টেনেসিতে ২০০ বছরের মধ্যে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে কী ঘটেছে

ক্রিস্টা পাইক। এই ছবি ১২ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে তুলেছে টেনেসি অঙ্গরাজ্যের সংশোধন বিভাগছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ২০০ বছরের মধ্যে প্রথমবার কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছিল। ওই নারীর নাম ক্রিস্টা পাইক। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় দুবার প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও তিনি বেঁচে যান এবং তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী।

ক্রিস্টার আইনজীবীরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে জরুরি ভিত্তিতে আদালতে আবেদন করেছেন। ওই আবেদনে তাঁরা বলেছেন, ‘ক্রিস্টা পাইক জ্ঞান হারিয়েছেন, তবে তাঁর হৃৎস্পন্দন হচ্ছে এবং নাক ডাকার শব্দও শোনা যাচ্ছে।’

পাইকের একজন আইনজীবী বিবিসিকে বলেছেন, দুবার প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পর ৫০ বছর বয়সী পাইককে হাসপাতালে ভর্তি করে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

পাইকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১৮ বছর বয়সে তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপের (১৭) সঙ্গে মিলে তিনি ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে মারধর ও নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেন। নিহত তরুণীর সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য আয়োজিত একটি কর্মমুখী প্রশিক্ষণ শিবিরে।

এ বিষয়ে এখনো টেনেসি অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সহপাঠী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে ১৯৯৬ সালে আদালত পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ২০০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা। গতকাল বুধবার দেশটির সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর ওই নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পথ খুলেছিল।

পাইকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১৮ বছর বয়সে তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপের (১৭) সঙ্গে মিলে তিনি ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে মারধর ও নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেন। খুন হওয়া তরুণীর সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য আয়োজিত কর্মমুখী এক প্রশিক্ষণ শিবিরে।

আমি মানসিকভাবে অসুস্থ ১৮ বছরের একজন কিশোরী ছিলাম। আমি যা করেছিলাম, তার ভয়াবহতা বুঝতে আমার বহু বছর লেগেছে। আমার কাজের কারণে কত মানুষের জীবন প্রভাবিত হয়েছে, তা মেনে নিতে আরও বেশি সময় লেগেছে। আমি কারও সন্তান, বোন ও বন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছি। এখন ভাবলেও অসুস্থ বোধ করি যে আমি এমন অপরাধ করেছিলাম।
ক্রিস্টা পাইক

গতকাল সকালে নিম্ন আদালত পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ বাতিল করে দেন। এর পরপরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট কাভানা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিলের আবেদন মঞ্জুর করেন। তবে এ আদেশের পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

কলিন স্লেমার
ছবি: পরিবার থেকে দেওয়া/বিবিসি

সুপ্রিম কোর্টের তিন উদারপন্থী বিচারপতি-সোনিয়া সোটোমেয়র, এলেনা কাগান ও কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন—এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।

টেনেসি অঙ্গরাজ্যে বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের মধ্যে একমাত্র নারী হলেন পাইক।

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৬ সালে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল করার পর থেকে দেশটিতে মোট ১৮ জন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বিপরীতে, এ সময়ে ১ হাজার ৬৬৩ জন পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হওয়া মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ১ শতাংশ নারী।

আরও পড়ুন

৫০ বছর বয়সী পাইক ক্ষমার আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনে শৈশবে তাঁর মানসিক আঘাত ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। আবেদনপত্রে পাইক বলেন, স্লেমারকে তিনি মারধর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে হত্যার ইচ্ছা তাঁর ছিল না। কিন্তু তিনি নিজেকে থামাতে পারেননি।

এক বিবৃতিতে পাইক আরও বলেন, ‘আমি মানসিকভাবে অসুস্থ ১৮ বছরের একজন কিশোরী ছিলাম। আমি যা করেছিলাম, তার ভয়াবহতা বুঝতে আমার বহু বছর লেগেছে। আমার কাজের কারণে কত মানুষের জীবন প্রভাবিত হয়েছে, তা মেনে নিতে আরও বেশি সময় লেগেছে। আমি কারও সন্তান, বোন ও বন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছি। এখন ভাবলেও অসুস্থ বোধ করি যে আমি এমন অপরাধ করেছিলাম।’

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৬ সালে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল করার পর থেকে দেশটিতে মোট ১৮ জন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বিপরীতে, এ সময়ে ১ হাজার ৬৬৩ জন পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হওয়া মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ১ শতাংশ নারী।

টেনেসি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বিল লি গত সোমবার ক্রিস্টা পাইকের ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন বলে জানায় রয়টার্স।

১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে এই হত্যাকাণ্ড টেনেসির নক্সভিলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। সংবাদমাধ্যমে বড় বড় শিরোনামে খবর প্রকাশ পেয়েছিল। বুকে উল্টো পেন্টাগ্রাম খোদাই করা অবস্থায় কলিনের মরদেহ পাওয়া যায়। এটি শয়তানপূজার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতীক। পাইক নিজে ওই প্রতীক খোদাই করার কথা অস্বীকার করেছেন।

আরও পড়ুন

হত্যাকাণ্ডের আগে পাইক অভিযোগ করেছিলেন, কলিন তাঁকে অপমান করেছেন এবং তাঁর তৎকালীন প্রেমিককে নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

প্রশিক্ষণ শিবিরের আরও দুই বাসিন্দা পরে আদালতে সাক্ষ্য দেন, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে পাইক তাঁদের কাছে এ নিয়ে বড়াই করেছিলেন। এমনকি কলিনের মাথার খুলির একটি টুকরাও তাঁদের দেখিয়েছিলেন।

কলিন স্লেমারের মা বলেছেন, তিনি চান পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হোক। বার্তা সংস্থা এপিকে তিনি বলেন, তিনি কয়েক দশক ধরে পাইকের সাজা কার্যকর হতে দেখার অপেক্ষায় আছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক যুগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাসে পাইক টেনেসিতে এমন একমাত্র ব্যক্তি, যাঁর কিশোর বয়সে সংঘটিত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন