধ্যে তারা পেয়ে গেছে—এমন তথ্যের জন্য গোয়েন্দা বিভাগ প্রেসিডেন্টের বাসায় তল্লাশি পরোয়ানা চেয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সন্দেহ ও উদ্বেগ থাকারই কথা। এমনকি সুনির্দিষ্ট তথ্যও থাকতে পারে, যা তাদের বিশ্বাস জুগিয়েছে, আরও কিছু উপাদান আছে, যা এখনো হাতে আসেনি।’

গত সোমবারের তল্লাশির আগে ট্রাম্পের আইনি বিপদ নিয়ে জনগণের মধ্যে গুঞ্জন ছিল মূলত প্রেসিডেনশিয়াল রেকর্ডস অ্যাক্ট ঘিরে। হোয়াইট হাউসে থাকার সময় ট্রাম্পের নথিপত্র ব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্তের অন্য পদক্ষেপগুলোর কারণে এ আইন সামনে আসে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর এ আইন পাস হয়।
এতে পরিষ্কার করে বলা আছে, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের সময়কার সুনির্দিষ্ট কিছু নথির মালিকানা চূড়ান্ত পর্যায়ে জনগণের, বিদায়ী প্রেসিডেন্টের নয়। তবে এটি কোনো ফৌজদারি অপরাধসংক্রান্ত আইন নয়। আইনটিকে তুলনামূলক নখদন্তহীন আইন হিসেবেই দেখা হয়।

একটি তদন্ত পরোয়ানা এবং এফবিআইয়ের যুক্ত হওয়া এটাই বোঝায়, এটা ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত। অন্য যেসব নথি সংরক্ষণ আইন আছে, সেগুলোয় ফৌজদারি দণ্ডের বিষয়টি যুক্ত আছে। যেমন গুপ্তচরবৃত্তি আইন। তবে এ মুহূর্তে বিষয়টি স্পষ্ট নয়, কোন ফৌজদারি আইনের অধীন বিচার বিভাগের এ তদন্ত চলছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের নথিপত্র ধ্বংস করা বা সরিয়ে নেওয়া, অতি গোপনীয় নথির অপব্যবহার ফৌজদারি অপরাধ। কোনো তদন্ত চলাকালে তথ্যের বিকৃতি ঠেকানোর উদ্দেশ্যে অন্যান্য ফেডারেল আইন রয়েছে।

এর আগে যেসব অতি গোপনীয় নথিপত্রসহ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনসম্পর্কিত কাগজপত্র ন্যাশনাল আর্কাইভস পুনরুদ্ধার করেছে, সেগুলো চেয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে তলবনামা জারি করেছিল বিভার বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এ তদন্তের অংশ হিসেবে মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদও করেছিল এফবিআই।

বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ‘লেভি ফায়ারস্টোন মিউজ’ ফার্মের পার্টনার ফায়ারস্টোন বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাদের যখন তদন্তকাজকে তল্লাশির পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়, ‘তখন হালকা সাজার চেয়েও সেখানে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকতে পারে’।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট কীভাবে নথিপত্র সামলেছেন, সে বিষয়ে দেওয়ানি মামলার পথে হাঁটেনি বিচার বিভাগ। তবে প্রেসিডেনশিয়াল রেকর্ডস অ্যাক্ট লঙ্ঘনের অভিযোগে ঠিক গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সাবেক হোয়াইট হাউসের কর্মী পিটার নাভারোর বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা করেছে বিচার বিভাগ।

default-image

এরপর কী

এফবিআইয়ের সোমবারের অভিযান নিয়ে ট্রাম্পের আইনজীবীরা কতটা সতর্ক ছিলেন, তা এখনো জানা যায়নি। তদন্তকারীদের সঙ্গে নথিপত্র সামলানো নিয়ে আগের আলাপগুলোর বিষয়ে ট্রাম্পের আইনজীবীরা বিচার বিভাগের কাছে কী যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছেন, সেটাও জানা যায়নি।

এফবিআই যেভাবে তল্লাশিকাজটা চালিয়েছে, তা চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্প আগ বাড়িয়ে আইনি পদক্ষেপও নিতে পারেন। এর উদ্দেশ্য হতে পারে—যদি কোনো তথ্য-প্রমাণ তদন্তকারীরা পেয়েও থাকেন, তার থেকে দায়মুক্তি অথবা অন্তত কোন বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করছেন, সে বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া।

কিন্তু আদালতের এ ধরনের তৎপরতা ছাড়াই তদন্তের পরবর্তী ধাপগুলো খুব ভালোভাবে গোপনে চলতে পারে।

প্রেসিডেন্ট পদে কি লড়তে পারবেন ট্রাম্প

রেকর্ডস আইন লঙ্ঘন করলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে পারবেন কি না, সে বিষয় সামনে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্য একটি আইন আছে, যা এফবিআইয়ের তল্লাশির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। সেটি হলো সরকারি নথিপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা, সরিয়ে ফেলা কিংবা নষ্ট করা। এ আইনে শাস্তি হিসেবে ‘যুক্তরাষ্ট্রের অধীন কোনো দপ্তরে দায়িত্ব পালনে’ অযোগ্য ঘোষণার কথা বলা হয়েছে।

যা হোক, যদি ট্রাম্প এই আইনের অধীন দোষী সাব্যস্ত হন, আইনটি সংবিধানের সঙ্গে যায় কি না কিংবা প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগযোগ্যতা আছে কি না, এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।

কারণ, প্রেসিডেন্ট পদের যোগ্যতার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতা ঠিক করে দিয়েছে সংবিধান। ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টকে অযোগ্য ঘোষণায় আলাদা অভিশংসনপ্রক্রিয়াও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। আবার কারও কারও মতে, কংগ্রেসের এমন আইন প্রণয়নের কর্তৃত্ব নেই, যা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন